kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

এসএসসি ২০২০

মনটা যেন থাকে দুধেভাতে

পরীক্ষার আগে বুক দুরুদুরু তো করবেই কিন্তু এতে যেন একেবারে কাবু হয়ে না যাও—এ জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোসামাজিক কাউন্সেলর ও প্রভাষক তাসনুভা হক

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মনটা যেন থাকে দুধেভাতে

তাসনুভা হক

খুব আলতো করে শ্বাস নেয়ার সময় ‘ইন’ এবং ছাড়ার সময় ‘আউট’ বলতে পারো। এখন কল্পনা করো পানি প্রবাহিত হওয়ার মতো প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে খুব স্বচ্ছ, উজ্জ্বল আলো শরীরের ওপর প্রবাহিত হচ্ছে এবং শ্বাস ছাড়ার সময় সব চাপ, উদ্বেগ শরীর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।

যখন ছোট ছিলে জীবনটাই অন্য রকম ছিল। সময়গুলো যেমন ইচ্ছা তেমন কাটানো যেত। ধীরে ধীরে স্কুলের পড়াশোনার জীবন শুরু। ঘড়ি ধরে স্কুলে যাওয়া, পড়তে বসা, খেলাধুলা ইত্যাদি। আবার সম্পর্কগুলোও কেমন যেন পরীক্ষার রেজাল্টের ওপর নির্ভর করছে। অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে অনেক কিছুই যে না-পাওয়া রয়ে যায়। এ বিষয়গুলো মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে। প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে কী হবে, তা ভেবে খুব উদ্বিগ্নতা তৈরি হতে থাকে। আর কষ্টটা যেহেতু তোমারই হচ্ছে, তাই তোমাকে বেশি সাহায্য করতে পারবে তুমি নিজেই।

 

নিজেকে বোঝা

নিজেকে বোঝার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের আবেগ, অনুভূতি, চিন্তা, দক্ষতা, উন্নয়নের দিক সম্পর্কে সচেতন থাকা। এ সচেতনতাটাই তোমার চাপ বা দুশ্চিন্তা মোকাবেলায় সাহায্য করবে। শিক্ষার্থীরা যদি জানে কিসে তার মানসিক চাপ বেশি, অস্থির লাগে, ভয় কাজ করে, তবে আগেই সতর্ক হতে পারবে। যেমন—কারো যদি গণিত পড়তে সময় লাগে, বিষয়টা ভালো না লাগে, তাহলে এই পরীক্ষার আগে টেনশন বেশি হবে। তাই আগে থেকেই এ বিষয়ে প্রস্তুতি অনেক ভালো করে নিতে হবে। এতে যে মনোবল তৈরি হবে তা অন্য পরীক্ষার মানসিক চাপও কমিয়ে দিতে পারবে। আবার প্রত্যাশাটাও নিজের অবস্থানের সঙ্গে মিল রেখে করতে হবে। তবে ফলাফলে কোনো আঘাত পাবে না। আবার এমন কেউ যদি থাকে যার সঙ্গে কথা বললে মজা লাগে, উৎসাহিত বোধ করো, তবে তার সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে পারো। এ ছাড়া পরীক্ষার্থীরা যদি জানে সে কী কী ভালো পারে (পড়াশোনা ছাড়া যেমন—সময় ম্যানেজ করা, চাপের পরিস্থিতিতে শান্তভাবে নিজের আবেগ বুঝে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারা, সৃজনশীলতা ইত্যাদি) সেটাও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে।

 

ইতিবাচক চিন্তা

‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ শুনতে শুনতে এ ধারণাই একসময় বদ্ধমূল হয়ে যেতে পারে। ‘আমি পারব না’ চিন্তাটাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজে কবে কী পেরেছ সেই সময়গুলোর কথা ভাবতে হবে। যে পরিস্থিতিতে আছ সেটা মোকাবেলা করার জন্য তোমার কী দক্ষতা আছে সেটাও চিন্তা করতে হবে। ইতিবাচক চিন্তার চর্চাটি তোমার এ সময়ের মানসিক স্থিরতার জন্য খুব দরকারি।

 

প্রত্যাশা ও লক্ষ্য নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা

তুমি যে এত সময় ও মেধা দিচ্ছ পড়ালেখা, ফলাফল করতে; তুমি কী জানো এটা কেন করছ? এই যে শিক্ষাগত জীবনে আছ, এর উদ্দেশ্য কী? আর অভিভাবকদের বলব, আপনিই ভাবুন, আপনার প্রত্যাশা কী? শুধুই ভালো ফল? নাকি জীবন ও বোধের প্রয়োজনে শিক্ষাটা জরুরি, সে বিষয়ে ভাবনা কাজ করে? প্রত্যাশা বোঝা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যাশাটা যদি বাস্তবসম্মত হয়, তাহলে ফলাফল প্রত্যাশার কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু এটা যদি হয় তুলনামূলক, তবে ওই শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অনেক চাপ পড়ে, যা অন্যের সম্পর্কে, এমনকি পড়াশোনায় নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। নিজের প্রত্যাশা পূরণের জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করা যেতে পারে। যেমন—বছর শেষে শিক্ষাজীবনে কী অর্জন আশা করেছ, তা পূরণে এখন মাসে কতটা অর্জন করতে হবে। আরো সূক্ষ্মভাবে হতে পারে, এই সপ্তাহে বা আজকের দিনটিতে কী কী অর্জন করতে হবে।

 

বিরতি ও ভালো লাগার কিছু করা

অনেক সময় পরীক্ষার্থীদের দেখা যায় বিরতিহীনভাবে পড়ে যাচ্ছে, যা মনোযোগ ধরে রাখার পরিপন্থী। পড়ার মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিরতি খুব সহায়ক। যেমন হতে পারে ২-৫ মিনিটের মধ্যে অন্য রুম থেকে একটু হেঁটে আসা, বারান্দা বা জানালা দিয়ে বাইরে দেখা, একটা গান শোনা, শরীরটা স্ট্রেচ করা, হাতে-মুখে পানি দেওয়া ইত্যাদি।

 

নিজের প্রশংসা

এই অভ্যাস জীবনের যেকোনো সময়ের জন্য প্রযোজ্য। ছোটবেলা থেকেই আমরা সাধারণত নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনে বড় হই। এভাবে শুনতে শুনতে নিজের মধ্যে থাকা দক্ষতা ও সম্ভাবনাগুলো ম্লান হয়ে আসে। তাই হালটা নিজেকে ধরতে হবে। যখনই সুযোগ আসবে নিজের কী ভালো দিক আছে, কী কী ভালো পারো তা ভাববে। যেমন—‘আমি মজা করতে পারি’, ‘অন্যকে সাহায্য করি’, ‘কাজ সময়মতো করি’ ইত্যাদি। সাধারণত আমরা এটা করে অভ্যস্ত নই। তাই শুরুতে একটু আড়ষ্টতা আসতে পারে। কিন্তু কিছুদিন চর্চা করলেই দেখবে বিষয়টা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হচ্ছে। কাজটির জন্য একটি নোট বই বা ডায়েরি নিয়ে সেখানে লিখে রাখতে পারো। এটা নিজেকে বুঝতে ও আত্মবিশ্বাস উন্নয়নে খুব ভালো কাজ করে। 

 

দিনের প্রতিফলন

অনেক সময় দেখা যায়, দিনগুলো চলে যায় কিন্তু বোঝা যায় না বা তা নিয়ে আর ভাবা হয় না। প্রতিদিন দিন শেষে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সারা দিনের কাজকর্ম নিয়ে একটু ভেবে নাও। ভাবনাটা নিজের কাছাকাছি থাকতে, নিজের উদ্দেশ্যের সঙ্গে থাকতে সাহায্য করবে। এ ক্ষেত্রে শুধু কী পড়লে আর কোন পড়া বাকি তা নয়, কী কী কাজ করলে, কোন ভাবনা থেকে করলে সেটা নিয়েও ভাবো। কতটা পড়া হয়েছে লক্ষ্য অনুযায়ী সেটাও নোট নিতে পারো।

 

মেডিটেশন ও ব্যায়াম

অনেক সময় আমরা অন্যকে তো বটেই, নিজেকেও অজুহাত দিতে থাকি এই বলে যে ‘নিজের যত্ন নিতে সময় লাগে’। এটা অজুহাতই। কারণ যত্ন নিতে চাইলে অবশ্যই সময় ম্যানেজ করা সম্ভব। খুব ছোট ছোট ব্যায়াম আছে, যেগুলো অল্প সময়ে করা যায়। এমন কিছু ব্যায়ামের কথা বলছি এবার, যা বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়াতে এবং স্মৃতিশক্তি উদ্দীপ্ত করতে সাহায্য করবে। এ ছাড়াও এ ধরনের চর্চা মানসিক চাপও কমায়।

তোমার জন্য সহায়ক তথা আরামদায়ক অবস্থান করো আগে। সেটা বসে হতে পারে বা শুয়ে। বসার ক্ষেত্রে সোজা হয়ে বসে পা মেঝেতে সমান্তরালভাবে রাখতে পারো বা চেয়ারে বসলে হাত-পা রিলাক্স করে রাখো। এ ছাড়া সুখাসন, অর্ধপদ্মাসন বা পদ্মাসনে বসেও ব্যায়ামগুলো করতে পারো।

সুখাসনে বসার ক্ষেত্রে প্রথমেই মেরুদণ্ড সোজা করে পা দুটো শরীরের সামনের দিকে স্ট্রেচ করতে হবে সহনীয় ও আরামদায়কভাবে। এরপর বাঁ পা ভাঁজ করে পায়ের পাতা ডান পায়ের থাইয়ের নিচে রাখো। একইভাবে ডান পা-ও ভাঁজ করো। থাই, হাঁটু, পায়ের পাতা পুরোপুরি ফ্লোরের সঙ্গে থাকবে। মাথা, ঘাড়, কাঁধ রিলাক্স এবং হাত হাঁটু বা থাইয়ের ওপরে ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। অর্ধপদ্মাসনের ক্ষেত্রে ডান পায়ের পাতা হাত দিয়ে সাবধানে ধরে বাঁ পায়ের থাইয়ের ওপরে রাখতে হবে। পদ্মাসনের ক্ষেত্রে দুই পা-ই অন্য পায়ের ওপরে রাখতে হবে। শুয়ে করলে পুরো শরীর সোজা করে, হাত শরীরের দুই পাশে রেখে পুরো শরীর রিলাক্স করো।

আসন বা অবস্থান নেওয়ার সময় নিজের ওপর জোর খাটানোর প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া মেডিটেশন করার সময়ও তুমি চোখ বন্ধ করে অথবা চোখ খোলাও রাখতে পারো। চোখ খুলে রাখলে সামনের দিকে ফ্লোরে খুব স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকতে হবে। এভাবে নিজের অবস্থানে স্থির হয়ে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নাও এবং খেয়াল করো কিভাবে নাক দিয়ে বাতাস শরীরে প্রবেশ করছে এবং বের হচ্ছে। ধীরে ধীরে মনোযোগ দাও। কিছুক্ষণ খেয়াল করো। কী! শব্দ শুনতে পাচ্ছো? কী ধরনের গন্ধ পাচ্ছো, বন্ধ চোখে কেমন আলো অনুভূত হচ্ছে, কেমন তাপমাত্রা ত্বকে অনুভব করছ সব খেয়াল করো। এবার মাথা থেকে পা বা পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো শরীরটা খেয়াল করো। দেখবে একটা অনুভূতি টের পাবে। কোনো দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ অনুভূত হচ্ছে কি না খেয়াল করা এবং নিজেকে অনুমতি দাও আরাম করার। শরীরের ভারটা অনুভব করো। যখন স্থির হয়ে আসবে ধীরে ধীরে মাংসপেশি, কাঁধ, ঘাড়, মুখকে রিলাক্স করো, চোয়ালটা শিথিল করে নাও। এ অবস্থায় থাকো কিছুক্ষণ। শুধু এভাবেও নিজের মধ্যে স্থিরতা আনতে পারবে।

এবার একটি হাত পেটের ওপরে রাখতে পারো চাইলে। এবার মনোযোগ দাও শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে। খেয়াল করো কিভাবে শ্বাস শরীরের ভেতরে ও বাইরে প্রবাহিত হচ্ছে। খেয়াল করে দেখো, প্রশ্বাসটা বুকের ওপরের অংশ থেকে আসছে, নাকি পেটের নিচের অংশ থেকে। কোনোভাবে চাপ তৈরি না করে পেটের দিকটা নমনীয় এবং রিলাক্স করো। শ্বাসকে পেট, তলপেটের গভীরে নিয়ে যাও এবং ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস আরো গভীর এবং সময় নিয়ে করো।

কোনোভাবেই শ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন নেই। শুধু দেখবে প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাসের সাইকেলে তুমি মনোযোগ দিতে পারছ কি না, যখন এটা শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে এবং বের হয়ে যাচ্ছে। খুব আলতো করে শ্বাস নেওয়ার সময় ‘ইন’ এবং ছাড়ার সময় ‘আউট’ বলতে পারো। এখন কল্পনা করো পানি প্রবাহিত হওয়ার মতো প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে খুব স্বচ্ছ, উজ্জ্বল আলো শরীরের ওপর প্রবাহিত হচ্ছে এবং শ্বাস ছাড়ার সময় সব চাপ, উদ্বেগ শরীর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। শ্বাস নেওয়ার সময় মনে মনে বলো—আমি আমার শরীর ও মনকে শান্ত করছি। শ্বাস ছাড়ার সময় মনে মনে বলো—আমি সব দুশ্চিন্তাকে মুক্ত করে দিচ্ছি।

আরেকটি ব্যায়াম আছে, যা যেকোনো আসনে করা যেতে পারে। ঠিক চোখ বরাবর একটি প্রজ্বলিত মোমবাতি রাখো। এটিকে স্থির হতে সময় দাও। এরপর পুরো মুখটাকে রিলাক্স করো। চোখ বন্ধ করে খুব ধীরে ধীরে চোখটি খোলো। এখন এক দৃষ্টিতে মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে থাকো। যদি চোখে পানি আসে তা হলে আলতো করে চোখের পলক ফেলে আবার তাকিয়ে থাকো। এভাবে ৫-৬ বার করে এ চর্চা শেষ করতে পারো। এটা মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি বাড়ানো ও মনকে স্থির হতে সাহায্য করে। তাই চর্চাটি শুধু পরীক্ষার আগে নয়, সব সময়ই করা দরকার।

 

শ্রুতলিখন : জুবায়ের আহম্মেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা