kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘এভিয়েশন নীতি ব্যবসাবান্ধব নয়’

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘এভিয়েশন নীতি ব্যবসাবান্ধব নয়’

কাজী ওয়াহিদুল আলম

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক পরিচালক ও ‘দ্য বাংলাদেশ মনিটর’-এর সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম। দীর্ঘদিন ধরে বিমান নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশে এয়ারলাইনসের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

আকাশপথে আমাদের বাজারটা কেমন?

একটা মার্কেট কতটা উন্নত হতে পারে সেটা নির্ভর করে সে দেশের জনসংখ্যার ওপর। জনসংখ্যার দিক থেকে এই অঞ্চলে ভারতের পরই আমাদের অবস্থান। একসময় বাংলাদেশের মানুষ মধ্যপ্রাচ্যেই বেশি যেত। এখন বাংলাদেশিরা বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে। আগে তো শুধু ছিল শ্রমিক। এখন চাকরি, পড়াশোনা করতেও বিদেশ যাচ্ছে। আগে থেকে ব্যবস্থা না করলে এখন ঢাকা থেকে কানাডা কিংবা আমেরিকার ফ্লাইটে কোনো সিট খালি পাবেন না। তার মানে বিশ্বময় আমাদের মার্কেট তৈরি হয়েছে। অনাবাসী বাংলাদেশি এবং ভিজিটিং ফ্রেন্ডস অ্যান্ড রিলেটিভস, যারা ভিএফআর প্যাসেঞ্জার নামে পরিচিত এদের অংশটাও বেশ বড়। আমাদের যেসব আত্মীয়-স্বজন বাইরে কাজ করে বা নানা কারণে থাকে, আমরা যাচ্ছি তাদের সঙ্গে দেখা করতে। তারাও আসছে বেড়াতে।

আরেকটা বিষয় হলো, মেডিক্যাল ট্যুরিজমও বেড়েছে। মানুষ আগে ট্রিটমেন্টের জন্য শুধু ভারতে যেত। এখন সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া; এমনকি ইউরোপেও যাচ্ছে। এখন আমাদের আপার মিডল ক্লাস অনেক বেড়েছে। ফলে এখন দেশের পাশাপাশি মানুষের বাইরে বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। আগে দুবাইতে শুধু লেবার ট্রাফিক যেত। এখন অবসর কাটাতে অনেক লেজার ট্রাফিকও যাচ্ছে। দেশে প্রচুর অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। পায়রায় যে বন্দর হচ্ছে সেখানে ১০ হাজার চীনা শ্রমিক কাজ করে। তারা তো দফায় দফায়ই দেশে যাচ্ছে, আসছে। একটা ট্রাভেল এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথ হওয়ার জন্য যত ধরনের কম্পোনেন্ট দরকার সবই আমাদের ভালো। এভিয়েশনের এয়ার অন এয়ার বেসিসে আমাদের গ্রোথ টেন পার্সেন্ট। এটা অনেক বেশি।

একদিকে মার্কেটের পরিসর বাড়ছে, অন্যদিকে গেল কয়েক বছরে অনেক বেসরকারি এয়ারলাইনস বন্ধ হয়ে গেছে। এটা কেন?

ভারতের দিকে তাকান। সেখানে ডমেস্টিক মার্কেটও অনেক বড়। সেখানে জেট এয়ারওয়েজ, সাহারা এয়ারওয়েজ, কিংফিশারের মতো পাঁচ-সাতটা এয়ারলাইনস বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের এখানেও একই চিত্র। প্রথমে অ্যারো বেঙ্গল শুরু করেছিল চায়নিজ প্লেন দিয়ে। অল্প সময়ের মধ্যে তারা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর এয়ারপারাবাতও গেল। জিএমজি এয়ারলাইনস মোটামুটি ১০ বছর অপারেট করেছে; কিন্তু তারাও টিকতে পারেনি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ শেয়ারবাজার থেকে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করেছিল। একপর্যায়ে ভুল এয়ারক্রাফট বাছাই ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে তারাও বন্ধ হয়ে গেল। আরো অনেকে এলো, গেল।

আসলে এভিয়েশনে আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেটা অপরিকল্পিত ছিল। এই ব্যবসা সম্পর্কে যাদের ভালো জানাশোনা ছিল না, তারাই এসেছে। এটা অন্য পরিবহন ব্যবসার মতো না। এই ব্যবসা করতে গেলে এয়ারলাইনস ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতে হবে, জানতে হবে। এয়ারলাইনস ব্যবসায় বলাই হয়—পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো ফল আশা করা যাবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের এখানে কম্পানিগুলো পাঁচ বছরের আগেই ঝরে পড়েছে। তা ছাড়া গেল ১০-১৫ বছরে তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেটাও একটা কারণ। একটা এয়ারলাইনসে অপারেটিং কস্টের ৩৫-৪০ পার্সেন্ট ফুয়েল কস্ট। একটা অবাক ব্যাপার দেখুন, বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো প্রাইভেট এয়ারলাইনসের চেয়ে কম দামে ফুয়েল কেনার সুযোগ পায়।

সরকারের এভিয়েশন পলিসির কোনো ভূমিকা আছে কী?

সরকারের এভিয়েশন পলিসি বেসরকারি এয়ালাইনসের পক্ষে অনুকূল নয়। ন্যাশনাল কেরিয়ার ও প্রাইভেট এয়ারলাইনসের মধ্যে একটা আনফেয়ার কম্পিটিশন তৈরি করা হয়েছে। এখানে প্রাইভেট এয়ারলাইনস ও বিমান একে অপরকে যদি সহযোগিতা করত তাহলে উভয়েই লাভবান হতো।এখানে প্রফেশনালিজমের অভাবের কথা অনেকে বলে থাকেন।

আমাদের দেশে এভিয়েশন প্রফেশনালি ডেভেলপ করেনি। এখানে আইএটিএ (ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন) অনুমোদিত কোনো এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন নেই, যেখান থেকে এভিয়েশন ক্যারিয়ারের লোকজন তৈরি করা যায়। ভারতে আইএটিএ অনুমোদিত ৩৬টি ইনস্টিটিউট আছে। আমাদের একটিও নেই। তাতে করে এখানে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট হয়নি। একটি দেশের হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের জন্য ন্যাশনাল ক্যারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিমান গত ৪৭ বছরে ৪৭ জন রিক্রুট করতে পারেনি। এখন এয়ারলাইনসে যারা কাজ করছে, বেশির ভাগই ট্রাভেল এজেন্সি ব্যাকগ্রাউন্ড। এভিয়েশন ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকের সত্যি অভাব এখানে।

আমাদের এখানে কোন ধরনের বিমান বেশি চলে?

ড্যাশ-৮ ছোট এয়ারক্রাফট। এটা প্রথম থেকে জিএমজি, ইউনাইটেড, বেঙ্গল ব্যবহার করেছে। এখন ট্রেন্ডটা এটিআর-এর দিকে যাচ্ছে। যেটা বিমানও এনেছে। নভোএয়ার অনেক আগে থেকেই এটিআর ব্যবহার করছে। ইউএস বাংলাও এটিআর আনছে। এটার অপারেটিং কস্টও কম, ক্যাপাসিটি বেশি। আমাদের এখানে অপারেটিং কস্ট ইজ অ্যা ফ্যাক্টর। যেমন নভোএয়ার প্রথমে এনেছিল এমব্রায়ার। এমব্রায়ার ভাল বিমান কিন্তু এটার পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। পরে বছরখানেকের মাথায় সেটা বন্ধ করে দিতে হলো।

পাইলটের কোনো ক্রাইসিস আছে?

এখন পর্যন্ত পাইলটের ব্যাপারে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। পাইলটরা আস্তে আস্তে ওপরে ওঠে। আগে তো ছোট এয়ারক্রাফট ছিল না। কেউ শুরু করলে একেবারে বড়টা দিয়েই করতে হতো। এখন তো এমন—কেউ ড্যাশ-৮ দিয়ে শুরু করল, তারপর এটিআর-এ গেল। এরপর বোয়িং ৭৩৭-এ গেল। এখন একটা জেনারেশন অব এয়ারক্রাফট আছে। আগে যেটা ছিল না। পাইলট তৈরির প্রতিষ্ঠানও বেশ কয়েকটা আছে।

এখন করণীয়টা আসলে কী?

যেকোনো পলিসি করতে গেলে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিতে হবে। প্রাইভেট এয়ারলাইনসগুলো কী প্রবলেম ফেস করছে, সেটা জানতে হবে। আমরা দেখেছি বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস বন্ধ হয়ে গেল। এটা কেন হলো এর কারণ অনুসন্ধান করে কি কেউ দেখেছে? বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে একটা সেল থাকা উচিত প্রাইভেট এয়ারলাইনস বিষয়ে। যেখানে প্রাইভেট এয়ারলাইনসগুলো তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে পারবে। বেসরকারি মালিকদেরও নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। একটি এয়ারলাইনস চালাতে গেলে মিনিমাম একটি এয়ারক্রাফট এক্সট্রা রাখতে হবে। অনেকে বলতে পারেন, একটি এয়ারক্রাফট বসিয়ে রাখব? এটা আসলে পার্ট অব দ্য গেম। কোনো কারণে একটার সমস্যা দেখা দিলে যেন অন্যটা দিয়ে কাজ চালানো যায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা