kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

বাংলাদেশের কৃষি, ৫০ বছরের অগ্রযাত্রা

কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশের বিগত পঞ্চাশ বছরের কৃষিকে আমরা স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর তুলনাচিত্রে চিহ্নিত করতে পারি। এই পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদের কৃষি যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা এককথায় অনন্য। এই অগ্রগতি অর্জনের প্রধান প্রেরণা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ ও জাতির মর্যাদা অর্জন, আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার সামর্থ্য।

আগের চিত্র : পঞ্চাশ বছর আগে এ দেশ যখন পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল, তখন এ দেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য ছিল প্রকৃতিনির্ভর অর্থাত্ কৃষকের জীবন-জীবিকা নির্বাহের কৃষি। বিগত শতকের মধ্যাংশে পৃথিবীজুড়ে কৃষি বিপ্লবের জোয়ার সৃষ্টি হলেও তার ছোঁয়া শাসকগোষ্ঠীর অবজ্ঞা-অবহেলার কারণে এ দেশে লাগেনি। সবুজ বিপ্লবের মূল পাথেয় ছিল উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত, উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি, রাসায়নিক সারের প্রয়োগ এবং সম্পূরক সেচব্যবস্থার প্রবর্তন। পশ্চিম পাকিস্তানে এসব নিয়ে কর্মতত্পরতা লক্ষ করা গেলেও পূর্ব পাকিস্তানে এর প্রভাব ছিল ক্ষীণ।

তখন এ দেশের কৃষকের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। গ্রামগুলো হতশ্রী—মাটির ঘর, ছনের চাল। কৃষকের জীবনচিত্র ছিল আরো হতশ্রী—সারা বছর দুই বেলা ভাত জুটত না। আবার আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গা-অনটন ছিল নিয়তির লিখন। এর সঙ্গে খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে কৃষকের জীবন হয়ে উঠত সংকটাপন্ন। পশুশক্তি ও নিজের শ্রমশক্তিকে সম্বল করে কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হতো কৃষকসমাজকে। তখনো এ দেশে এক কোটি ১০ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমি ছিল। মাথাপ্রতি জমির পরিমাণ ছিল গড়ে দশমিক ১৮ হেক্টর। কৃষিতে ৮০ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োজিত থাকত। দানাজাতীয় ফসলের উত্পাদন থেকে বার্ষিক দেশজ চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশ মেটানো যেত। বাকি ৪০ শতাংশের জন্য নির্ভর করতে হতো বিদেশ থেকে আমদানির ওপর। ফল, ফুল, শাক-সবজি, দুধ, ডিম, মাংসের উত্পাদন ছিল মূলত পরিবারকেন্দ্রিক।

আজকের চিত্র : আজ পঞ্চাশ বছর পর আমাদের কৃষিচিত্র হয়ে উঠেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত, গ্রামীণ জীবন হয়ে উঠেছে নানা বর্ণ-রেখায় উজ্জ্বল। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের প্রচেষ্টায় আজ আমরা এই স্তরে উঠে এসেছি। এখন আমাদের মাথাপিছু চাষযোগ্য জমি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দশমিক ৮ হেক্টরে। জনসংখ্যা হয়েছে ১৭ কোটির কাছাকাছি। এই অবস্থা সত্ত্বেও আমরা গত বছর প্রায় চার কোটি ৪৬ লাখ টন দানাজাতীয় খাদ্য উত্পাদন করেছি, যা পঞ্চাশ বছর আগের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ। আমাদের মোট জাতীয় আয় ১৯৭২ সালের তিন বিলিয়ন ডলার থেকে এ বছর ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যার শতকরা ১৫ ভাগ এসেছে কৃষি থেকে। দানাজাতীয় খাদ্যের পাশাপাশি ফলমূল, শাক-সবজি, ডাল, মসলা, তেল—প্রায় ক্ষেত্রে আমাদের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। আলু ও ভুট্টা চাষে বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। এ বছর আলু উত্পাদন এক কোটি ১৫ লাখ টন এবং ভুট্টা উত্পাদন ৫০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের উত্পাদন গড় বার্ষিক ৪০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে এ বছর ৪৩ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। মাছে-ভাতে বাঙালির এই পুরনো ঐতিহ্য নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর পাশাপাশি ডিম, দুধ, মাংসের উত্পাদনও ক্রমবর্ধমান।

এই অভূতপূর্ব অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে সরকারের যুগান্তকারী নীতি সমর্থন, কৃষিশিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ, উপকরণ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন এবং সর্বোপরি কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষক ভাইদের বিপুল শ্রমে। কৃষির নিবিড়করণ, বৈচিত্র্যকরণ, যান্ত্রিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের পথ ধরে পঞ্চাশ বছরের খোরপোশ কৃষি আজকের স্তরে উঠে এসেছে। আজকের কৃষিতে পশুশক্তির ওপর নির্ভরতা এবং কৃষকের শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি লাঘব হয়েছে। তার স্থান নিয়েছে যন্ত্র পরিপূরক সরঞ্জাম।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা : আমাদের কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে আজ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে তা যেমন সংহত ও টেকসই করতে হবে, তেমনি ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি এবং ২০৪৪ সাল নাগাদ উন্নত দেশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরো বেগবান হতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তা হলো—

১. আবাদযোগ্য কৃষিজমির অকৃষি খাতে ব্যবহার রোধকরণ ২. জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার উপযোগী নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার ও প্রয়োগ ৩. কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনকল্পে প্রক্রিয়াকরণ ৪. পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্যের উত্পাদন ও বিতরণব্যবস্থা সুসংগঠিতকরণ ৫. কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা কৃষক ও ভোক্তাবান্ধবকরণ ৬. মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সুরক্ষা ৭. কৃষিশিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ, কৃষক ও বাজারব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয়করণ ৮. সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ও সমন্বয়করণ ৯. কৃষিতে ই-সেবা জোরদারকরণ।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য কৃষির প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। আর তা করতে হলে ভৌত অবকাঠামো ও কারিগরি সুবিধাদি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উচ্চ ও ফলপ্রসূ বিনিয়োগ চাই। আশা করি শুধু কৃষিবান্ধব নয়, জনবান্ধব বর্তমান সরকার উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষি উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সম্ভব সব কিছুই করবে।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা