kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

একাদশ-দ্বাদশ : রসায়ন বিজ্ঞান

কোনটা এসিড, কোনটা ক্ষারক?

কাজী ফারহান পূর্ব   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কোনটা এসিড আর কোনটা ক্ষারক বুঝতে সমস্যা হচ্ছে? এসিড-ক্ষারক সম্পর্কিত আধুনিক মতবাদ পড়তে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে? আজ চটপট এসিড-ক্ষারকের পরিচয় জেনে নেব।

মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে সহজেই লুকিয়ে থাকা ধাতু শনাক্ত করতে পারি। তেমনি এসিড-ক্ষারক চেনার ডিটেক্টর থাকলে কেমন হতো? মজার বিষয় হলো, এসিড-ক্ষারক শনাক্ত করার মতো ডিটেক্টর হাতের কাছেই আছে। আর এ ডিটেক্টরগুলো হলো তিনটা মতবাদ : ১. আরহেনিয়াসের আয়নিক মতবাদ, ২. ব্রনস্টেড-লাউরির প্রোটনীয় মতবাদ এবং ৩. লুইসের ইলেকট্রনীয় মতবাদ।

 

যেখানে সবাই হাতেম তাঈ

আমরা জানি, এসিডের আছে H+ আয়ন আর ক্ষারকের OH- আয়ন। সুইডিশ বিজ্ঞানী আরহেনিয়াস ১৮৮৭ সালে বলেন, এসিড জলীয় দ্রবণে ভেঙে হাইড্রোজেন আয়ন তথা H+ দান করে। আর ক্ষারক জলীয় দ্রবণে ভেঙে হাইড্রক্সিল আয়ন তথা OH- দান করে। অর্থাৎ আরহেনিয়াসের মতবাদ অনুযায়ী সবাই দাতা হাতেম তাঈ। তারা পানি অর্থাৎ H2O-এর সংস্পর্শে এলে তাদের যেটা আছে, সেটাই অবলীলায় দান করে দেয়।

এবার HCl নিয়ে একটু ভাবা যাক। পানির সঙ্গে একে সাবধানে মিশ্রিত করলে তা পানিতে দ্রবীভূত হবে। সেই সঙ্গে সেটা নিচের বিক্রিয়াটার মতো ভেঙে যাবে—

HCl + H2O — > H+ (aq) + Cl- (aq)

HCl পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে H+ আর Cl- ভেঙেছে। অর্থাৎ HCl জলীয় দ্রবণে H+ আয়ন দান করেছে।

একইভাবে HNO3 + H2O —> H+ (aq) + NO3- (aq)

H2SO4 + H2O — > 2H+ (aq) + SO42- (aq)

 

যেহেতু তারা জলীয় দ্রবণে H+ দিয়েছে, তাই HCl, HNO3, H2SO4 হলো এসিড। এখানে aq মানে একুয়াস। যার পাশে এটি লেখা থাকবে তা পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় আছে বলে ধরে নিতে হবে।

এবার ক্ষারকের সঙ্গে পরিচিত হই। সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH) জলীয় দ্রবণে নিচের বিক্রিয়ার মতো বিয়োজিত হয় :

NaOH (aq) —> Na+ (aq) + OH-(aq)

অর্থাৎ NaOH তার সম্বল OH-কে জলীয় দ্রবণে দান করে দিয়েছে। একইভাবে—

Ca(OH)2 (aq) —> Ca2+ (aq) + 2OH- (aq)

NH4OH (aq) —> NH4+ (aq) + OH- (aq)

এখানে Ca(OH)2 এবং NH4OH উভয়ই জলীয় দ্রবণে OH- আয়ন দান করে। তাই এরা ক্ষারক।

এতক্ষণ এসিড-ক্ষারকের পরিচয় সম্পর্কে যা বললাম, তা আরহেনিয়াসের মতবাদ। মনে রাখা দরকার, আরহেনিয়াসের মতবাদ অনুযায়ী H+ এবং OH- এর যেটা যার কাছে আছে, সেটাই সে জলীয় দ্রবণে দিয়ে দেবে। তার মানে এখানে জলীয় দ্রবণ তৈরিতে পানি অবশ্যই লাগবে। অর্থাৎ বিক্রিয়ায় পানি না থাকলে আরহেনিয়াসের মতবাদ দিয়ে এসিড-ক্ষারক শনাক্ত করা যাবে না। প্রয়োজন হবে অন্য মতবাদের।

