kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ

তুহিন ওয়াদুদ

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ

ছবি : লুত্ফর রহমান

বিবিধ ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে বাংলাদেশের পথচলা হয়ে উঠেছে গৌরবের। ইতিহাসের পাতায় অমোচনীয় কালো দাগ যেমন আছে, তেমনি আছে গর্ব করার মতো কিছু অর্জন। সাক্ষরতা ও শিক্ষায় আমাদের সে রকমই এক অর্জন বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অনেক সময় দৃষ্টান্ত।

যখন এ দেশ স্বাধীন হয় তখন দেশটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত। ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণ, কয়েক লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি আর সীমাহীন সম্পদের বিনিময়ে অর্জিত হয় এই দেশ। দীর্ঘ ৯ মাস এ দেশটি যুদ্ধই করেছে। তার আগেও এ দেশের অবস্থা ভালো ছিল না। দীর্ঘ ২৩ বছর পশ্চিম পাকিস্তানিরা শোষণ করেছে। তার আগে ১৯০ বছর ব্রিটিশরা শোষণ করেছে। ২১৩ বছরের প্রত্যক্ষ শোষণের পরে জন্ম নেওয়া একটি দেশ বাংলাদেশ।

জন্মলগ্নে বাংলাদেশের শিক্ষার হাল

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভ করে তখন দেশের উন্নয়নমূলক সব সূচকই ছিল ভঙ্গুর। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতি কোনোটারই অবস্থা ভালো ছিল না। এগুলোর মধ্যে শিক্ষার অবস্থা ছিল তলানিতে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় মোট জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষিত মানুষ ছিল সামান্যই। ১৯৭৪ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ২৬.৮ শতাংশ। অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সংখ্যাও ছিল নগণ্য। যে সামান্য মানুষ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ছিল তারা ছিল প্রথম প্রজন্ম।

শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার ঐতিহাসিক কারণ

বাংলাভাষী মুসলমান এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী—কেউই শিক্ষার প্রতি অনুরাগী ছিল না। সনাতন ধর্মের বর্ণবৈষম্যই ছিল শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। মুসলমানদের মধ্যে ছিল রক্ষণশীলতা। মুসলমানদের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেকেই চাকরির প্রয়োজনে ফারসি শিখেছিল। ব্রিটিশরা ক্ষমতা নেওয়ার পর ইংরেজি ভাষার বিস্তার হলেও এ অঞ্চলের মুসলমানরা সেই ভাষাকে খ্রিস্টানদের ভাষা আখ্যা দিয়ে ইংরেজি গ্রহণ থেকে দূরে ছিল। যদিও দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন মুসলমানরা বাংলা-ইংরেজি শেখাকে অমুসলিমদের ভাষা হিসেবে গণ্য করত। যা হোক, শেষ পর্যন্ত চাকরির প্রয়োজনে তারা বাংলা ও ইংরেজি গ্রহণ করতে শুরু করে।

সাক্ষরতায় অগ্রগতি

বাংলাদেশে গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ। সাক্ষরতার এই পর্যায়ে পৌঁছার জন্য সরকারকে কার্যকর অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয় করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয় করেছেন। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের এসব প্রতিষ্ঠান শিশুদের মধ্যে প্রাথমিক পাঠ সম্পন্ন করতে অনেক বড় সহায়তা করেছে।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা

ঝরে যাওয়া শিশুদের এবং যারা পরিবেশ না পেয়ে পাঠ গ্রহণ করতে পারেনি তাদের জন্য সরকার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করেছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনেক চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, বয়স্করা যখন শিক্ষা গ্রহণ করে তারা সেই শিক্ষার প্রয়োগ না থাকার কারণে অনেক সময় এই শিক্ষা ভুলে যাচ্ছে। উপানুষ্ঠানিক এবং বয়স্ক শিক্ষা সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক।

দারিদ্র্যের কাছে শিক্ষা হার মানেনি

অবৈতনিক পাঠ শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। মেয়েদের উপবৃত্তি শিক্ষার ধারাবাহিকতা বাঁচিয়ে রেখেছে। শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিস্কুটের ব্যবস্থা করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মনে হলেও সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। অনেক শিশু দুপুরে স্কুলে বিনা মূল্যের বিস্কুটের জন্য আসতে আগ্রহী হয়েছে। এখন অনেক স্কুলেই চালু হয়েছে দুপুরে গরম খাবার—‘মিডডে মিল’। প্রাথমিক, মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে শিশুরা যেন ঝরে না পড়ে তার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করার কারণে শিশুরা পাঠগ্রহণে সহজেই যুক্ত থেকেছে। আবার বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজে একসময় ব্যাধির মতো ছিল। এখন সেটি অনেকখানি কমে এসেছে।

ব্যাঙের ছাতার মতো শিক্ষাছাতা

আমরা দেশের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক সমালোচনা করি সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় অবদান রেখে চলেছে। সেগুলো হচ্ছে আমাদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেটি প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত। আমাদের দেশের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে স্থানীয় ব্যক্তিদের উদ্যোগে। সরকারের বিভিন্ন আইনের ফাঁক গলে এগুলো প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। নিবন্ধন পদ্ধতি আসার আগ পর্যন্ত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়োগে ছিল সীমাহীন দুর্নীতি। এখন নিয়োগের দুর্নীতি-অনিয়ম কমেছে।

চোখ খুলতে শুরু

শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে আপামর জনগণ। এখন যে পরিবারের সদস্যরা দিন আনে দিন খায়, এমন অনেক পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও লেখাপড়া করছে। শিক্ষাকেন্দ্রিক সবারই একটা স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। উঁচু স্তরের মানুষের পাশাপাশি সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষও আজকাল বুঝতে শিখেছে, শিক্ষার বিকল্প নেই।

প্রতিকূলতায় অপ্রতিরোধ্য শিক্ষার বিস্তৃতি

সাক্ষরতার বিবেচনায় সরকার নিরক্ষরমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য বদ্ধপরিকর। সরকার যে সময়ের মধ্যে সমাজকে নিরক্ষরমুক্ত করার কথা বলেছে সেই সময়ের মধ্যে করতে পারেনি। কিন্তু অগ্রগতি থেমে নেই।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দেশজুড়ে নেমে আসে ঘন অমানিশা। সেনাতন্ত্রের হাতে চলে যায় দেশ পরিচালনার ভার। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সেনাতন্ত্রের হাতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হেঁটেছে এই দেশ। তার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি আমাদের অপ্রতিরোধ্য।

শিক্ষার ফলাফল

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বেছে বেছে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। জাতিকে হয়তো জ্ঞানশূন্য করার লক্ষ্যেই এ কাজ করেছে পাকিস্তানি এবং পাকিস্তানের এদেশীয় দোসররা। আমাদের দেশশত্রুরা। তার পরও শিক্ষার পথে সরকারের অকৃত্রিম আন্তরিকতা আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বুদ্ধিজীবীদের শূন্যতা কোনো দিন পূরণ করা না গেলেও নতুন নতুন বুদ্ধিজীবীর পথ রচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে উন্মুক্ত। ফলে জ্ঞানে-প্রজ্ঞায় আলোর পথে হাঁটতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আজকের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রে যত সমৃদ্ধি, তার গোড়ার কথাই আমাদের শিক্ষা।

আশাবাদ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সনদনির্ভরতা কমছে। সনদের সঙ্গে আলোকিত হওয়ার বোধ জন্ম নিচ্ছে আমাদের মধ্যে। প্রথম-দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসেবে মানুষ যতটা আলোর পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিল, এখন তার চেয়েও বেশি আলোর পৃথিবীতে প্রবেশ করছে নতুন প্রজন্ম। নতুন প্রজন্মের দেশবোধও দৃঢ়তায় বেড়ে উঠছে। তাদের মধ্যে ঈর্ষাকাতরতার দিকটি লোপ পাচ্ছে। তারা পরার্থে নিয়োজিত থাকার অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে। জাতির সংকটে অকাতরে তারা এগিয়ে আসছে। বর্তমানে যেভাবে আমাদের নতুন প্রজন্ম শিক্ষায় বেড়ে উঠছে তাতে আশা করা যায়, নিকট ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি উচ্চ মানবিকতাও পূর্ণরূপে কাজ করবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা