kalerkantho

বুধবার । ২৫ চৈত্র ১৪২৬। ৮ এপ্রিল ২০২০। ১৩ শাবান ১৪৪১

বাংলাদেশে হাম্মামখানা

হাম্মামখানা সাধারণ কোনো স্নানঘর নয়। রাজা-বাদশাদের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হতো এসব স্নানঘর। এসবে স্টিম বাথ থেকে শুরু করে পানি গরম করার ব্যবস্থাও ছিল। আরাম আয়েশের অনেক সুবিধাই ছিল এসব হাম্মামখানায়। মোগল বা প্রাক-মোগল সময়কালে এখানে বেশ কিছু হাম্মাম তৈরি করা হয়েছিল। সেসবের মধ্যে এখনো টিকে থাকা ছয়টি হাম্মাম নিয়ে এবারের নির্মাণ

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশে হাম্মামখানা

লালবাগ কেল্লার হাম্মামখানার বাইরের দৃশ্য। ছবি : আল মারুফ রাসেল

লালবাগ হাম্মামখানা, ঢাকা

লালবাগ কেল্লার হাম্মামখানাটি দ্বিতল। উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ১০৭ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৭২ ফুট। ইমারতটির প্রথম তলায় ১০টি এবং দ্বিতীয় তলায় তিনটি কক্ষ রয়েছে। দ্বিতীয় তলাটি প্রথম তলার পূর্ব অংশের ওপর নির্মিত। এতে রয়েছে তিনটি কক্ষ। মাঝের কক্ষটি সবচেয়ে বড় এবং অষ্টভুজাকৃতি। এতে প্রবেশপথ রয়েছে তিনটি। এটি দুর্গের দরবারকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। বাকি দুটি কক্ষ বিশ্রামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

হাম্মামটির স্নানকক্ষ (উত্তর-দক্ষিণে ২৫ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৭ ফুট), চুল্লি কক্ষ (৮ ফুট ৭ ইঞ্চি বাই ৮ ফুট), জল সংরক্ষণাগার প্রভৃতি কক্ষ ছাড়াও শৌচাগারসহ অন্যান্য কক্ষ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। হাতির শুঁড়ের মতো ব্যবহৃত কার্নিশ এবং বাঁকানো দোচালা ছাদ ইমারতটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এর নিচতলার কেন্দ্রীয় কক্ষে খাজকাটা চৌবাচ্চায় একটি ফোয়ারা আছে। কক্ষ অলংকরণে প্যানেল কুলুঙ্গি, জাল, পাতা ও ফুল ব্যবহৃত হয়েছে। স্নানাগারের চৌবাচ্চায় সাদা ও কালো ষড়ভুজ টালি বসানো আছে। শীতকালে সম্পূর্ণ হাম্মামখানাকে গরম রাখার ব্যবস্থা ছিল। মাটির নিচের গরম কক্ষের উষ্ণ বাতাস প্রবাহিত করে হাম্মামের প্রতিটি স্তম্ভ এবং দেয়ালের অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুরো দালানটিকে গরম রাখা হতো।

হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

 

জিনজিরার হাম্মামখানা, কেরানীগঞ্জ

মোগল সুবাদার দ্বিতীয় ইবরাহিম খান সুবে বাংলার দায়িত্ব পান ১৬৮৯ সালে। ঢাকায় এসে তিনি নিজের জন্য একটি প্রাসাদ তৈরি করেন। সেটা তৈরি করা হয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে, কালক্রমে সেটির নাম হয় ‘জিনজিরা প্রাসাদ’। বড় কাটরার উল্টো দিকে এটা তৈরি করা হয়েছিল। আর সেই প্রাসাদেই ছিল এই হাম্মামখানা। এটি পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ। হাম্মামখানার ৯টি কক্ষ এখনো কোনো মতে টিকে রয়েছে। একতলা এ হাম্মামের ছাদ গম্বুজাকৃতি, চৌচালাকৃতি ও সামান্য উঁচু বৃত্তাকার ভল্টবিশিষ্ট এবং মাঝে রয়েছে ছিদ্র। অন্যান্য হাম্মামের মতোই এতে রয়েছে সদর কক্ষ, বিশ্রাম কক্ষ, স্নানকক্ষ, গরম পানির কক্ষ, পানি সংরক্ষণ কক্ষ, প্রসাধন কক্ষ প্রভৃতি। এই হাম্মামের তৈরির প্রধান উপকরণ ইট এবং পানি সরবরাহের জন্য পোড়ামাটির নল ছিল। স্নানকক্ষটির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এটিকে এখন রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্রাম কক্ষটিতে কিছু লোকজন বাস করেছেন। হাম্মামখানার ছাদে ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। সেটা অবশ্য ইটের দেয়াল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দিনের উত্তাপ থেকে রক্ষার করার জন্য এটিতে দরজা খুবই কম রাখা হয়েছে। মূলত এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষ যাওয়ার জন্য হাম্মামখানার ভেতর দিয়ে চলাচল করতে হতো।

রিদওয়ান আক্রাম

 

মীর্জানগর হাম্মামখানা, যশোর

এলাকাবাসী এটিকে ‘কেল্লাবাড়ি’ বললেও এটা আসলে হাম্মামখানা। বাংলার মোগল সুবাদার শাহ সুজার শ্যালকপুত্র মীর্জা সাফসিকান খান ১৬৪৯ সালে যশোরের ফৌজদার নিযুক্ত হন। মীর্জানগরে এসে অনেক ইমারত নির্মাণ করেন তিনি। মীর্জানগর হাম্মামটি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে কেশবপুরে অবস্থিত। চার গম্বুজের ইমারতের ভেতরে রয়েছে চারটি খোলা কক্ষ এবং একটি পাথর ও চুন-সুরকির তৈরি বড় কুয়া। একমাত্র প্রবেশপথটি পশ্চিম দেয়ালে অবস্থিত এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত ১৭ ফুট তিন ইঞ্চি মাপের বর্গাকৃতির কক্ষটি সম্ভবত প্রসাধন কক্ষ। কক্ষের চারপাশের প্রতিটি দেয়ালে রয়েছে একটি করে কুলুঙ্গি। প্রসাধন কক্ষ থেকে খিলানযুক্ত ধনুকাকার পথ দিয়ে সোজা অপর আরেকটি বর্গাকৃতি কক্ষে প্রবেশ করা যায়। এটি সম্ভবত পোশাক বদলানোর কাজে ব্যবহার করা হতো। এর উত্তর-দক্ষিণ কোণে রয়েছে একটি ছোট জলাধার। এই কক্ষের পূর্বে রয়েছে দুটি বর্ধিত গম্বুজাকৃতির কক্ষ, যা ছিল সম্ভবত মূল গোসলখানা। এর বাইরে পূর্ব পাশের লাগোয়া চারটি খোলা কক্ষ সম্ভবত জলাধার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জলাধারে পানি ধরে রেখে সেখান থেকে মাটির পাইপের মাধ্যমে ভেতরের গোসলখানার জলাধারে পানি সরবরাহ করা হতো।

ফখরে আলম

 

জাহাজঘাটা হাম্মামখানা, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে যমুনা আর ইছামতী নদীর স্রোত যেখানে কদমতলী নদীর সঙ্গে মিশেছে, সে স্থানের নাম জাহাজঘাটা। নদীতীরে বাঁধানো ঘাটগুলো দেখে মোটেও সাধারণ স্নানঘাটের মতো মনে হয় না। আর তার আশপাশেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ইটের টুকরো। স্থানীয় জনশ্রুতি বলে, এখানে তৈরি হতো বড় বড় রণতরি আর বাণিজ্যতরি। এর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি দালান। এই বিচিত্র ধরনের ইমারতটি লোকমুখে পরিচিত জাহাজঘাটা হাম্মামখানা নামে। প্রায় ৩০ মিটার দীর্ঘ এই ইমারতের প্রস্থ মাত্র সাড়ে ছয় ফুট। টানা ছয় কক্ষের উত্তর থেকে দক্ষিণে আসতে থাকলে পড়বে পরিচারকদের কক্ষ, এরপর এক গম্বুজসহ দাপ্তরিক কক্ষ, তৃতীয়টি দুই গম্বুজের মালখানা। চতুর্থ কক্ষটি ছিল সম্ভবত শয়নকক্ষ, যার ওপরে বেশ বড় একটি গম্বুজ ছিল। এর পরেরটি ছিল দুই চৌবাচ্চা নিয়ে স্নানাগার। পাশের কুয়া থেকে পানি তুলে চৌবাচ্চা ভরা হতো। ধারণা করা হয়, এই ঘরের ওপর একটা স্ফটিক বসানো গম্বুজ ছিল। ফলে হাম্মামে প্রাকৃতিক আলোর অভাব হতো না। আর সবচেয়ে দক্ষিণের ঘরে ছিল বড় একটি পাকা কুয়া। এই বিচিত্র ধরনের ইমারত সম্পর্কে আ কা মো জাকারিয়া বলেছেন যে এই গৃহে যিনি থাকতেন তিনি উচ্চপদস্থ এবং রাজকীয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তার প্রমাণ এই বিচিত্র ধরনের হাম্মাম। এই ইমারতের নির্মাণ কৌশলে মোগল ছাপ স্পষ্ট। তাই ধারণা করে নেওয়া হয়, এই হাম্মাম মোগল আমলের তৈরি।

আল মারুফ রাসেল

 

ঈশ্বরীপুর হাম্মামখানা, সাতক্ষীরা

প্রতাপাদিত্যের রাজ্যপাট যে যশোরে ছিল, সেটা এখনকার যশোর নয়। সুন্দরবনের মধ্যে এক রাজ্য, যার প্রতিরক্ষা ছিল এই বাদাবন আর খাল। এখানেই যশোরেশ্বরী মন্দির। এই মন্দিরের খানিকটা দক্ষিণ-পশ্চিমেই ঈশ্বরীপুরের হাম্মামখানা। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত এই হাম্মামের তিনটি কক্ষ, যা প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটাকে আবার সংস্কার করেছে প্রত্নত্ত্ববিদ আ কা মো জাকারিয়ার অনুমান থেকে।

এই হাম্মামের সবচেয়ে বড় কক্ষ ছিল পশ্চিম দিকে। মাঝখানের মূল স্নানঘরও প্রায় একই মাপের। মাঝের ঘরটির কেন্দ্রে একটি এবং চার কোনায় ছোট আকারের একটি করে মোট পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালের মাঝখানে ছিল প্রবেশপথ। এই কক্ষের লাগোয়া—পূর্ব দিকের ঘরে মাঝখানে ছিল পানি গরম করার ব্যবস্থা। মাঝের ঘরের চৌবাচ্চায় গরম পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা ছিল।

পানি গরম করার জন্য পূর্বদিকে মাটির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গপথের অস্তিত্ব ছিল। এই ঘরের দক্ষিণে আদিতে আরো ইমারত থাকলেও সেগুলো এমনভাবে ধ্বংস হয়েছিল যে তার বর্ণনা দেওয়া প্রায় দুঃসাধ্য। অধ্যাপক সতীশচন্দ্র মিত্র এই ভবনটিকে দ্বিতল বলে গেছেন।

আল মারুফ রাসেল

 

তাহখানার হাম্মামখানা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

ফিরোজপুর গ্রামের তাহখানা বা শাহ সুজার বিশ্রাম প্রাসাদ কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা বিশালাকারের জলাধারের পাশের ইমারত হাম্মামখানা। এট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত দ্বিতল এই হাম্মামটির নির্মাণকাল সম্পর্কে কোনো লিখিত সূত্র নেই। নির্মাণশৈলী এবং গৌড় অঞ্চলের ইতিহাস পর্যালোচনায় ধারণা করা হয় যে বাংলার সুবাদার শাহ সুজার শাসনামলে (১৬৩৯-১৬৬০) এটি তৈরি করা হয়।

তাহখানা কমপ্লেক্সের প্রবেশের পর ডানদিকে তিনটি ঘর, শেষে ২৫-৩০ ফিট ছাদের নিচে তৈরি হাম্মামখানাটি। হাম্মামখানার ছাদে রয়েছে গোলাকার গম্বুজ ও তাপ নিয়ন্ত্রণের কয়েকটি চতুষ্কোণি ছোট আকারে অতিরিক্ত ছাদ। হাম্মামখানায় আরো রয়েছে পানি গরম করার চুল্লি, মাঝে গোসল করার চৌবাচ্চা ও পোশাক পরিবর্তনের আরো একটি ঘর।

মূল ইমারতটি ইটের তৈরি হলেও এর সঙ্গে পাথর ও কাঠও ব্যবহৃত হয়েছে। ছাদের কড়ি বা বিমে কাঠ এবং দরজার সিলে পাথরের ব্যবহার হয়েছে। হাম্মামটির দেয়াল বাংলাদেশে টিকে থাকা হাম্মামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম চওড়া এবং এর ছাদ সমতল ও গম্বুজাকৃতি, এটি মিশ্র রীতিতে তৈরি। ২০০৪-০৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের খননের পর আরো ছোট-বড় সাত কক্ষের ভিত্তি ও মূল ফটকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

আহসান হাবিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা