kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

প্রথম বাংলা পত্রিকা

হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’

রোবায়েত ফেরদৌস

১০ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’

গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস

বেশ ঝক্কি-ঝামেলার মধ্যেই ভারতবর্ষে পত্রিকার প্রচলন হয়েছিল। শুরুটা ইংরেজদের হাত ধরেই। আর ভারতবর্ষের পত্রিকার জনক হতে পারতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সাবেক চাকুরে উইলিয়াম বোল্টস। কিন্তু কপালের ফেরে সেই তকমাটা লাগে জেমস অগাস্টাস হিকির নামের সঙ্গেই। তাঁর দেখানো পথ ধরেই পরে ভারতবর্ষে নানা রকম পত্রিকা চালু হয়

 

দিগ্দর্শন

১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম পত্রিকা ‘দিগ্দর্শন’। তবে হুট করেই কিন্তু পত্রিকাটি বের হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কিছু ইউরোপীয় খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকের আঠারো বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। ১৮০০ সালের মার্চ মাসে উইলিয়াম কেরি পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরে ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ নামেই ছাপাখানাটি চালু করেন। সে মাসেই পঞ্চানন কর্মকারের সহযোগিতায় প্রথম বাংলা গদ্যগ্রন্থ ‘মঙ্গলসমাচার মতীয়ের চরিত’ ছাপা হয় এই ছাপাখানা থেকে। উইলিয়াম কেরি অনূদিত বাইবেলও প্রকাশিত হয়েছিল এখান থেকেই। এসবের ধারাবাহিকতায় একটি বাংলা পত্রিকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে ইংরেজ মিশনারি জোশুয়া মার্শম্যানের ছেলে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের ওপর। চার পৃষ্ঠার পত্রিকাটি ছিল দ্বিভাষিক (বাংলা-ইংরেজি)। মাসে একবার বের হতো। এখানে বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ একসঙ্গে প্রকাশিত হতো। শ্রীরামপুরের সাংবাদিকরা একটি নিজস্ব ভাষারীতি গড়ে তুলেছিলেন। সংবাদের চেয়ে ধর্মীয় নীতিকথা ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তথ্য পরিবেশনই দিগ্দর্শনে প্রাধান্য পেত। ফলে এতে থাকত ছাত্রদের উপযোগী ইতিহাস, ভূগোল ও বিজ্ঞানসংক্রান্ত নানা রচনা। নীতি ও ধর্ম শিক্ষা প্রচার করায় তৎকালীন সরকার এই পত্রিকার প্রতি বেশ সদয় ছিল। তার পরও ২৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর দিগ্দর্শন বন্ধ হয়ে যায়।

 

ক. উইলিয়াম বোল্টস ও একটি ব্যর্থ উদ্যোগ

মৌর্য যুগে রাজকর্মচারীদের মধ্যে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি শ্রেণি ছিল, যাদের বলা হতো প্রতিবেদক। সারা রাজ্য ঘুরে রাজ্যের বিভিন্ন খোঁজখবর নিয়ে আসাই ছিল তাদের কাজ। এই চর্চাটিকে ইতিহাসবিদদের অনেকেই আজকের যুগের সাংবাদিকতার সমতুল্য মনে করছেন। এ হিসেবে সাংবাদিকতা বাংলা ভূখণ্ডে চর্চিত হয়েছে খ্রিস্টের জন্মেরও আগে। তবে সাংবাদিকতার ব্যাকরণ মানলে বলতে হবে, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে সংবাদপত্রের জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলে। ওই সময়ে বাংলা ভূখণ্ডে সংবাদপত্র প্রকাশের সঙ্গে যাঁর কথা জানা যায় তিনি হলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস। তবে এখানে সংবাদপত্র প্রকাশের কথা না বলে হয়তো প্রকাশের প্রচেষ্টার কথা বলাই যুক্তিযুক্ত হবে। কেননা তিনি সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও তাতে সফল হতে পারেননি।

জানা যায়, কম্পানির নাম ভাঙিয়ে তিনি নানাভাবে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে লিপ্ত ছিলেন। একসময় বাধ্য হয়ে কম্পানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে তীব্রভাবে তিরস্কার করে। এরপর বোল্টস কম্পানির চাকরি ছেড়ে দেন। তবে মতভেদ রয়েছে, স্থানীয় নবাবদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে ও ওলন্দাজদের সঙ্গে কম্পানির অজান্তে বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়িত থাকার কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে যেভাবেই হোক, কম্পানির সঙ্গে ছেদের পর ১৭৬৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার কাউন্সিল হলসহ আরো কয়েকটি জায়গায় বোল্টসের স্বাক্ষর করা একটি নোটিশ ঝুলতে দেখা যায়; এতে বলা ছিল, দেশে ছাপাখানা না থাকায় ব্যবসাপাতি ও অন্যান্য বিষয়ের খবরাখবর প্রচারের কাজে অনেক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এ অসুবিধা দূর করতে বোল্টস শিগগিরই এ দেশে একটি ছাপাখানা বসাবেন। তাই ছাপাখানা চালাতে সক্ষম কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ সুযোগ দিতে তিনি প্রস্তুত। আর যত দিন না ছাপাখানা বসছে, উৎসাহী ব্যক্তিরা তত দিন পর্যন্ত বোল্টসের বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন সংবাদ ও এ-সংক্রান্ত খবরাখবর নিতে পারবে। এ জন্য সেখানে নানা রকম খবরসংবলিত পত্রপত্রিকা ও পাণ্ডুলিপি রাখা থাকবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সাবেক চাকুরে বোল্টস কম্পানির ভেতরের নানা খবর যে জানতেন, তা কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল না। তাই এই নোটিশ ঝোলানোর পর কম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে উইলিয়াম বোল্টসকে মাদ্রাজ ডেকে নিয়ে সেখান থেকেই জাহাজে করে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এভাবে এ দেশে সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

 

খ. পাপা অব ইন্ডিয়ান প্রেস

উইলিয়াম বোল্টসের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার প্রায় এক যুগ পর ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি শনিবার কলকাতা থেকে ভারতের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘বেঙ্গল গেজেট’ বা ‘ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভার্টাইজার’। জেমস অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত এ পত্রিকাটি অবশ্য ‘হিকির গেজেট’ হিসেবেই বেশি পরিচিতি পায়। কারো কারো কাছে এটি ‘হিকির বেঙ্গল গেজেট’ নামেও পরিচিত ছিল। এটি ছিল তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রিত পত্রিকা এবং এখান থেকে প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি পত্রিকা। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক এ পত্রিকাটির সার্কুলেশন ছিল ২০০ কপি।

পত্রিকাটি ছিল ট্যাবলয়েড আকারের। পারিপাট্য, মুদ্রণের মান, বিষয়বস্তু বা সৌন্দর্য—কোনো দিক থেকেই এটি ঠিক মানোত্তীর্ণ ছিল না। তবে ইতিহাসবিদ ও সমালোচকদের বিচারে, তখন ভারতীয় সমাজে ইউরোপীয় সমাজের যে ছাপটি পড়েছিল, তা ছিল কদর্য, অশালীন ও কলুষ। পত্রিকাকে বলা হয় ‘সমাজের দর্পণ’; সেই বিচারে তখনকার সেই পঙ্কিল আর কদর্য সমাজেরই ছাপ পড়েছিল হিকির গেজেটে। তাই এর ভাষা ও মান ভিন্নতর হওয়ার কোনো কারণ বা সুযোগ ছিল না।

হিকির এই পত্রিকাটির স্লোগান ছিল : একটি সাপ্তাহিক রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পত্রিকা, সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু কারো দ্বারা প্রভাবিত নয় A Weekly Political and Commercial Paper, Open to all Parties, but influenced by none’)। ঐতিহাসিকদের মতে, মূলত তিনটি কারণে হিকি বেঙ্গল গেজেট প্রকাশ করেন : এক. ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া; দুই. সাধারণ মানুষের অধিকার ও তাদের ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন-শোষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা; এবং তিন. ভারতবাসীকে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির আসল চরিত্রটি বোঝানো।

তবে খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি হিকির গেজেট; দুই বছরের কিছু বেশি সময় ধরে প্রকাশিত হওয়ার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রোষানলে পড়ে ১৯৮২ সালের ২৩ মার্চ পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। জানা যায়, ভারতের তখনকার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন হিকি। কথিত ছিল, ওই সময় গভর্নর জেনারেল পরিষদের অন্যতম সদস্য ফিলিপ ফ্রান্সিস ছিলেন হেস্টিংসের কট্টর সমালোচক এবং হিকির পরোক্ষ উৎসাহদাতা। ফ্রান্সিসের ব্যাপারে কখনোই নেতিবাচক কিছু না ছাপা হওয়ায় জনমনে এ ধারণা আরো দৃঢ় হয়। এদিকে সস্ত্রীক হেস্টিংস ও বিচারপতি এলিজা ইম্পে ছিলেন হিকির আক্রমণের মূল লক্ষ্য। আর সেই আক্রমণের ভাষা ক্রমেই কদর্যতর হতে থাকে। ফিলিপ ফ্রান্সিস যত দিন ভারতবর্ষে ছিলেন, তত দিন হিকির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। তবে তিনি ভারত ছাড়ার পর থেকে এক এক করে হিকির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে কম্পানি কর্তৃপক্ষ। প্রথমে ডাক বিভাগের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া, কারাদণ্ড ও শেষে প্রেস বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে হেস্টিংস রীতিমতো পথে বসান হিকিকে। মানহানির দুটি অভিযোগে ১৭৮১ সালের জুন মাসে হিকিকে দুই বছরের কারাদণ্ড ও দুই হাজার রুপি জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়। তবে কারাগারে বসেও হিকি হেস্টিংসের নানা কর্মকাণ্ড ও তাঁর স্ত্রীর সমালোচনা করে লেখা চালু রাখেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে লর্ড হেস্টিংসের আদেশে তাঁর প্রেস দখলে নিয়ে নেওয়া হয়। আর এভাবেই ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ হয়।

ইন্টারেস্টিং যে আরেকজন হিকি, যাঁর নাম উইলিয়াম হিকি, পেশায় লেখক, তিনি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন, হিকি (জেমস অগাস্টাস) তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে সমাজের উঁচু-নিচু সব পদমর্যাদার এবং ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষকে আক্রমণ করতেন; এতে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও আক্রোশও থাকত। এ থেকে হিকি (জেমস অগাস্টাস) তাঁর ব্যক্তিস্বার্থই চরিতার্থ করতে চেয়েছেন, যার চূড়ান্ত ফলস্বরূপ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

জন্মসূত্রে আইরিশ ও কর্মসূত্রে সার্জন হিকি ব্রিটিশদের কাছে ‘ভারতের সংবাদপত্রের জনক’ (Papa of Indian Press) হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর এ পত্রিকা ওই সময় ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থানরত সৈনিকদের কাছে দারুণভাবে জনপ্রিয়তা পায়। এ ছাড়া এটি এ অঞ্চলে সংবাদপত্র প্রকাশে নতুন নতুন উদ্যোগকেও উৎসাহিত করে। অনেক নেতিবাচক সমালোচনা থাকার পরও অনেকেই হিকিকে ‘নির্ভীক সাংবাদিকতার প্রতীক ও পথিকৃৎ’ হিসেবেই বিবেচনা করেন। সাংবাদিকতা আজ মুদ্রণ মাধ্যম থেকে প্রচার ও এখনকার ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইন বা নিউ মিডিয়া পর্যন্ত ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছে; বলা হয়, সাংবাদিকতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যতই এগিয়ে যাক না কেন, ভারতীয় উপমহাদেশে এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে হিকির অবদান স্বীকার করতেই হবে। উল্লেখ্য, ভারতীয় উপমহাদেশের সংবাদপত্রজগতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কলকাতার বিখ্যাত ডেকারস লেনের নাম পরিবর্তন করে জেমস হিকি সরণি করা হয়।

 

 লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা