kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

মালদ্বীপ : জীবনের রৌদ্রোজ্জ্বল দিক

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মালদ্বীপ : জীবনের রৌদ্রোজ্জ্বল দিক

মালদ্বীপে স্বাগত। সেখানকার বালুকণা স্থানীয়দের হাসির মতোই শুভ্র। সেখানে ভারত মহাসাগরের উষ্ণ জলে মাছ খুশিতে সাঁতার কাটে। সেখানে আবহাওয়া একটি স্বপ্ন এবং সূর্যের গভীর রশ্মিগুলো আপনাকে আলোয় ভরিয়ে দিতে অপেক্ষা করে। প্রাচীনকালে মালদ্বীপের তীরগুলো সাগরে হারিয়ে যাওয়া যাত্রীদের স্বাগত জানিয়েছে। মালদ্বীপ এখনো স্বাগত জানায়। ওই তীরগুলো রয়ে গেছে, সেগুলো দর্শনার্থীদের জন্য একটি প্রশান্তির স্বর্গ এনে দেয়।

 

ভৌগোলিক অবস্থান

ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের একটি দেশ মালদ্বীপ, যা নিরক্ষীয় অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। এটি এক হাজার ১৯২টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত, যা ৮৭১ কিলোমিটার প্রসারিত। দেশটির আয়তন প্রায় ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার, এর মধ্যে মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটার শুকনো ভূমি। দ্বীপগুলো ২৬টি ‘ডাবল চেইন অ্যাটোল’-এ বিভক্ত।

দেশের অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে। প্রবালপ্রাচীরগুলো নানা রঙের, ছোট ছোট রত্নের মতো দ্বীপগুলো নরম বালুর স্বচ্ছতম স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে, যার চারপাশে পরিষ্কার অগভীর জল, যা কল্পনাও করা যায় না। দ্বীপগুলোর মধ্যে মাত্র ২০০টিতে জনবসতি আছে। সেগুলোর মধ্যে কিছু অ্যাটোল রিসোর্ট হিসেবে এবং কয়েকটি দ্বীপ শিল্প ও কৃষির জন্য ব্যবহৃত হয়।

 

পানির নিচের জগৎ

মালদ্বীপের নীল জলরাশির নিচে আলাদা এক জগৎ, যা জীবনে পরিপূর্ণ। সেখানে আছে বর্ণিল প্রবালপ্রাচীর, কচ্ছপ, তিমি ও হাঙর। স্নোরকেলিং ও ডাইভিংয়ের জন্য উপযুক্ত মালদ্বীপে তরঙ্গ ও তরঙ্গের নিচে—উভয় ক্ষেত্রেই উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতা মিলবে।

মালদ্বীপের প্রবালপ্রাচীরগুলো ক্ষুদ্র প্রাণবন্ত রিফ ফিশ, মোরে আইলস, টুনাসহ শত শত প্রজাতির মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। তাদের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণী, যেমন—সামুদ্রিক কচ্ছপ, অক্টোপাস, স্কুইড, গলদা চিংড়ি ও ডলফিনের বসবাস। দর্শনার্থীদের জন্য সাগরের কয়েকটি বৃহৎ মাছ—মন্টা রে এবং তিমি ও হাঙরের সঙ্গে সাঁতার কাটার সুযোগ রয়েছে।

দ্বীপপুঞ্জের চারপাশের ভারত মহাসাগর বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে পূর্ণ এবং এটির অভিজ্ঞতা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় স্নোরকেলিং। পুরো দ্বীপের নিজস্ব প্রবালপ্রাচীর আছে। তবে দ্বীপগুলোর নির্দিষ্ট কিছু অংশে তিমি, হাঙর বা দানবীয় মন্টা রের সঙ্গে সাঁতার কাটার মতো অজানা কিছু অভিজ্ঞতাও হতে পারে।

 

সংস্কৃতি

অনেকের কাছেই মালদ্বীপ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপপুঞ্জ, স্বচ্ছ ফিরোজা জল এবং পানির ওপর বিলাসবহুল ভিলা। তবে বিশ্বমানের রিসোর্টগুলোর বাইরেও ওই দ্বীপরাষ্ট্রটি নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ।

পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের বাসস্থান মালদ্বীপের নিজস্ব অনন্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। ভারত মহাসাগরের প্রান্তের চারপাশের বিভিন্ন সংস্কৃতি দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হলেও মালদ্বীপের সংস্কৃতি, কারু ও ঐতিহ্যগুলো দ্বীপের পরিবেশ এবং চারপাশের সমুদ্র দ্বারা প্রভাবিত।

দিভেহি মালদ্বীপের মানুষের ভাষা। বর্তমান লিপি ‘থানা’ অনন্য। ষোড়শ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে আরবি সংখ্যা থেকে এর বিকাশ হয়েছে। এ দেশের জনগণ নৌযান নির্মাণে পারদর্শী। মালদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী নৌকা ধোনিকে বহু শতাব্দী ধরে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়েছে। সাগরের বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে এটি মানানসই। ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো মূলত মাছ ও নারকেলভিত্তিক। এই অঞ্চলে এমনটি আর কোথাও নেই।

মালদ্বীপের সংগীত ও নৃত্যে পূর্ব আফ্রিকা, আরব ও ভারতীয় উপমহাদেশের জোরালো প্রভাব রয়েছে। এ দেশের কারুকাজের রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। কাঠের অলংকার, সূক্ষ্মভাবে বোনা নলখাগড়ার মাদুর এবং প্রবাল খোদাই কারুশিল্প কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।

লোককাহিনি

মালদ্বীপের বাসিন্দাদের প্রাচীন পুরাণ এবং লোককাহিনি উত্তরাধিকারসূত্রে বংশপরম্পরায় চলে আসছে। এসব পুরাণে দ্বীপজীবনের বিভিন্ন দিকের আকর্ষণীয় গল্প রয়েছে। যেহেতু দ্বীপগুলো সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত, তাই বেশির ভাগ লোককাহিনি ভয়ংকর সমুদ্রের  ভূত-প্রেতকে চিত্রিত করে, যা দ্বীপের বাসিন্দাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।

 

দ্বীপে জীবন

ঐতিহ্যগতভাবে দ্বীপে বসবাসকারী সম্প্রদায় খুব ঘনিষ্ঠ। এখনো ছোট দ্বীপগুলোর সমাজে একসঙ্গে বসবাসের সংস্কৃতি বিরাজ করছে। সে অনুসারে পুরুষরা মূলত মাছ শিকার, গাছ থেকে পানীয় তৈরি এবং ছুতারের কাজ করে। নারীরা মূলত বাড়িতে পারিবারিক দায়িত্ব পালনে এবং পরিবার পরিচালনায় নিয়োজিত। বিয়ের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানে দ্বীপগুলোতে কিছু রীতি ও আচার অনুসরণ করা হতো। এর মধ্যে কিছু আচার এখনো টিকে আছে।

১৯৭০-এর দশকে শুরু হওয়া পর্যটন দেশের আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছিল। আজ সরকারি ও বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় আছেন। অর্থনৈতিক বিকাশের ফলে তাঁদের জীবনযাত্রায় নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হয়েছিল।

 

পরিবেশ

মালদ্বীপের পরিবেশ এই গ্রহের সবচেয়ে কোমল পরিবেশগুলোর অন্যতম। এই দ্বীপগুলোর ভিত্তি হলো প্রবালপ্রাচীর। এগুলোই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে এই ছোট্ট দ্বীপগুলোকে সুরক্ষা দেয়। প্রবালপ্রাচীরগুলোর স্বাস্থ্য ও বাস্তুসংস্থানের ওপর দেশটির অর্থনীতি নির্ভরশীল।

ঝুঁকিতে থাকা মালদ্বীপের মূল্যবান সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় কয়েকটি প্রচেষ্টা চলছে। বেশ কয়েকটি সামুদ্রিক প্রজাতি ও পাখি আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকলেও দেশটির সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও নির্দিষ্ট বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রবালপ্রাচীর, দ্বীপ, সামুদ্রিক ঘাসের বিছানা ও ম্যানগ্রোভ সংবলিত জীবমণ্ডল সংরক্ষণ, সামুদ্রিক এলা, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ সুরক্ষায় বিভিন্ন অ্যাটোলে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা।

মালদ্বীপে আগত দর্শনার্থীদের তাদের ‘নন-বায়োডিগ্রেডেবল’ (জীবাণুবিয়োজ্য নয় এমন) বর্জ্য ফিরিয়ে নিতে এবং স্নোরকেলিং বা ডাইভিংয়ের সময় প্রবাল কাঠামোয় দাঁড়াতে, স্পর্শ করতে বা অপসারণ না করার বা যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

কানেক্টিভিটি

মালদ্বীপ বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট মালদ্বীপের মূল প্রবেশদ্বার ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চলাচল করে। সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আসে দুবাই, দোহা, কলম্বো এবং ভারতীয় বিভিন্ন শহর থেকে। অন্যদিকে বেশ কয়েকটি নিয়মিত ও ভাড়া করা ফ্লাইট ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজধানী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শহরগুলো থেকে যাত্রী নিয়ে আসে। মালদ্বীপের জাতীয় এয়ারলাইনস মালদিভিয়ান সরাসরি মালে ও ঢাকার মধ্যে চলাচল করে। পর্যটকদের ৩০ দিনের আগমনী ভিসা দেওয়া হয়।

মালদ্বীপে যাওয়ার পর আপনি ১২টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যেকোনোটিতে ভ্রমণ করতে পারেন। সেগুলো থেকে দৈনিক বেশ কয়েকটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। মালে থেকে বেশির ভাগ অ্যাটোলে নির্দিষ্ট ফেরি পরিষেবা আছে।

কভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতিতে মালদ্বীপ ২০২০ সালের জুন মাসে পর্যটকদের জন্য তাদের সীমান্ত আবারও খুলে দিয়েছে। আপনি যদি কোনো রিসোর্টে ভ্রমণ করতে চান, তাহলে সম্ভবত আপনার আবাসন বুকিং দেওয়ার সময়ই সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বিমানবন্দরের আশপাশের রিসোর্টগুলোতে স্পিডবোটে এবং দূরের দ্বীপের রিসোর্টগুলোতে সি-প্লেন দিয়ে যাত্রীদের পাঠানো হয়।



সাতদিনের সেরা