kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ৭৩তম বার্ষিকী উদযাপন

নতুন যুগে যৌথ অভিযাত্রায় বাংলাদেশের সহযাত্রী চীন

লি জিমিং, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত

১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নতুন যুগে যৌথ অভিযাত্রায় বাংলাদেশের সহযাত্রী চীন

১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর চেয়ারম্যান মাও জেদং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেছিলেন, যা দেশটির শতাব্দীব্যাপী প্রতিকূলতা এবং অবমাননার অবসান ঘটায়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) নেতৃত্বে দেশটি জাতীয় পুনরুজ্জীবনের পথে অসাধারণ যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৮ সালে সংস্কার এবং উন্মুক্তকরণের প্রবর্তনের পর চীন তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ উৎপাদনশীল দেশ থেকে একটি বিশ্বমানের উন্নয়ন পাওয়ার হাউজে রূপান্তরিত হয়, যা সকলের উপকারে আসে।

সিপিসি ২০১২ সালে  ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসে মিলিত হবার পর থেকে সাধারণ সম্পাদক শি জিনপিংকে মূলে রেখে দলটির নেতৃত্বে চীনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতন্ত্রের পথে চীন একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।

বিজ্ঞাপন

গত এক দশকে চীন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ৬.৬ শতাংশ হারে দেশের জিডিপির বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমরা চীনে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্যের একটি ঐতিহাসিক সমাধান নিয়ে এসেছি, এইভাবে সর্বক্ষেত্রে একটি পরিমিত সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলেছি। কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় চীন সর্বদা জনগণ এবং জীবনকে অগ্রাধিকার দেয় এবং মহামারির প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে একটি গতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখে। ২০৪৯ সালের মধ্যে একটি আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়ার পরবর্তী শতবার্ষিক লক্ষ্য নিয়ে চীন উচ্চ মানের উন্নয়নের নতুন দর্শন এবং গতিশীলতা গ্রহণ করেছে, যা সময় উপযোগী।

এরই মধ্যে বিশ্ব এক শতাব্দীতে দেখা যায় না এমন আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শান্তি নাকি যুদ্ধ, অগ্রগতি নাকি পশ্চাদপসরণ,সহযোগিতা নাকি সংঘর্ষ? ইতিহাসের অনুসন্ধানের উত্তর দিতে চীন তার নিজস্ব সমাধান পেশ করেছে।

চীন বিশ্বশান্তির নির্মাতা, বিশ্ব উন্নয়নে অবদানকারী এবং বিশ্বব্যবস্থার রক্ষাকারী হওয়ার অঙ্গীকার করে।  আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়পরায়ণতা, ন্যায়বিচার এবং উভয় পক্ষের জন্য সমানভাবে লাভজনক সহযোগিতা সমন্বিত একটি নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পক্ষে কথা বলি।  আমরা মানবজাতির জন্য একটি সমন্বিত ভবিষ্যতের সম্প্রদায় গড়ে তুলতে সবার সাথে কাজ করার চেষ্টা করি। আমরা সত্যিকারের বহুপাক্ষিকতাবাদকে সমর্থন করি। আমরা সবার জন্য নিরাপত্তার একটি বিশ্বব্যাপী সম্প্রদায়ের কথা প্রচার করি। আমরা বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় পরামর্শ, সহযোগিতা এবং অংশীদারত্বের সুবিধাগুলোকে উৎসাহিত করি।  আমরা শান্তি, উন্নয়ন, সাম্য, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা সম্পর্কিত মানবতার সাধারণ মূল্যবোধ প্রচার করি।  আমরা যেকোনো স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা, গোষ্ঠী সংঘর্ষ বা একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করি।

বৈশ্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য রাষ্ট্রপতি জনাব শি ২০১৩ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর প্রস্তাবনা পেশ করেন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ১৪৯টি দেশ চীনের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার নথিতে স্বাক্ষর করেছে, যা বিআরআইকে বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বৃহত্তম এবং ব্যাপকভাবে স্বাগত প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি শি টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ এজেন্ডা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করার লক্ষ্যে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই)-এরও প্রস্তাব করেছেন।

বৈশ্বিক শান্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতি শি বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ বা গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই)-এর প্রস্তাবনা দিয়েছেন। আমরা সাধারণ, পরিপূর্ণ, সহযোগিতামূলক এবং টেকসই নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অঙ্গীকারের আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি যে সকল দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করতে হবে। জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালা মেনে চলতে হবে। সকল দেশের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও বিরোধ আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে হবে। প্রচলিত এবং অপ্রচলিত উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে।

চীন ও বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী এবং অপরিহার্য কৌশলগত অংশীদার। কয়েক শতাব্দী আগেও আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৫০-এর দশকে বঙ্গবন্ধু দুইবার চীন সফর করেন। কূটনৈতিক সম্পর্কের পুরো ৪৭ বছর জুড়ে আমাদের গভীর এবং সময়-পরীক্ষিত বন্ধুত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। গত এক দশকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুইবার চীন সফর করেছেন। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি শি একটি ঐতিহাসিক সফরে বাংলাদেশে আসেন এবং দুই নেতা সহযোগিতার কৌশলগতঅংশীদারত্বে উন্নীত করে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। মহামারির সময়ে আমরা সিপিসির প্রতিষ্ঠা শতবার্ষিকী, বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর মতো লক্ষণীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মতবিনিময় করেছি।

এ বছর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী চীনা স্পিকার লি ঝাংসু-এর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হন। এরপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন সফররত চীনের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব ওয়াং ই-কে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানান। তাঁদের আলাপচারিতায় উভয় পক্ষ ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতি নবায়ন করেছে, এক-চীন নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে, কৌশলগত একীকরণকে আরো গভীর করতে সম্মত হয়েছে এবং বাস্তবিক সহযোগিতাকে আরো বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে অস্বস্তিকর আন্তর্জাতিক পরিবেশের বিরুদ্ধে তাঁরা যৌথভাবে স্থিতিশীলতার শক্তি যোগ করতে পেরেছে।

আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার একাধিক ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে নজরকাড়া আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা। গত বছর আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে চীন ৯৮% শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। পায়রা পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্প এবং দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পসহ চীনের অর্থায়নে বা চীন কর্তৃক নির্মিত প্রধান প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হয়েছে, উভয়ই এই অঞ্চলে এ ধরনের প্রকল্পের মধ্যে বৃহত্তম। চীনের সহায়তায় নির্মিত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং বঙ্গমাতা অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু ব্যবহার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং সিস্টেম এবং কর্ণফুলী টানেলের মতো নির্মাণাধীন অন্য প্রকল্পগুলোও ভালো অগ্রগতি করেছে এবং শীঘ্রই কাজ শেষ হবে।

কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ ও চীন সব সময় একসঙ্গে থেকেছে। আমরা একে অপরকে টিকা, সরঞ্জাম এবং লোকবলের বিষয়ে সাহায্য করেছি। মহামারি চলাকালীন আটকে পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে নিতে আমার দূতাবাস পুনরায় ভিসা প্রদান শুরু করেছে এবং তাদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি নৌকা থেকে একটি জাহাজে পরিণত হয়েছে, যা বৈরী হাওয়া এবং স্রোত সত্ত্বেও এগিয়ে চলেছে। নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্রের চিন্তাধারায় মাননীয় রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর নির্দেশনায় চীন বাংলাদেশের সাথে যৌথ উন্নয়নে নিবেদিত রয়েছে। রাষ্ট্রপতি শি যেমনটা বলেছেন, মহান জাতীয় পুনরুজ্জীবনের চীনা স্বপ্ন এবং ‘সোনার বাংলা’ স্বপ্নের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমি সিপিসির আসন্ন ২০তম জাতীয় কংগ্রেসের আপডেটগুলো অনুসরণ করার জন্য সকল বাংলাদেশি বন্ধুদের আহ্বান জানাই। আমার গভীর বিশ্বাস, আমাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দের যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ বন্ধন নিশ্চয়ই ঘনিষ্ঠ ও দৃঢ় থাকবে, দীর্ঘ ও চিরকাল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন চীনের স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ৭ আগস্ট, ২০২২ তাঁর ঢাকা সফরের সময় তোলা



সাতদিনের সেরা