kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ক্রীড়াঙ্গনে অর্জন অসাধারণ না হলেও কম নয়

ইকরামউজ্জমান

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




ক্রীড়াঙ্গনে অর্জন অসাধারণ না হলেও কম নয়

ছবি : মীর ফরিদ

আমরা নিজেদের রাষ্ট্র পেয়েছি ১৯৭১ সালে। এর আগে রাষ্ট্র নামে জাতির এই বৃহত্তম সংগঠনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল না। বাঙালি ক্রীড়া সংগঠন গড়ে তোলা এবং ক্রীড়াচর্চা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে একাত্তরের স্বাধীনতার পর। সুযোগ পেয়েছে ক্রীড়াঙ্গনে ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর। স্বাধীনতা ক্রীড়াঙ্গনে বাঙালির ভাগ্য বাঙালিদের নির্ধারণের ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে। শুরু হয়েছে বাঙালির ক্রীড়া সংগঠনের যুগ। উদ্যোক্তাসুলভ গুণ কম মানুষের ছিল। সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব ছিল।

ক্রীড়াঙ্গনে সংগঠকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রতিষ্ঠা সহজ বিষয় নয়। ক্রীড়াঙ্গনের সুবিধার জন্য, ভালোর জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ—এই ধারণাও তো বেশির ভাগের কাছে নতুন। ২৪ বছর পাকিস্তানি আর পাঞ্জাবিরা ক্রীড়াঙ্গনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ক্রীড়াঙ্গনে ছিল না কোনো আদর্শ ও নীতি। ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মর্যাদায় পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠকরা উপেক্ষিত হয়েছেন। শুরু থেকেই পাকিস্তানে বাঙালিরা অপরিসীম বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।

স্বাধীনতা বাঙালির অনাবিষ্কৃত শক্তিকে অবমুক্ত করে দিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তি ও সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠন করেন। আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক কাজী আনিসুর রহমানকে। অলিম্পিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ থেকে কাজী আনিসুর রহমানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তখন ক্রীড়ামন্ত্রী ও বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মো. ইউসুফ আলী। ১৯৭৪ সালের ৩০ জুলাই জাতীয় সংসদে জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিল পাস হয়েছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশের মধ্যে, ঢাকা স্টেডিয়ামে। এই প্রদর্শনী ম্যাচের উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু শুধু ম্যাচ উদ্বোধন করেননি, মাঠে  বসে পুরো খেলা দেখেছেন। উত্সাহিত করেছেন খেলোয়াড় ও সংগঠকদের। বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই রাষ্ট্রীয় কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভেবেছেন। ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে তাঁর ভিশন ছিল। স্বপ্ন ছিল। তিনি সব সময় বলেছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে শূন্য থেকে পূর্ণ করে তুলতে হবে। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নতুন দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে দাঁড় করানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ইতিহাসের চাকা ক্রীড়াঙ্গনে ঘুরবে সামনের দিকে। ক্রীড়াঙ্গনে ব্যক্তির প্রাধান্য, তীব্র ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সুযোগ নেই!

১৯৭২ সালে আমরা ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, ভলিবল, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, জিমনাস্টিকস, বাস্কেটবল এবং বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় আমরা দেখেছি যাঁরা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ফেডারেশন ও সংস্থায় দায়িত্বে এসেছেন তাঁরা সবাই নিবেদিত ও পরীক্ষিত সংগঠক। বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি। ফেডারেশন ও সংস্থার কর্মকাণ্ডে সম্মিলিত অংশগ্রহণ। প্রতিটি স্তরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন। পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গন মানসিকতা থেকে মুক্ত বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গন। ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, সমৃদ্ধিশালী করার জন্য যুবসমাজের শক্তি, সাহস, বিশ্বাস, সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। ক্রীড়াঙ্গনে সংগঠকদের দায়িত্বশীল আচরণ। আচরণের মাধ্যমে দায়িত্বশীলতার পরিচয়। পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনকে ২৪ বছর ধরে খুব ভালোভাবে গড়তে পারার অভিজ্ঞতায় বলেছেন, সহিষ্ণুতার সঙ্গে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। নৈতিক মূল্যবোধের বিকল্প নেই। ক্রীড়াঙ্গন ঢেলে সাজানোর আন্দোলন শুরু হলে মানসিকতা এমনিতেই বদলাবে। ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসতে বাধ্য।

সংস্কৃতি বদলালেই ক্রীড়াঙ্গন এগিয়ে যাবে। এর জন্য কাজ এবং সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন আছে।

আজ স্বাধীনতা দিবস, ২৬ মার্চ। জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গৌরবময় দিন। ১৯৭১ সালে আমাদের প্রাণপ্রিয় রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আর এই জাতীয়তাবাদ ছিল ভাষাভিত্তিক, যাকে আমরা বলি বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এটাই সত্য, বাঙালিদের পরিচয়ের ভুল ঠিকানা ছিল পাকিস্তান। ইংরেজদের কাছ থেকে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা পেয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অন্যভাবে। স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২৩ বছরের মধ্যে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে। আর এই নির্বাচনে ‘ক্যারিসমেটিক’ নির্ভার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়ী হয়। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান সামরিক জান্তা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধু তথা পূর্ব বাংলার মানুষকে বাধ্য করে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে। আর এই যুদ্ধে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

সময়ের হিসাবে বাংলাদেশের বয়স প্রায় পাঁচ দশক অর্থাত্ পঞ্চাশ বছর হতে চলেছে। আগামী বছর জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে। মুজিব শতবার্ষিকীতে এবারের স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব আলাদা। স্বল্প সময়ের মধ্যে ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ সব সময় স্মরণীয়। ক্রীড়াপিপাসু বঙ্গবন্ধু দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছেন, যে  প্রত্যাশা করেছেন—এটার মূল্যায়ন হবে জাতির জনকের প্রতি সত্যিকারের সম্মান প্রদর্শন। বঙ্গবন্ধু যে ক্রীড়াঙ্গনের স্বপ্ন দেখেছেন, সেখানে বর্তমান বাস্তবতায় আমরা কোথায় আছি? কিভাবে আছি? মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র ও সামগ্রিক ন্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সব ধরনের অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের অবসান। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হবে আইনের শাসনের  ভিত্তিতে!

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপর আমাদের ক্রীড়াঙ্গন যে পর্যায়ে ছিল, সেই পর্যায় থেকে আমরা এত দূর এগোব কল্পনা করতে পারিনি। বিশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বের সব দেশকে পরাজিত করেছে। টেস্ট ক্রিকেটে পরাজিত করেছে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী  দলকে। ওয়ানডে বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলেছে। বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেট অনুষ্ঠানের স্বাগতিক দেশ হয়েছে। বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেছেন। এশিয়া টি-টোয়েন্টি কাপে পাকিস্তান ও ভারতকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ২০১০ সালে চীনের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ পুরুষ দল স্বর্ণপদক আর নারী দল রৌপ্যপদক জিতেছে। বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে বেশ কয়েকবার বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার মনোনীত হয়েছেন। ২০১৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ।

বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক  ফুটবলে সাফল্য পেয়েছে কিশোরী ও তরুণী ফুটবল দল। নারী ফুটবলাররা এশিয়ান পর্যায়ের ফাইনাল রাউন্ডেও খেলেছেন। সমাজের এমন এক স্তর থেকে উঠে এসে প্রত্যয় ও দৃঢ়তার সঙ্গে এ দেশের ফুটবলে নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বয়সভিত্তিক ফুটবলে পুরুষদের সাফল্যও চোখে পড়ার মতো। দেশে প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে বঙ্গমাতা ও বঙ্গবন্ধু ফুটবল শুরু করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এশিয়ার কোনো দেশে লাখ লাখ বালক-বালিকার অংশগ্রহণে এ ধরনের কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয় না। বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল সংগঠক মাহফুজা আক্তার কিরণ ফিফার গভর্নিং বডির সদস্য হয়েছেন। দেশের জন্য এটি অনেক বড় গৌরবের বিষয়। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ২০তম এশিয়ান যুব ফুটবলের আয়োজন করে।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন এগিয়ে চলেছে। সঞ্চয় আমাদের বাড়ছে। সাফল্যের তালিকা আরো হয়তো বড় হতে পারত—সেটি কেন হয়নি এটা অবশ্যই ভাবার বিষয়। ৪৯ বছরেও ক্রীড়াঙ্গনে বাস্তবধর্মী ক্রীড়ানীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ক্রীড়াঙ্গনে বিভিন্ন খেলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয় করা হয়নি। ক্রীড়াঙ্গনে নারী খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদরা এখনো  অবহেলিত এবং জেন্ডার বৈষম্যের শিকার। অথচ দেশকে মহিমান্বিত করার ক্ষেত্রে তাঁরা কিন্তু এগিয়ে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা