kalerkantho

ডেঙ্গুর বিস্তারে বেশি ঝুঁকিতে শিশু-বৃদ্ধরা

নওশাদ জামিল   

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ডেঙ্গুর বিস্তারে বেশি ঝুঁকিতে শিশু-বৃদ্ধরা

ষাটোর্ধ্ব খালেদা আক্তারের স্বামী মারা গেছেন এক মাসও হয়নি। সেই শোক কাটিয়ে না উঠতেই আরেক গভীর সংকটে পড়েছেন এই গৃহিণী। গত ২৪ জুলাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হন। জীবন-মৃত্যুর মাঝে টানা আট দিন হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা নেন। ওই সময়টাতে তাঁর হার্ট, কিডনি, লিভার, ব্রেনসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অর্গানগুলো কাজ করছিল না। তিন দিন হলো তাঁকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে।

খালেদা আক্তারের মেয়ে অ্যাডভোকেট রাশিদা চৌধুরী নীলু গত শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর মা সারা দিন বাসায় থাকতেন। আমাদের বাসা লালমাটিয়ার একটি ভবনের ১১ তলায়। পুরো বাসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কোনো টব নেই। পানি জমে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। এর মধ্যেই মা আক্রান্ত হন ডেঙ্গুতে। ইতিমধ্যে চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়ে গেছে পাঁচ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু মায়ের শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না।’

৯ বছরের শিশু আশফাকুল ইসলাম আদিত্য রাজধানীর সূত্রাপুরে একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওর বাবা প্রকাশনা সংস্থা অনিন্দ্য প্রকাশের প্রধান নির্বাহী আফজাল হোসেন। গত শনিবার সন্ধ্যায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শিশুটিকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওর শারীরিক অবস্থা সংকটজনক হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরেই ছেলেটার জ্বর। সূত্রাপুরের স্থানীয় এক ডাক্তার ওকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ডেঙ্গু নয়। কিন্তু অবস্থা দিন দিন খারাপ হলে শনিবার সন্ধ্যায় ওকে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে জানতে পারি ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।’

মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কেবিনে জ্বরে কাতরাচ্ছিল ছোট্ট শিশু আয়মান হোসেন। মশারির ভেতর শুয়ে চার বছরের শিশুটি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পাশে বসে বারবার চোখ মুছছিলেন ওর মা জাহেদা হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসা উত্তরায়। চারদিকে যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ তখন খুব সাবধানে ছিলাম। বাসা সব সময়ই পরিচ্ছন্ন রাখি। তার পরও কিভাবে আমার ছোট্ট আয়মান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো বুঝতে পারছি না। ওর শরীর দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আমাদের দিশাহারা অবস্থা।’

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতালেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী দিন দিন বাড়ছে। তাদের মধ্যে আবার শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বেশি। একাধিক চিকিৎসক জানান, শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ার হার বেশি। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম হয়। এ অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শিশু ও বৃদ্ধদের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, গাইনি ওয়ার্ড, শিশু ওয়ার্ড, পুরুষ ওয়ার্ড—সর্বত্র ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। রোগী সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত বেড এবং নার্স ও ডাক্তারের ব্যবস্থা করেও হিমশিম খাচ্ছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে সাত বছরের আবিদ হাসান। রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় মাঝে দুই দিন আইসিইউতে রাখতে হয়েছে। এখন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হলেও শারীরিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি।

শিশু হাসপাতালের অবস্থা আরো খারাপ। প্রায় সব বিভাগেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশু রয়েছে। এই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে দুই বছরের শিশু আফিফা শারমিন নদী। হাতে ক্যানোলা ও স্যালাইনের পাইপ নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। ছয়-সাত দিন ধরে সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মেয়েটির বাবা শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, ‘আমার বাসা মিরপুরে। খুব সাবধানেই বাচ্চাদের রেখেছি। তার পরও মেয়েটা আক্রান্ত হয়ে গেল। এক সপ্তাহ আগে ওর শরীরে ডেঙ্গুর জীবাণু ধরা পড়ে।’

শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নাবিলা আখন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও বয়স্করা একটু বেশি ঝুঁকিতে থাকে। গর্ভবতীদেরও ঝুঁকি বেশি। কেননা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে রক্তের প্লাটিলেট কমতে থাকে। এ অবস্থায় শিশু ও বয়স্কদের জন্য বাড়তি সচেতনতা জরুরি।’

মন্তব্য