kalerkantho

মাগুরায় নতুন স্কুল-কলেজ মানেই \'মুন ভাই\'

শামীম খান   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মাগুরায় নতুন স্কুল-কলেজ মানেই \'মুন ভাই\'

'পৃথিবীতে একেকজনের আগমন একেক কাজের জন্য। প্রথম পর্যায়ে শখের বশে একটি স্কুল করতে গিয়ে যখন সফল হলাম, তখন হঠাৎ মনে হলো- এটিই বোধ হয় আমার জীবনের সৃষ্টিকর্তা নির্ধারিত একমাত্র কাজ। সে কারণে এটিকেই আমি জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে নিয়েছি। এখন পিছু ফেরার কোনো উপায় নেই। মাঝেমধ্যে শারীরিক কারণে খুব অনাগ্রহ জন্মে কাজটির প্রতি। তবু উদ্যোগী মানুষরা যখন ডাকে ফেরাতে পারি না'

চার ফুট ১১ ইঞ্চির ছোটখাটো মানুষ। সাদামাটা পোশাক। হাতে সাদামাটা সস্তা ব্যাগ। যার পুরোটাই ভর্তি বোর্ড ফাইল, রেজিস্টার খাতা আর নানা কাগজে। পরিচিতজনরা সবাই জানেন এসব ফাইল ও কাগজের তত্ত্বকথা। এগুলো আর কিছুই নয়। কোনো না কোনো স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার দলিল-দস্তাবেজ। জেলায় যেসব নতুন স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় আছে, সেগুলোর অতিপ্রয়োজনীয় এ ধরনের কাগজপত্র নিয়েই সব সময় ছুটে বেড়ান তিনি। কারো দৃষ্টিতে এটি তাঁর নেশা, কারো চোখে বাতিক। আর স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজটি করার কারণে কারো কারো কাছে নিতান্তই পাগলামি। তবে বি এম মুন নামের এ মানুষটির কাছে এটি এখন তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। জেলার মানুষের কাছে তিনি 'মুন ভাই' হিসেবেই সমধিক পরিচিত। যেখানেই নতুন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন, সেখানেই ডাক পড়ে মুনের। কিভাবে স্বীকৃতি নিতে হবে। কোন রেজল্যুশন লিখতে হবে এবং কিভাবে, কত ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হবে মন্ত্রণালয় ও বোর্ডে। এ ধরনের সব কাজেরই সুদক্ষ কাজি এই মুন। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার অনন্য কারিগর হিসেবে এখন সবার কাছে প্রিয়মুখ তিনি। শুধু মুনের নিজের দেওয়া হিসাব অনুযায়ীই জেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৭টি স্কুল ও কলেজের গোড়াপত্তন হয়েছে তাঁর হাতে। যার মধ্যে ১২টি স্কুল ও কলেজ এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা দাতা হিসেবে নাম আছে তাঁর।

যেভাবে শুভ সূচনা

মাগুরা সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ১৯৯৪ সালে বিএ পাসের পর স্থানীয় চক্ষু হাসপাতালে ব্রাদার হিসেবে চাকরি নেন বি এম মুন। সেখানে চাকরিরত অবস্থায় এলাকাবাসীর প্রয়োজনে ১৯৯৫ সালে কয়েকজন বন্ধু মিলে সদরের সাজিয়ারায় নিয়াশা নামের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল গড়েন তিনি। এই স্কুল গড়ার কাজেই সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে আসা-যাওয়ার একপর্যায়ে এ বিষয়ে প্রাথমিক অভিজ্ঞতা হয় মুনের। প্রথম বছরই তাঁর হাতে গড়া নিয়াশা স্কুল খ্যাতি পায় সর্বত্র। যার সুবাদে স্ত্রী ও নিজের নামে মমতাজ শিরিন-আবুল কাশেম মাধ্যমিক ইনস্টিটিউট নামে একটি স্কুল গড়ার সময় মুনের শরণাপন্ন হন শহরের আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কাশেম। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার সব কিছুতেই সুদক্ষ কর্মীর মতো নিজের সর্বাত্মক শ্রম দিয়ে সফল হন বি এম মুন। মূলত তার পর থেকেই খ্যাতির বিড়ম্বনা শুরু। তখন থেকেই নতুন স্কুল-কলেজ মানেই বি এম মুনের ডাক। বি এম মুন মানেই নতুন নতুন স্কুল ও কলেজ। বিষয়টি একসময় এমন একপর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে এ কাজের ব্যস্ততায় সময় দিতে গিয়ে শিশু হাসপাতালের চাকরিটি পর্যন্ত ছাড়তে হয় মুনকে। তবু পিছু হটেননি মুন। বরং আরো বেশি গতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি, যার সবটুকুই স্বেচ্ছাশ্রমে।

মুনের উল্লেখযোগ্য স্কুল-কলেজ

জেলার বিভিন্ন এলাকায় মুনের হাতে যেসব প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন, সেগুলোর মধ্যে মমতাজ শিরিন-আবুল কাশেম মাধ্যমিক ইনস্টিটিউট, এশিয়া মহিলা কলেজ, এশিয়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, ছোটফালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বনশ্রী রবীন্দ্র সরণি কলেজ, মাগুরা আইডিয়াল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, শালিখা আইডিয়াল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, নড়াইল-মাগুরা আইডিয়াল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আছাদুজ্জামান কলেজ বেশ প্রতিষ্ঠিত। এগুলোতে এখন নিয়মিত চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। এ ছাড়া নর্থ মাগুরা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, দক্ষিণ বাংলা কেন্দ্রীয় কলেজ, তালখড়ি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, দক্ষিণ বাংলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, বনশ্রী টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, বনশ্রী বি এম মুন টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট গার্লস কলেজ, বনশ্রী মাদার তেরেসা মেমোরিয়াল গার্লস কলেজ, বনশ্রী আইডিয়াল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, দ্য ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কলেজ, মাগুরা সম্মিলনী কলেজসহ ২৭টি প্রস্তাবিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এখন কাজ করছেন মুন।

যেভাবে কাজ করেন মুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকা এলাকায় কখনো নিজে উদ্যোগী হয়ে, কখনো এলাকাবাসীর প্রস্তাবনার ভিত্তিতে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন মুন। এ জন্য প্রথমে সরকারি খাসজমি কিংবা কোনো ব্যক্তির দান করা জমির বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। জমি গ্রহণ শেষ হলে এলাকার উৎসাহী ও উদ্যোগী মানুষ নিয়ে গঠিত হয় পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠাতা কমিটি, যেখানে প্রথম অবস্থায় মুন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব নেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতা দাতা। কমিটি গঠিত হলে শুরু হয় মুনের মূল কার্যক্রম। পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া, মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের স্বীকৃতি ও অনুমোদন, পরিচালনা পরিষদের সভা এবং এ-সংক্রান্ত রেজল্যুশন প্রস্তুত- সব কাজই করে দেন মুন। এ জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেন না তিনি। বরং এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেটির প্রাথমিক অনুমতির সরকারি ফি বাবদ পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা মুন নিজের পকেট থেকে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক অনুমোদন ও স্বীকৃতির পর ক্লাস শুরু হয়ে গেলে মুন নিজেই সরে আসেন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা থেকে। শুরু করেন আরেক প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তনের কাজ। স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগ, ম্যানেজিং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ- এসবের কোনো কিছুতেই আগ্রহ নেই তাঁর, যদিও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এ কাজ করতে গিয়ে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তিনি। পারিবারিক জমি পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। আর এখনো বিয়ে করেননি।

মুনের বক্তব্য

'পৃথিবীতে একেকজনের আগমন একেক কাজের জন্য। প্রথম পর্যায়ে শখের বশে একটি স্কুল করতে গিয়ে যখন সফল হলাম, তখন হঠাৎ মনে হলো- এটিই বোধ হয় আমার জীবনের সৃষ্টিকর্তা নির্ধারিত একমাত্র কাজ। সে কারণে এটিকেই আমি জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে নিয়েছি। এখন পিছু ফেরার কোনো উপায় নেই। মাঝেমধ্যে শারীরিক কারণে খুব অনাগ্রহ জন্মে কাজটির প্রতি। তবু উদ্যোগী মানুষরা যখন ডাকে ফেরাতে পারি না। আমার জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে, একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে আপামর জনতার মাঝে আজীবন বেঁচে থাকা। পাশাপাশি বাবা ও মায়ের নামে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করার ইচ্ছা আছে, যদিও সে আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই।'

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বক্তব্য

মমতাজ শিরিন-আবুল কাশেম মাধ্যমিক ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক নাজমুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আমাদের স্কুুল প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোগী ব্যক্তিত্ব হিসেবে কাজ করেছেন বি এম মুন। শুধু এ প্রতিষ্ঠান নয়, জেলার আরো অনেক প্রতিষ্ঠানই তাঁর স্বেচ্ছাশ্রম ও উদ্যোগের কাছে ঋণী।' এশিয়া মহিলা কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম, নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহেদী হাসান শম্পিসহ আরো অনেকে একই ধরনের অভিমত দিয়েছেন মুনের বিষয়ে। সেই সঙ্গে তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করেছেন।

মন্তব্য