kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

গ্রুপ স্টাডি

কথায় কথায় ত্রিকোণমিতি

এত দিন শুধু অঙ্ক করলেও মহিবুল ও সামিন ভাবল, ত্রিকোণমিতির ভিত্তি আরেকটু মজবুত করা দরকার। তাই তন্ময়ের বাসায় আয়োজন করা হলো গ্রুপ স্টাডির। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের তিন শিক্ষার্থী—সামিন ইয়াসার রাইয়ান, ইবতিশাম আহমেদ তন্ময়, মহিবুল ইসলাম বাঁধন বসল লেখাপড়ার আড্ডায়। সঞ্চালক ছিলেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত। শ্রুতলিখন—কাজী ফারহান পূর্ব

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কথায় কথায় ত্রিকোণমিতি

মডেল : আকাশ ও আদ্রতা ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

 

 

মহিবুল : দোস্ত টেস্ট পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্টও ভালো। কিন্তু ত্রিকোণমিতিতে কাঁচা, তুই আমাদের বাঁচা!

সামিন : এত দিন তো সূত্র দেখেছি আর অঙ্ক করেছি। আজ এর খুঁটিনাটি বুঝতে চাই।

তন্ময় : শুরু থেকেই বলি। ত্রিকোণমিতির ইংরেজি Trigonometry। শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ trigonon (ত্রিভুজ) ও metron মানে ‘পরিমাপ’ থেকে এসেছে। এখানে ত্রিভুজের কোণ, বাহু ও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা হয়। এককথায় বলতে গেলে ত্রিকোণমিতি মানেই ত্রিভুজের কারসাজি।

মহিবুল : ত্রিভুজের পরিমাপ নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন?

তন্ময় : ব্যাপারটা হলো, ত্রিভুজের তিনটি কোণের অপেক্ষক বা ফাংশনগুলো নানা পরিমাপের কাজে লাগানো যায়। ত্রিভুজের একটি কোণের ছয়টি অপেক্ষক বা ফাংশন থাকে। যথা—সাইন, কোসাইন, ট্যানজেন্ট, কোট্যানজেন্ট, সেক্যান্ট ও কোসেক্যান্ট। এগুলো ব্যবহার করে অজানা কোণ ও দূরত্ব বের করতে পারবি।

মহিবুল : এক মিনিট! ত্রিকোণমিতিক ফাংশন জিনিসটা কী তা আগে বলে নে!

তন্ময় : ত্রিভুজের তিনটি বাহু ও তিনটি কোণ থাকে। এটা তো জানিস? ত্রিকোণমিতিক ফাংশন বা অপেক্ষক হলো কোনো সমকোণী ত্রিভুজের একটি কোণের সঙ্গে দুটি বাহুর মধ্যে সম্পর্ক। একটি সমকোণী ত্রিভুজের লম্ব, ভূমি আর অতিভুজ থাকে। ত্রিকোণমিতির ছয়টি ফাংশনের মধ্যে দুটি ফাংশন ত্রিভুজের লম্ব আর অতিভুজ, দুটি ফাংশন ভূমি আর অতিভুজের আর বাকি দুটি ফাংশন লম্ব আর ভূমির সঙ্গে কোণের সম্পর্ক স্থাপন করে।

এর মানে হলো তুই যদি ত্রিভুজের দুই বাহুর দৈর্ঘ্য জানিস, তবে সূত্র দিয়ে কোণের পরিমাপ বের করে ফেলতে পারবি। আবার কোণের পরিমাপ আর এক বাহুর দৈর্ঘ্য জানলে বাকি অজানা বাহুটির দৈর্ঘ্য আরামসে বের করতে পারবি! অর্থাৎ কোণ আর দুই বাহুর পরিমাপের মধ্যে যেকোনো দুটি জানতে পারলেই হলো সাইন, কোসাইন, ট্যানজেন্ট, কোট্যানজেন্ট, সেক্যান্ট ও কোসেক্যান্ট এই ত্রিকোণমিতিক ফাংশনগুলো ত্রিভুজের কোণ অথবা বাহুর পরিমাপ নির্ণয়ে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

এই ফাংশনগুলোকে আমরা যথাক্রমে sin, cos, tan, cot, sec, cosec দ্বারা প্রকাশ করি। আর ত্রিভুজের কোণকে আমরা থেটা, আলফা দিয়ে প্রকাশ করি।

সামিন : তার মানে তোর যদি ত্রিভুজের লম্ব আর ভূমির পরিমাপ জানা থাকে তাহলে তুই : theta এর সূত্র দিয়ে থেটা অর্থাৎ কোণের মান পেয়ে যাবি! তাই না?

তন্ময় : ঠিক ধরেছিস!

মহিবুল : আমি কিন্তু ট্যান থেটার ব্যাপারটা বুঝলাম না।

তন্ময় : ব্যাপারটা বুঝতে হলে ত্রিকোণমিতির ছয়টা অনুপাত প্রথমে রপ্ত করতে হবে। কেননা ছয়টা অনুপাত দিয়েই সব ত্রিকোণমিতির কারসাজি। আর ওই যে ছয়টা ফাংশনের কথা বললাম, তারা কিন্তু নির্দিষ্ট অনুপাতের সমান।

মহিবুল : কিন্তু অনুপাত তো মনে রাখতে পারি না। এখন কী করব?

তন্ময় : আচ্ছা! অনুপাত মনে রাখার মজার তিনটা বাক্য আছে। ‘সাগরে লবণ আছে। কবরে ভূত আছে। ট্যারা লম্বা ভূত।’ বাক্যগুলো মনে রাখলে ছয়টা অনুপাত একেবারে দুধভাত!

সামিন : কী মন্ত্র জপলি এসব? বুঝিয়ে বল জলদি!

তন্ময় : আমরা জানি, সাইন থেটা = লম্ব/অতিভুজ। এটা মনে রাখার বাক্য হলো ‘সাগরে লবণ আছে’। এখানে ‘সাগর’ মানে সাইন থেটা। ‘লবণ’ মানে লম্ব আর ‘আছে’ মানে অতিভুজ। আবার cos theta=ভূমি/অতিভুজ। দ্বিতীয় বাক্য হলো ‘কবরে ভূত আছে’। এখানে ‘কবর’ মানে কজ থেটা। ‘ভূত’ মানে ভূমি আর ‘আছে’ মানে অতিভুজ। tan theta=লম্ব/ভূমি। মানে ‘ট্যারা লম্বা ভূত’। ‘ট্যারা’ ট্যান থেটা, ‘লম্বা’ মানে লম্ব আর ‘ভূত’ মানে ভূমি। তিনটা ফাংশনের অনুপাত শেখা শেষ! বাকি আছে—কোসেক, সেক আর কট। সাইনের উল্টো কোসেক, কসের উল্টো সেক আর ট্যানের উল্টো কট। উল্টো মানে বুঝেছিস? প্রতিবারই শুধু অনুপাতটা উল্টে দিতে হবে। যেমন, sin theta = লম্ব/অতিভুজ এটা cosec theta হবে অতিভুজ/লম্ব। বুঝলি?

আর ফাংশন মানে বলেছিলাম না এটি ত্রিভুজের একটি কোণ আর দুটি বাহুর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে? সূত্রগুলো থেকে কি ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে?

মহিবুল : একেবারে পরিষ্কার! তার মানে সামিন তুই ট্যান থেটার সূত্র দিয়ে থেটা অর্থাৎ কোণের মান বের করবি। ‘ট্যারা লম্বা ভূ-মন্ত্র জপে, তাই না?

সামিন : ঠিক ধরেছিস! কিন্তু sin30 ডিগ্রি, cos30 ডিগ্রি এসবের একটা নির্দিষ্ট মান আছে। সব সমকোণী ত্রিভুজের বেলায়ই এদের মান নির্দিষ্ট। ট্যারা লম্বা ভূতের মতো কোনো মন্ত্র আছে নাকি?

তন্ময় : সামিন, এটাও সহজ। প্রথমেই sin-এর অনুপাতের মানগুলো মনে রাখতে হবে। আমরা ০, ৩০, ৪৫, ৬০ আর ৯০ ডিগ্রি কোণের জন্য sin এর অনুপাতগুলো জানি। sin0=০, sin30=১/২, sin45=১/✔২, sin60= ✔৩/২ আর sin90=১। sin-এর এই অনুপাতগুলোকে উল্টো করলেই cosec এর মান পেয়ে যাবি।

এখন তোদের বিভিন্ন কোণের জন্য পড়ং এর মান মনে রাখার কৌশলটাও বলি। এটাও সহজ। এখানে sin এর মান পেছন থেকে বললেই পেয়ে যাবি। যেমন cos0 এর মান sin90 এর সমান। একই ভাবে cos30=sin60, cos45=sin45, cos60=sin30, cos90=sin0। এখন তোরা cos এর মান জানিস। sec এর মান কিভাবে পাবি? cos এর অনুপাতের মানকে উল্টো করলেই sec পেয়ে যাবি। যেমন-cos30= ✔৩/২, তাহলে sec30 এর মান হবে ২/✔৩।

সামিন : আচ্ছা tan30 অথবা cot30 এর মান কিভাবে বের করব?

তন্ময় : ট্যান থেটা আর কট থেটার আলাদা সূত্র আছে। ট্যান থেটা হলো sin theta/cos theta আর cot theta = cos theta/sin theta। এখন ধর, tan30-এর মান বের করতে হবে। সূত্রানুযায়ী tan30=sin30/cos30। sin30 আর cos30 এর মান বসিয়ে দে! তাহলে পাবি tan30= ১/২ / ✔৩/২ অর্থাৎ tan30=১/✔৩।

মহিবুল : আচ্ছা, তুই আমাদের ফাংশনগুলোয় ০, ৩০, ৪৫, ৬০, ৯০ ডিগ্রি দিয়েই দেখালি। কোণের মান যদি ২০, ৪০, ৭০ ইত্যাদি ইচ্ছামতো ডিগ্রি নিই, তাহলে কিভাবে কাজ করব?

তন্ময় : আসলে এই কোণগুলো ব্যবহার করলে অনুপাতের মান অমূলদ আসবে, যা মনে রাখা সম্ভব না। শুধু ক্যালকুলেটরে হিসাব করেই তা বের করা যায়। তাই ২০, ৪০, ৭০ এ ধরনের কোণ থাকলে ক্যালকুলেটর লাগবে।

সামিন : আচ্ছা দোস্ত একটা সমকোণী ত্রিভুজের কোনটা লম্ব, কোনটা ভূমি—এটা কী করে বুঝব? এখানে তো বেশ প্যাঁচ লাগে আমার!

তন্ময় : একটা সমকোণী ত্রিভুজের সমকোণ থাকে একটি এবং সূক্ষ্মকোণ দুটি। একটু সহজভাবে চিন্তা করলেই হয়। ধর, ABC ত্রিভুজের নির্দিষ্ট সূক্ষ্মকোণ B নিয়ে আমরা কাজ করব। তাহলে কোণ B এর বিপরীত বাহু AC হবে লম্ব। আর কোণটির সংলগ্ন বাহু BC হবে ভূমি।

মহিবুল : এই ত্রিকোণমিতি কি শুধু পড়ালেখার কাজেই লাগে? নাকি বাস্তবেও ব্যবহার আছে?

তন্ময় : অবশ্যই! ত্রিকোণমিতির একটা অংশ হচ্ছে দূরত্ব ও উচ্চতা। আমরা উচ্চতা নির্ণয়ের জন্য ফিতা, স্কেল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি। আমরা কিন্তু ত্রিকোণমিতির সাহায্যেও এসব বের করতে পারি।

সামিন : সেটা কোথায়?

তন্ময় : ত্রিকোণমিতি দিয়ে সহজেই পুকুরের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, দালানের উচ্চতা বের করা যায়। কিভাবে? ধর, দালানের দৈর্ঘ্য বের করতে হবে। এর জন্য তুই একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব যেমন ১০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে তোর থেকে দালানের উচ্চতা কত ডিগ্রি কোণে আছে তা নির্ণয় করবি। এরপর tan theta এর সূত্রে বসিয়ে দিলেই হলো! কোণের মান জানি, ভূমির মান জানি। অঙ্ক করলেই বেরিয়ে যাবে লম্ব তথা দালানের উচ্চতা। ত্রিকোণমিতির জ্ঞান শুধু পরীক্ষার খাতায়ই না; পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, মিউজিক, প্রত্নতত্ত্ব—এসবেও ব্যবহার হয়।

আড্ডা শেষে সামিন আর মহিবুল দুজনেই খুশি নতুন কিছু জানতে পেরে। আর জ্ঞান ঝালাই করে নিতে পেরে তন্ময়ও বেজায় খুশি। যে জিনিস একা বুঝতে হয়তো বেশ গলদঘর্ম হতে হতো তা গ্রুপ স্টাডিতে বুঝে নেওয়া গেল এক নিমেষেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা