kalerkantho

শিক্ষার জাদুকর ড. মশিউর রহমান মৃধা

সুমন বর্মণ   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিক্ষার জাদুকর ড. মশিউর রহমান মৃধা

নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা। ছবি :কালেরকণ্ঠ

মশিউর রহমান মৃধার ধ্যানজ্ঞান, স্বপ্ন, সাধনা পুরোটাজুড়ে আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ, যা তিনি শুরু করেন ২০০৬ সালে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। থার্মেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল কাদির মোল্লা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে নিজ নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন

ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। সাফল্যের শিখরে পৌঁছায় তাঁদের আনন্দ সীমাহীন। আনন্দে আত্মহারা শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খল ভেঙে মাঠজুড়ে আনন্দ করছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শিক্ষকরাও। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এমন উচ্ছ্বাস উপভোগ করছেন অভিভাবকরা।

শহরের নামিদামি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র নয় এটি। এটি মফস্বল শহর নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল উদ্যাপনের চিত্র। টানা দুই বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দ্বিতীয় স্থানসহ পাঁচ বছর ধরে বোর্ডের সেরা দশে স্থান করে নিয়েছে কলেজটি। মফস্বলের এই কলেজটি যাঁর মেধা ও নিরলস প্রচেষ্টায় সফলতার শিখরে পৌঁছেছে তিনি হলেন কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা। প্রচলিত ধারণা ভেঙে বৈচিত্র্যময় পাঠদান-কৌশল ও পরিচালন পদ্ধতির মাধ্যমে ধারাবাহিক সফলতা ছিনিয়ে এনে সবার কাছে তিনি এখন শিক্ষার জাদুকর।

মশিউর রহমান মৃধার ধ্যানজ্ঞান, স্বপ্ন, সাধনা পুরোটাজুড়ে আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ, যা তিনি শুরু করেন ২০০৬ সালে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। থার্মেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল কাদির মোল্লা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে নিজ নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে শুরুর পথ এত মসৃণ ছিল না তরুণ শিক্ষক মশিউর মৃধার। ভাড়াবাড়িতে যাত্রা শুরু করা কলেজের রেজিস্ট্রেশন ছিল না। তাই প্রথম বছর শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে অনেক কষ্ট হয়। কলেজের সাংগঠনিক কমিটি ও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর বাড়ি বাড়ি ধরনা দিয়ে অঙ্গীকার করে, অভিভাবক-শিক্ষার্থীর নানা শর্ত মেনে ভর্তিযুদ্ধ শেষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়াল ৯৮-এ। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ফল ছিল জিপিএ ৩-এর নিচে, এমনকি একজনের জিপিএ ১.৮৮। আর ক্লাস শুরুর এক মাসের মাথায় নানা অজুহাতে আটজন শিক্ষার্থী চলে যায়, যা কলেজ কমিটি ও শিক্ষকদের হতাশার চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যায়। এতে প্রচণ্ড চাপে পড়েন অধ্যক্ষ মশিউর মৃধা। নবীন ও তরুণ শিক্ষকদের নিয়ে মাঠে নেমে গেলেন। দিনরাত কলেজ ও বাড়িতে সমানতালে পাঠদান চলতে থাকল। দু-একজন ছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে খুব সাড়া পেলেন। শিক্ষকদের মনস্তাত্তি্বকভাবে প্রস্তুত করতেও সক্ষম হলেন। প্রায় সব শিক্ষকই সংসার ত্যাগ করে কোমর বেঁধে নিজেদের উৎসর্গ করে দিলেন। শিক্ষকদের নিরলস প্রচেষ্টা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ কারণে পরের বছর ২০০৭ সালে ছাত্র সংকট হয়নি।

মশিউর রহমান মৃধা স্মৃতি হাতড়ে বললেন, 'দুজন ছাত্রের কথা মনে পড়ছে। আরিফ ও জয়ন্ত। দুজনেরই এসএসসির রেজাল্ট ২.৫-এর নিচে। অনুভব করলাম, দুজনেরই আকাশছোঁয়া স্বপ্ন রয়েছে মনে। কেবল প্রকাশের অপেক্ষায়। একজন আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বসল, আমাকে ভালো রেজাল্ট করে দেখাবে, অন্যজন বলল, দিনকে রাত বলি আর রাতকে দিন বলি, যাই বলি না কেন, মেনে নেবে তবু এইচএসসিতে ভালো রেজাল্ট করতে হবে।'

২০০৮ সালে একজন শিক্ষার্থী ব্যতীত বাকিরা সাফল্যের সঙ্গে এবং আগের তুলনায় অনেক ভালো ফল অর্জন করেছে। সেই আরিফ ও জয়ন্ত জিপিএ ৫-এর কাছাকাছি পেয়েছে।

সেই থেকে শুরু বর্ণিল পথচলা। ২০০৯ সালে শতভাগ উত্তীর্ণসহ ঢাকা বোর্ডে সপ্তম স্থান অর্জনের মাধ্যমে দেশবাসীকে প্রথম চমক দেখায় আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। যার ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে শতভাগ পাসসহ জেলার শ্রেষ্ঠ, ২০১১ সালে শতভাগ পাসসহ ঢাকা বোর্ডে সপ্তমসহ ২০১২ ও চলতি বছর ঢাকা বোর্ডে টানা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে নরসিংদী জেলার শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করে।

প্রচলিত ধারণা ভেঙে বৈচিত্র্যময় পাঠদান-কৌশল ও পরিচালন পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন মশিউর মৃধা। আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় তিন দিনের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসের মধ্য দিয়ে। এতে উপস্থিত থেকে ছাত্রছাত্রীদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিরা। শিডিউলের চেয়েও নেওয়া হয় বেশিসংখ্যক ক্লাস। প্রতিটি অধ্যায় পাঠদান শেষে নেওয়া হয় ক্লাস টেস্ট ও টিউটরিয়াল পরীক্ষা। একই সঙ্গে শ্রেণীকক্ষে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে তৈরি করা হয় শিক্ষার্থীদের। বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে নেওয়া হয় কোচিং ক্লাস। তার পরও যাদের অপূর্ণতা রয়ে যায়, তাদের জন্য আছে রিকভারি ক্লাস।

ড. মশিউর রহমান মৃধার জন্ম ১৯৬৭ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার সাহেপ্রতাপ গ্রামে। বাবা মোখলেসুর রহমান ভূঁইয়া ছিলেন নরসিংদী সরকারি কলেজের প্রধান অফিস সহকারী। মা জাহানারা বেগম গৃহিণী। তাঁর আট ভাই-বোন। তিনি ভাইদের মধ্যে সবার বড়। স্থানীয় সাহেপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর বাগহাটা নূর আফতাব আদর্শ বিদ্যাপীঠ থেকে মাধ্যমিক ও নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং জেলার পলাশ উপজেলার চরসিন্ধুর শহীদ স্মৃতি কলেজে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

মশিউর রহমান মৃধার শৈশব কেটের দুরন্তপনায়। ছোট থেকেই খেলাধুলার পাশাপাশি নিজেকে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আর সেই সাংগঠনিক ক্ষমতা তাঁকে একজন দক্ষ অধ্যক্ষ হতে সহযোগিতা করেছে। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। আট ভাই-বোনের পড়াশোনাসহ সচ্ছলভাবে সংসার চালানো কষ্টকর ছিল চাকরিজীবী বাবার। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ নির্বাহের জন্য সাইনবোর্ড লেখা ও টিউশনি করেন।

তবে কলেজ পরিচালনায় কঠোর মশিউর রহমান মৃধা ব্যক্তিজীবনে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি অবসরে কবিতা লেখেন। এরই মধ্যে তাঁর লেখা কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে চারটি বই। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরো একটি করে কবিতা ও প্রবন্ধের বই।

ড. মশিউর রহমান মৃধা বলেন, 'কলেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছি। এর একটি হলো শৃঙ্খলা; অন্যটি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। কারণ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই মেধা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক ধ্যান-ধারণা, আচরণ ও ধারণক্ষমতা- সব কিছু শিক্ষককে খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে হবে যে জীবন হচ্ছে স্বপ্নের সমান, স্বপ্ন হচ্ছে জীবনের সমান। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে স্বপ্নবান করে তোলাই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব।'

তিনি বলেন, 'এটা একদম স্পষ্ট ও পরিষ্কার যে, শিক্ষকদের কেবল শিক্ষকতা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে। তাঁর ধ্যানজ্ঞানজুড়ে থাকবে শিক্ষার্থী আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর চেয়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করবেন এবং জীবনধারাকে বেশি করে দেখবেন।' তিনি শিক্ষককে শিল্পীর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, 'শিল্পীর মতো শিক্ষকও একজন তারকা, যদি তিনি তাঁর ক্লাসটিকে মাতিয়ে তুলতে পারেন।'

ড. মৃধা নিজের একটি সুখানুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বললেন, "গত বছর কলেজের গাড়ি নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছি। চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকায় এক লোক দৌড়ে আমাদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। ওই ব্যক্তি গাড়ির চালককে জিজ্ঞাসা করে, অধ্যক্ষ স্যার আছেন? আমি নিজের পরিচয় দিলে তিনি হাত মিলিয়ে বললেন, 'বাংলাদেশে সেকেন্ড হওয়া কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে হাত মিলাইলাম।' অচেনা ওই ব্যক্তির এমন অভিব্যক্তি দেখে নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হয়েছে।

তবে দুই বছর পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা যখন বিদায় নেয় তখন একটা কষ্টের জন্ম হয়। তাদের সফলতা সেই কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। তখন মনে হয়, মানুষ হিসেবে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।"

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শিক্ষকতা করে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে ড. মশিউর রহমান মৃধার।

মন্তব্য