 

প্রোটন ছোড়াছুড়ি

১৯২৩ সালে জোহানেস নিকোলাস ব্রনস্টেড এবং থমাস মার্টিন লাউরি প্রোটনের ওপর ভিত্তি করে তাদের প্রোটনীয় মতবাদ প্রস্তাব করেন। এ মতবাদ অনুযায়ী যে পদার্থ অন্য পদার্থকে প্রোটন দান করতে পারে, সেটা এসিড। আর যে পদার্থ সেই প্রোটনটা গ্রহণ করবে সেটা ক্ষারক। তার মানে মুশফিক যদি একটা বল ছুড়ে মারে, তবে সে হবে এসিড। আর সাকিব যদি বলটা ক্যাচ ধরে, তবে সে ক্ষারক। ঝটপট একটা উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক—

HCl এবং NH3-এর বিক্রিয়ায় NH4+ এবং Cl-  আয়ন গঠিত হয়।

বিক্রিয়াটি এ রকম :

HCl + NH3 <=> Cl- + NH4+

এখানে HCl একটি প্রোটন তথা H+ ছুড়ে দিয়ে Cl- পরিণত হয়েছে, আর NH3 সেই প্রোটন তথা H+ গ্রহণ করে NH4+ আয়নে পরিণত হয়েছে। তার মানে HCl একটি এসিড, কারণ সে প্রোটন দেয় আর NH3 একটি ক্ষারক, কারণ সে প্রোটন গ্রহণ করে। ব্যাপারটা আরো সহজ করে বুঝতে চাইলে বিক্রিয়ার বামপক্ষটাকে চিন্তা করবে প্রোটন ছোড়ার আগ মুহূর্তের ছবি আর ডানপক্ষকে ধরে নেবে ছুড়ে মারা প্রোটন ধরার পরের ছবি।

আরেকটি উদাহরণ :

CH3COOH + H2O = CH3COO-  +  H3O+

এখানে CH3COOH প্রোটন দেয় আর H2O সেই প্রোটন নেয়। CH3COOH প্রোটন দেওয়ার ফলে CH3COO পরিণত হয় আর H2O সেই প্রোটন ধরে H3O+ এ পরিণত হয়।

 

ইলেকট্রন নিয়ে খেলা

এবার আলোচনা করব এসিড-ক্ষারক চেনার শেষ মতবাদ নিয়ে। ১৯২৩ সালে সবচেয়ে আধুনিক মতবাদটি দিয়েছেন জি এন লুইস। এ ক্ষেত্রে যে পদার্থ অন্য পদার্থ থেকে এক জোড়া ইলেকট্রন নেবে সে হবে এসিড, আর যে দেবে সে ক্ষার।

এ ক্ষেত্রে আমরা বোরন ট্রাই ফ্লোরাইড—অর্থাৎ BF3 আর এমোনিয়া—অর্থাৎ NH3-এর মধ্যে বিক্রিয়া দেখব। NH3-তে নাইট্রোজেনের মুক্ত ইলেকট্রন জোড় আছে। আর BF3 এর ই পরমাণুর এক জোড়া ইলেকট্রনের ঘাটতি আছে, ফলে এর অষ্টক অপূর্ণ আছে। সুতরাং NH3 যদি BF3-কে তার মুক্ত ইলেকট্রন জোড়টি দিতে চায়, তবে BF3 সেটা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে সন্নিবেশ বন্ধন গঠন করবে। এ বন্ধনে BF3 ইলেকট্রন গ্রহণের ফলে লুইস এসিড এবং NH3 তা দান করার ফলে লুইস ক্ষারক হিসেবে পরিচিত হবে।

আরেকটি উদাহরণ :

Ag+ + 2CN- = NC- —> Ag+ <—  CN-  = [Ag(CN)2]-

এখানে সিলভার আয়ন তথা Ag+ দুটি সায়ানাইড আয়ন তথা CN- থেকে এক জোড়া ইলেকট্রন গ্রহণ করে জটিল আয়ন [Ag(CN)2]- তৈরি করে। এখানে সিলভার আয়ন ইলেকট্রন গ্রহণ করার কারণে একটি এসিড এবং সায়ানাইড আয়ন ইলেকট্রন দেওয়ার কারণে একটি ক্ষারক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা