kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নারী-পুরুষ সমতায় দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন হচ্ছে লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে থাকায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ। এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে। গত ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) ২০২০ সালের বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক থেকে বিশ্বের ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ৫০তম

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারী-পুরুষ সমতায় দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন হচ্ছে লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে থাকায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ। এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্বের সব দেশের ওপরে বাংলাদেশের স্থান। গত ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) ২০২০ সালের বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক থেকে বিশ্বের ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ৫০তম। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য দেশগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে নেপাল ১০১, শ্রীলঙ্কা ১০২, ভারত ১১২, মালদ্বীপ ১২৩, ভুটান ১৩১ ও পাকিস্তান ১৫১তম। আরেক প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ১১৪তম। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে—আইসল্যান্ড, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নিকারাগুয়া। সবার শেষে ১৫৩ নম্বরে রয়েছে ইয়েমেন। চারটি ক্ষেত্রে আবার বাংলাদেশ ১ নম্বরে। এগুলো হচ্ছে—প্রাথমিক শিক্ষায় তালিকাভুক্তি, মাধ্যমিক শিক্ষায় তালিকাভুক্তি, জন্মের সময় ছেলে ও মেয়ে শিশুর সংখ্যাগত সমতা এবং রাষ্ট্রের নেতৃত্ব। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ রয়েছে ৭ নম্বরে।

ডাব্লিউইএফের ২০০৬ সালের বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্থান ছিল ৯১ নম্বরে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সে সময় বাংলাদেশ ছিল ১৭তম।

ডাব্লিউইএফের প্রতিবেদনের মোট চারটি মূল সূচকের ওপরে দেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এগুলো হলো নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য ও আয়ু এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। এর ভেতরে আবার ১৪টি উপসূচক আছে। নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ এবং স্বাস্থ্য ও আয়ুসহ আরো কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে।

রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের তিনটি উপসূচকের মধ্যে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৬তম এবং নারী মন্ত্রীর সংখ্যার দিক থেকে ১২৪তম। ৫০ বছরের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ১৬ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ জন্য নারী সরকারপ্রধানের দিক দিয়ে বিশ্বসেরা হয়েছে বাংলাদেশ।

বর্তমান জাতীয় সংসদের সর্বমোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে সাধারণ আসনে নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা ২৩। এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনে রয়েছেন আরো ৫০ জন। জাতীয় সংসদের স্পিকারও একজন নারী। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নারীরাই দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে তাঁদের জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার কারণে।

নারী নেত্রী এবং মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির এ নিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের এই অর্জন অনেকের সমন্বিত চেষ্টার ফসল। এটি এক দিনে হয়নি। সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে। স্বাধীনতার সময় এ দেশ একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিল। প্রথমে পুনর্বাসন, তারপর উন্নয়নের দিকে এগিয়েছি আমরা। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে নারী-শিশুদের যেভাবে অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়, বাংলাদেশে তা হয় না। শুধু নারী-পুরুষ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেই নয়, আরো অনেক সামাজিক উন্নয়নের সূচকে আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি। তবে এখনো বাল্যবিয়ে কমানো, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীদের উচ্চশিক্ষা—এসব বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।’

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, দেশে বিচার বিভাগ, বেসামরিক প্রশাসন, সশস্ত্র এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। এতে সরকারের সুচিন্তিত পদক্ষেপ রয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে পাওয়া তথ্য অনুসারে সারা দেশে নিম্ন আদালতে বিচারকের সংখ্যা এক হাজার ৮৫০। এর মধ্যে নারী বিচারকের সংখ্যা ৫৫০। আর সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতির সংখ্যা ৯৯। এর মধ্যে সাতজন নারী বিচারপতি হাইকোর্টে দায়িত্বরত।

সেনাবাহিনীতে নারী কর্মকর্তা ও সৈনিকের সংখ্যা আনুমানিক তিন হাজার ৭০০। মেডিক্যাল কোরে সর্বোচ্চ মেজর জেনারেল পদে কর্মরত একজন। নিয়মিত কোর্স বা ফাইটিং ফোর্সে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা আনুমানিক ৪৫০। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ৩০ জন সর্বোচ্চ লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে কর্মরত। ২০০০ সালে প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি নিয়মিত কোর্সের নারী কর্মকর্তা নিয়োগের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফসল তাঁরা। মেডিক্যাল কোরে নারী সেনা কর্মকর্তার সংখ্যা আনুমানিক এক হাজার ২৫০।

সেনাবাহিনীতে নারী সৈনিকের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথম সংযোজিত ৮৭৯ জন নারী সৈনিক মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে শপথ গ্রহণ করেন।

নৌবাহিনীতে নারী সদস্য ২৯০ জন। তাঁদের মধ্যে কর্মকর্তা ১৭৫ জন এবং নাবিক ১১৫ জন। এই বাহিনীতে নারী নাবিক অন্তর্ভুক্তি শুরু হয় ২০১৬ ব্যাচ থেকে। কর্মকর্তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ কমান্ডার পদে ১৮ জন কর্মরত। বিমানবাহিনীতে নারী সদস্য ২৯৫ জন। এর মধ্যে কর্মকর্তা ২৩১ জন এবং সেনা ৬৪ জন। গত বছরের ১০ জুন থেকে বিমানবাহিনীতে বিমান সেনা নিয়োগ শুরু হয়। নারী জিডি পাইলট নিয়োগ শুরু হয় ২০১৪ সালের ২০ মার্চ থেকে। বর্তমানে তাঁদের সংখ্যা ১৬। জিডি (এন) নেভিগেটরের সংখ্যা ১। বিমানবাহিনীর নারী কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত।

বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্য সংখ্যা ১৪ হাজার ৪৮০, যা মোট জনবলের ৭.৫৫ শতাংশ। অ্যাডিশনাল ডিআইজি হিসেবে কর্মরত পাঁচজন নারী। পুলিশ সুপার আছেন ৭০ জন। অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার আছেন ১১০ জন, সহকারী পুলিশ সুপার ১০১ জন, পরিদর্শক ১২২ জন, উপপরিদর্শক ৮০৮ জন, সহকারী উপপরিদর্শক রয়েছেন এক হাজার ৬৪ জন। ২০১৭ সালে ২৮ জন নারী সার্জেন্টের যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজপথে কাজ শুরু করেন নারী পুলিশ সদস্যরা। বর্তমানে তাঁদের সংখ্যা ৫৫। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিতে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ৯৭ জন নারী সৈনিক যোগ দেন। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তাঁদের সংখ্যা ছিল ৮৪১।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে দুই হাজার ১৮৫ জন নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নারী ব্যাটালিয়ন আনসার এবং আট হাজার সাতজন ইউনিয়ন/ওয়ার্ড দলনেত্রী ও সাধারণ আনসার রয়েছেন, যা বাহিনীর মোট জনবলের ৫০ শতাংশ। এসব নারী সদস্যের মধ্যে একজন উপমহাপরিচালক, পাঁচজন পরিচালক, ১৩ জন উপপরিচালক, আটজন সহকারী পরিচালকসহ মোট ২৭ জন নারী কর্মকর্তা রয়েছেন।

প্রশাসন ক্যাডারে সরকারের সচিব পদে আটজন, সচিব পদমর্যাদায় দুজন, অতিরিক্ত সচিব পদে ৭১ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৯৮ জন, উপসচিব পদে ৩০৩ জন, জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব পদে ৪৫০ জন এবং সহকারী সচিব পদে ৪২২ জন নারী কর্মরত। মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে সাতজন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কমিশনার পদে ৩৯ জন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে ১৩৯ জন এবং এসি ল্যান্ড পদে ১৫৮ জন নারী কর্মরত।

কাজী হাফিজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা