kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

এসডিজি ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ক্রম অগ্রগতির সম্পর্ক

রেজা সেলিম

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দীর্ঘ আলোচনা ও গবেষণা শেষে ২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করে, যা সর্বমহলে এসডিজি (ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়েধষং) নামে পরিচিত। ১৯৫টি সদস্য দেশের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৭টি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (যার নির্দেশিত লক্ষ্য মোট ১৬৯) গৃহীত হয়। উল্লেখ করা হয় যে ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবে, যাতে পৃথিবী একটি মানবিক, ক্ষুধা ও বৈষম্যহীন আধুনিক সমাজে বিকশিত হতে পারে। এই প্রধান ১৭টি লক্ষ্য হলো—১। দারিদ্র্য বিলোপ ২। ক্ষুধামুক্তি ৩। সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ ৪। মানসম্মত শিক্ষা ৫। নারী-পুরুষের সমতা ৬। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ৭। সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি ৮। যথোচিত কর্ম ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৯। শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো ১০। অসমতা হ্রাস ১১। টেকসই নগর ও সমাজ ১২। দায়িত্বশীল ভোগ ও উত্পাদন ১৩। জলবায়ু কার্যক্রম ১৪। জলজ জীবন ১৫। স্থলজ জীবন ১৬। শান্তি ও ন্যায়বিচার কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং ১৭। লক্ষ্য পূরণে অংশীদারি।

এই লক্ষ্যগুলো সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের ধারণা স্বচ্ছ নয়। অনেকে মনে করে, এগুলো জাতিসংঘ নির্ধারণ করেছে এবং জাতিসংঘই বাস্তবায়ন করবে। এই ধারণা ভুল। এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবে দেশগুলোকেই তার নিজস্ব কৌশল গ্রহণ করে; যে কারণে বাংলাদেশসহ প্রায় সব দেশ এসডিজি বাস্তবায়নে নিজস্ব কৌশলপত্র গ্রহণ করেছে এবং অনুসরণ করছে। জাতিসংঘ প্রতিশ্রুত দেশগুলোকে এসডিজি বাস্তবায়নে যথাসম্ভব আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে। এ ছাড়া প্রতিবছর জুলাই মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ তার সদর দপ্তরে এসডিজি অগ্রগতি পর্যালোচনা করে, বাংলাদেশ তাতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। এর ফলে বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলো নিজেদের অগ্রগতি তুলনা করতে পারে এবং ভুলত্রুটি বিবেচনা করে তা প্রয়োজনে নতুন করে গুছিয়ে নিতে পারে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের জন্য তথ্য-প্রযুক্তি উন্নয়নের পথপরিক্রমা বিশেষ মসৃণ কখনোই ছিল না। স্বাধীনতার পরে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সামলে নিয়ে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুকেও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু সেকালের সব শক্তিমান আর কুচক্রীমহলের চোখ-রাঙানি উপেক্ষা করেই নিজেদের টাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল পরিত্যক্ত বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু এটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু এ রকম উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নিজেদের সক্ষমতায় মহাকাশ সম্পদ আহরণের কাজকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণের মাধ্যমে ২০১৮ সালের মে মাসে চূড়ান্ত পর্যায়ে এগিয়ে নিয়েছেন তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী সাহসিনী শেখ হাসিনা। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই উদ্যোগ তাই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই মহাকালে থেকে যাবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় ভারতের ‘আর্যভট্ট’ উেক্ষপণের মাধ্যমে এই উপমহাদেশের কোনো দেশের প্রথম মহাকাশে প্রবেশের সুযোগ ঘটে।  চীনের সহায়তায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এরই মধ্যে নিজেদের উপগ্রহব্যবস্থায় নাম লেখালেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যতিক্রম, যে নিজের উদ্যোগে এবং নিজের আর্থিক ভরসা ও দায়িত্বে মহাকাশে প্রবেশে নাম লিখিয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর ইতিমধ্যে সফল উেক্ষপণ হয়েছে, যা বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প নিয়ে বাংলাদেশ এখন যে স্থানে পৌঁছেছে তার মধ্যে কয়েকটি মাইলফলক আওয়ামী লীগ সরকারের হাতেই ঘটেছে, কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াও ইতিহাসের প্রয়োজনে আমরা এই বিবেচনা বাদ দিতে পারি না। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ১৯৯৬ সালে জিএসএম মোবাইল ফোনের অনুমোদন এবং প্রায় একই সময়ে ইন্টারনেট চালু করা মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশের পটভূমি তৈরি করেছিল, এ কথা আমরা এখন বলতেই পারি। ফলে আজ প্রযুক্তির পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ যে জগতে প্রবেশ করেছে সে অর্জন ধরে রাখতে হলে এসডিজির মৌলিক শর্তগুলো আমাদের অবশ্যই পালন করতে হবে। বুঝতে হবে কোথায় আমাদের কী কী করণীয়।

আমরা লক্ষ করেছি, এসডিজি বাস্তবায়ন কৌশলে বাংলাদেশের জন্য প্রায় সব লক্ষ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের বাস্তবায়নাধীন এই কৌশলগুলোর সঙ্গে তথ্য-প্রযুক্তির সম্পর্ক ও ভূমিকা কী তা নিয়েও জাতিসংঘ গবেষণা করেছে এবং তার অঙ্গসংস্থা আইটিইউ সম্প্রতি একটি নির্দেশক প্রকাশ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য এই নির্দেশকগুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজনীয়।

২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে যে কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে, আমাদের বিশ্বাস, আইটিইউ প্রণীত এই বিবেচনাগুলো তাতে রাখা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে এ বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

 লেখক : পরিচালক

আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্য-প্রযুক্তি প্রকল্প

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা