kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

বাড়ন্ত বাংলাদেশ—চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এক বিস্ময়কর রূপান্তরের উপাখ্যান

ড. আতিউর রহমান

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



চলছে ‘মুজিববর্ষ’। আগামী বছর এই দিনে হবে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। দুটোই আমাদের জন্য খুবই আনন্দের ও গৌরবের উপলক্ষ। তবে আনন্দ উদ্যাপনের এই সময়টায় হঠাত্ বাদ সেধেছে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া এক মানবিক বিপর্যয়। করোনাভাইরাস আমাদের আনন্দ উদ্যাপনে শুধু বাদই সাধছে না, আমাদের এবং বিশ্বের অর্থনীতিকে দারুণ মন্দায় ফেলে দেওয়ার সীমাহীন ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০০৭-০৮-এর বিশ্বমন্দার চেয়েও এই ‘মন্দা’ ভয়াবহ হতে পারে। আর্থিক সুনামির এক ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। এত সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমরা সামনের দিকে এগোতে চাই সাহসের সঙ্গে। আমাদের জনগণ খুবই সহিষ্ণু ও সাহসী। শুধু তাদের সচেতন করতে হবে। উপযুক্ত সতর্কতামূলক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পুরো সমাজকে সচেষ্ট করতে হবে, জাগিয়ে রাখতে হবে। জনগণের প্রাণশক্তির উত্স আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অসামান্য নেতৃত্ব। গত প্রায় অর্ধশতকে ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো আরেক বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের এই অসাধারণ রূপান্তরের গল্পের মহানায়ক তিনিই।

তরুণ রাজনীতিক শেখ মুজিব। বয়স ৩২ বছর। ১৯৫২ সালে গেছেন চীন সফরে। মন ভরে দেখছেন বিপ্লবোত্তর নয়া চীনের অসাধারণ রূপান্তরের নিদর্শনগুলো। আর দেখছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তরুণ প্রজন্মকে। একটি আধুনিক কৃষি ফার্ম দেখার পর তাঁকে অনেক পুরনো স্মৃতিচিহ্ন দেখানো হলো। কিন্তু তাঁর চোখ যে সম্মুখপানে। তাই তাঁর সর্বশেষ বই ‘আমার দেখা নয়া চীন’-এ লিখেছেন, ‘আমার কিন্তু পুরনো আমলের ভাঙ্গা বাড়ী দেখার ইচ্ছা ছিল না। কারণ আমি দেখতে চাই কৃষির উন্নতি, শিল্পের উন্নতি, শিক্ষার উন্নতি, সাধারণ মানুষের উন্নতি।’ কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র অসহযোগিতা সত্ত্বেও তিনি পূর্ব বাংলার কৃষক, শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নীতি সহায়তা ও অর্থায়নের নানা উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সেসব বাস্তবায়ন করে উঠতে পারেননি। উল্টো মন্ত্রিত্ব শেষ হওয়ার পরপরই তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছে অসহিষ্ণু পাকিস্তানি এলিটরা। তাই জেল থেকে বের হয়েই তিনি বলে ওঠেন, পনেরো শ মাইলের ব্যবধানে থাকা দুটো অঞ্চলের এক অর্থনীতি হতে পারে না। তাঁর এই ভাবনাকে আরো পোক্ত করে পাকিস্তানের পূর্বাংশের অর্থনীতিবিদদের গবেষণানির্ভর প্রতিবেদনগুলো। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, মোশাররফ হোসেনসহ অনেকেই এ ‘দুই অর্থনীতি’র কথা বেশ জোর দিয়েই তখন বলছিলেন। ইতিমধ্যে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ ‘দুই অর্থনীতি’র এই বাস্তবতাকে রাজনৈতিক অভিযানের অংশ করে ফেলে। ১৯৬১ সালে লাহোরে এক সম্মেলনে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান স্পষ্ট করেই শেখ মুজিবের ‘দুই অর্থনীতি’র মূল ভাবনাকে সমর্থন জানান। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের কৌশলগত অসহায়ত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁর ‘দুই অর্থনীতি’র ভাবনাকে আরো পোক্ত করে। অর্থনীতিবিদরাও অঙ্ক করে দেখান যে ১৯৫১-৫২ থেকে ১৯৫৯-৬০ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান দেশের মোট রাজস্ব আয়ের ৬০ শতাংশ জুগিয়েছে। আর এ অঞ্চলে রাজস্ব ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। পূর্ব পাকিস্তান রপ্তানি আয় করেছে ৫৯ শতাংশ। অথচ মোট আমাদানি ব্যয়ের মাত্র ৩০ শতাংশ পেয়েছে। দেশের মোট বৈদেশিক সাহায্যের মাত্র ৪ শতাংশ পেয়েছে পূর্ব পাকিস্তান।

এমন বৈষম্যের বাস্তবতায় শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করলেন বাঙালির ‘বাঁচার দাবি’ ছয় দফা। আর অবধারিতভাবেই তাঁকে সে কারণে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যান্য রাজবন্দিসহ তাঁর মুক্তির দাবিতে ৭ জুন যে ধর্মঘট পালন করা হয় তাতে অনেকে শহীদ হন। আর জেলে ভরা হয় অসংখ্য কর্মী ও নেতাকে। এরপর দ্রুত লয়ে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পরিবর্তন হয়। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার এক নম্বর অভিযুক্ত হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজানো হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার আন্দোলনে তিনি মুক্ত হন। ছাত্র-জনতাই তাঁকে ভালোবেসে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়। আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের অধীন নির্বাচনে গিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসতে পারল না। অসহযোগ আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ২৫ মার্চ ১৯৭১ ঘটে নির্মম গণহত্যা। আর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। মূলত মুক্তিযোদ্ধা, কৃষক-সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে আসে স্বাধীনতা। বন্দি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বীরের বেশে ফিরে আসেন মুক্ত বাংলাদেশে। শুরু করেন বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার এক অবিস্মরণীয় সংগ্রাম।

অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের মূল শক্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া জাতির লড়াকু মন আর বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার এক অমূল্য আনুগত্য। বৈরী বিশ্ব কূটনীতি। বৈরী প্রকৃতি। ধ্বংস অবকাঠামো। চালের গুদাম শূন্য। বাড়িঘর ভস্মীভূত। এক কোটি শরণার্থী দেশে ফিরছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক ডলার রিজার্ভ নেই। গচ্ছিত টাকাও হানাদার বাহিনী মতিঝিলে পুড়িয়ে ফেলেছে। পাকিস্তানি উদ্যোক্তারা কলকারখানা ফেলে চলে গেছে। বন্দরে মাইন পোঁতা। সেতুগুলো বিধ্বস্ত। রেল ও নদীপথের কার্গো বিধ্বস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলেছে, ‘বাংলাদেশ এক আন্তর্জাতিক তলাবিহীন ঝুড়ি।’ মালথুসিয়ান তত্ত্বের উত্তম উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশ। এমন প্রতিকূল পরিবেশে বঙ্গবন্ধু স্বদেশের হাল ধরেন। মাত্র দেড় বছরেই জাতিকে উপহার দেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিল। এই দলিলের মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘দেশের জন্য সুবিন্যস্ত ও সমন্বিত নীতি ও কর্মসূচীর রূপরেখার আওতায় উপযুক্ত নির্দেশনা দেবার জন্য এমন তাড়াহুড়ো করে এই পরিকল্পনা দলিল তৈরি করা হয়েছে।’ ওই পরিকল্পনা দলিলের মূল প্রণেতা তত্কালীন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘রাজনৈতিক লক্ষ্যসমূহের সাথে সমন্বয় করে যে ধারার সামাজিক রূপান্তরের প্রয়োজন ছিল সেইভাবেই তৈরী করা হয়েছে এই পরিকল্পনা দলিল।’

খুব নিষ্ঠার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠনের কাজে নেমে পড়েছিলেন। সব মানুষকে সমবেত করে তিনি উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে শুরু করেন। তাঁর এই নয়া উন্নয়নের কৌশলের তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল :

১. আত্মনির্ভরতা। জাতীয় সম্পদের ওপর নির্ভর করেই যতটা সম্ভব পথ চলা।

২. অগ্রাধিকার খাতগুলোর উন্নয়নের জন্য শর্ত সাপেক্ষে বিদেশি সাহায্য গ্রহণ করা। তবে ধীরে ধীরে তা কমিয়ে ফেলা।

৩. রাষ্ট্রীয় খাতের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতকেও উত্সাহ দেওয়া। বাহাত্তরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ২৫ লাখ টাকা। ১৯৭৪-৭৫ সালের বাজেটে তা তিন কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। শেষ দিকে কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য বাধ্যতামূলক সমবায়ব্যবস্থা চালু করলেও জমির মালিকের কাছ থেকে জমি কেড়ে নেননি। এটা ছিল এক রূপান্তরবাদী সংস্কার কর্মসূচি।

এসব কৌশল কাজ করছিল। রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যবস্থাপনা সংকট, প্রলম্বিত বন্যা ও খাদ্যসংকট, পিএল-৪৮০-নির্ভর খাদ্য সহযোগিতা বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশের ভগ্ন অর্থনীতি উঠে দাঁড়াচ্ছিল। তবে খাদ্যসংকট তখন তীব্র ছিল। দুর্ভিক্ষ-অবস্থা মোকাবেলা করতে তাঁকে বেগ পেতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও অর্থনীতি ছিল বেশ বাড়ন্ত। বাহাত্তরে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৯৩ মার্কিন ডলার, পঁচাত্তরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭২ ডলার। অথচ ১৯৭৬ সালে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তা নেমে যায় ১৩৮ ডলারে। এর পরের বছর তা আরো কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১২৮ ডলারে। ব্যক্তি খাতকে ভারসাম্যহীনভাবে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে পরবর্তী সরকারগুলো অর্থনীতিতে বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দেয়। ফলে প্রবৃদ্ধি কমে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য কমানোর গতি কমে যায়।

বর্তমান সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের দিকে তাকালে দেখা যায়, কী অভূতপূর্ব অগ্রগতিই না বাংলাদেশ করেছে! ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩.৪ শতাংশ, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তা এসে দাঁড়িয়েছিল ৫.৭ শতাংশে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সেটি দাঁড়িয়েছে ৮.১ শতাংশে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। ১৯৯০-৯১ সালে বেসরকারি বিনিয়োগ যেখানে ছিল মাত্র ৭৩.৩ বিলিয়ন টাকা, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় তা ছিল ৩০৪.৪ বিলিয়ন টাকা। মাত্র ১০ বছরে তা প্রায় সাত গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৭১.২ বিলিয়ন টাকায়। রাষ্ট্রীয় খাতে মেগাপ্রকল্প গ্রহণসহ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিপুল বিনিয়োগ ঘটেছে গেল দশকজুড়েই। রুগ্ণ একটি বেসরকারি খাতকে বর্তমান সরকার রূপ দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির এক যোগ্য অংশীদার হিসেবে। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১১৩ বিলিয়ন টাকা, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তা হয়েছিল ১৫৪৩.৩ বিলিয়ন টাকা। মাত্র ১০ বছরে তা প্রায় তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯৩৪.১ বিলিয়ন টাকায়।

আমাদের বেসরকারি খাতের এই অগ্রগতি জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান দেখলে আরো ভালোভাবে বোঝা যায়। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল মাত্র ২১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশে, যা প্রায় দ্বিগুণ। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ছিল মাত্র ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যা ছিল সাত হাজার ৯১৫ মিলিয়ন ডলার। ১০ বছরে তা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে ১৬ হাজার ৪২০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এবং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে ঈর্ষণীয় গতিতে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরের ৭৬৮.৬৯ ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৮৮৯ ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ছিল ছয় হাজার ১৪৯ মিলিয়ন ডলার, যা পাঁচ গুণ ছাড়িয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হয়েছে ৩২ হাজার ২৩৬ মিলিয়ন ডলার। যেকোনো বড় ধরনের দুর্যোগ আমরা এই বিশাল রিজার্ভ দিয়ে সামলে উঠতে পারার ক্ষমতা রাখি। পাশাপাশি পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের সাহসও দেখাতে পারছি এ কারণেই।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এমন নিরবচ্ছিন্ন গতিধারার কারণে দেশের মানুষ একটি আধুনিক ও উন্নত জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন মধ্যম-ধনিক শ্রেণির (গরফফষব ধহফ অভভষঁবহঃ ঈষধংং–গঅঈ) সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে আমাদের ভোগ্য পণ্যের বাজার শক্তিশালী হচ্ছে। ২০১৫ সালে যেখানে ম্যাক জনসংখ্যা ছিল ১১.৭ মিলিয়ন, ২০২০ সালে তা হবে ১৯.৩ মিলিয়ন। প্রতিবছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে ৩৩টি শহরে এ ধরনের মধ্যম-ধনিক শ্রেণিভুক্ত লোকের সংখ্যা তিন কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ২০১১ সালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেন শুরু করে বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিপ্লব ঘটেছিল। সেই বিপ্লব অব্যাহত রেখে মাত্র ৯ বছরে দেশের সাত কোটি ২০ লাখ লোক এখন সেবা গ্রহণ করে নিজেদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে, যার ফলে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো হয়তো অনেক কিছুই আমাদের আছে। কিন্তু এর পরও এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার আছে। আমাদের প্রতিবছর ১৬ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতার কথা মাথায় রেখে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার করতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না করে রপ্তানির বহুমুখীকরণ ঘটিয়ে নতুন নতুন বাজার ধরতে হবে। এসডিজির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের প্রতিবছর কৃষি উত্পাদন বাড়াতে হবে প্রায় দ্বিগুণ। দ্রুতগতির নগরায়ণের ফলে নগর দারিদ্র্য হবে নতুন একটি চ্যালেঞ্জ।

চলমান করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব একটি মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনলেও এর প্রভাব অর্থনীতির ওপর দ্রুতই পড়ছে। আমরা যদি অভ্যন্তরীণ চাহিদা ধরে রাখতে পারি, আমাদের শ্রমজীবী মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে পারি এবং আমাদের সফল উদ্যোক্তাদের রাজস্ব ও আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে পারি, তাহলে এই বিপর্যয় থেকে নিশ্চয়ই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। অতীতে আমরা এভাবেই বড় বড় বিপর্যয় মোকাবেলা করেছি। এবারও আমাদের সেভাবে বাঁচতে হবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা