kalerkantho

সুরের সুহৃদ সন্জীদা খাতুন

নওশাদ জামিল   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



সুরের সুহৃদ সন্জীদা খাতুন

ছবি : তারেক আজিজ নিশক

বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবধর্ম প্রচারে সন্জীদা খাতুনের তুলনীয় তেমন কেউ নেই। অনেক খ্যাতিমান শিল্পী রয়েছেন, সংগীতাঙ্গণে তাঁরা নমস্য, কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায় নিয়ে এগিয়ে এসেছেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন- আমাদের সমাজে এমন মানুষের দৃষ্টান্ত বিরল। আমাদের একজন সন্জীদা খাতুন রয়েছেন- আমাদের জন্য এ এক বড় পাওয়া

গাছগাছালিতে ঘেরা বড়সড় লাল ইটের ভবন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে বসতবাড়ি। রাজধানীর ধানমণ্ডির শংকর বাসস্ট্যান্ডের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন আসলে সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য তীর্থস্থানতুল্য। সারা দিন এই ভবনে শিশু থেকে শুরু করে নানা স্তরের সংস্কৃতিপ্রেমীর পদচারণ। মাঝেমধ্যে এখান থেকে ভেসে আসে মধুর ধ্বনি 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'। এটিই বিখ্যাত সেই ছায়ানট। কাগজে-কলমে এর নাম 'ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন'। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এই প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছে গৌরবের ৫০ বছর। প্রতিষ্ঠানটির কথা উঠলে শুরুতে যাঁদের নাম গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, অধ্যাপক ড. সন্জীদা খাতুন তাঁদের অন্যতম।

বাংলাদেশের এক অহংকারের নাম সন্জীদা খাতুন। এই অহংকার শুধুই কি বাংলাদেশের? পৃথিবীর সব বাংলাভাষীর নয় কি? প্রকৃত প্রস্তাবে পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালির অস্তিত্ব রয়েছে, সেখানেই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় তাঁর কীর্তিগাথা। বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালিত্বের বোধকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার, আপন সংস্কৃতির শক্তিতে বিকশিত করার প্রেরণা জুগিয়ে চলছেন সারা জীবন ধরে। অশিক্ষা, সাম্প্রদায়িকতা, কূপমণ্ডূকতা দূর করে মানুষের মনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাতিঘর জ্বালাতে নিরন্তর কাজ করে চলছেন। তিনি সন্জীদা খাতুন। নিরন্তর সাধনা আর লক্ষ্যে অবিচল থেকে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শকও তিনি।

সন্জীদা খাতুন বহু গুণে গুণান্বিত, বহু কর্মে সমর্পিত। যদি বলা হয়, কোন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বেশি উজ্জ্বল? এতে নানাজন নানা কথা বলবেন। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি স্বকীয়তায় উজ্জ্বল, সৃজনশীলতায় মুখর। একাধারে তিনি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষক। জাতীয় ও সামাজিক জীবনে, আন্দোলনে-সংগ্রামে সুর শুধু তাঁর সঙ্গী নয়, পরম আশ্রয়ও। সুরের ভেতর দিয়ে, বাণীর ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাব ও আদর্শ প্রচার ও প্রসারে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, মননশীলতার চর্চা করে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক ঈর্ষণীয় অবস্থানে, সারা জীবনের চর্চায় তৈরি করেছেন স্বকীয় এক পরিমণ্ডল, গোটা বাঙালি জাতির জন্য তা এক গভীর অনুপ্রেরণার উৎস। ভাষা আন্দোলন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী দেশ গঠনেও পালন করেছেন অগ্রণী ভূমিকা। তাঁরই নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ছায়ানটের মতো মহৎ প্রতিষ্ঠান, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের মতো বৃহৎ সংগঠন। ফলে একটিমাত্র পরিচয় দিয়ে তাঁকে মূল্যায়ন করা যথার্থ নয়, সঠিকও নয়।

আমাদের সমাজে গায়ক বা শিক্ষক হিসেবে অনেকেই স্মরণীয়; কিন্তু আজীবন সুরের শিক্ষাদান করেছেন, সাংস্কৃতিক নানা কর্মযজ্ঞের কাণ্ডারি হয়ে রয়েছেন অথচ সংগীতকে পেশা হিসেবে নেননি- এমন দৃষ্টান্ত বিশেষ নেই। সংগীত সন্জীদা খাতুনের জীবিকা নয়, সংগীত তাঁর যাপিত জীবনের অবলম্বন; আন্দোলন-সংগ্রামের হাতিয়ার। ১৯৬১ সালের কথা বলা যায়। পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের জন্য একত্র হয়েছিলেন সংস্কৃতিমনা কিছু মানুষ। তাঁদের অন্যতম ছিলেন সন্জীদা খাতুন। ভয়ভীতি পেছনে ফেলে অত্যন্ত সফলভাবে আয়োজিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষের উৎসব। দেশব্যাপী আয়োজিত এ উৎসব শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার, বাঙালি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার। পরে তাঁরা গাজীপুরের জয়দেবপুরে মিলিত হন রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানের সমাপনী সম্মিলনের জন্য। সেখানেই জন্ম নেয় ছায়ানট। শুধু গান শেখার জন্য নয়, ছায়ানট নিজেকে যুক্ত করে আরো নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে। তৎকালীন সময় দাঙ্গা প্রতিরোধ, দুর্গত ত্রাণ থেকে শুরু করে বাঙালির সংস্কৃতি সম্মেলনের আয়োজন- বিচিত্রমুখী তৎপরতায় ছায়ানট হয়ে ওঠে ষাটের দশকেই বাঙালি জাতির সত্যানুসন্ধানের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রবিন্দু ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের যুগল। ওয়াহিদুল হকের প্রয়াণের পর এই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন সন্জীদা খাতুন। প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চার প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় অভিষিক্ত। বর্তমানে দেড় শতাধিক শিক্ষকের নিবিড় পরিচর্যায় এখানে শিক্ষা গ্রহণ করছে তিন হাজার শিক্ষার্থী। কেবল সংগীতচর্চাই নয়, বাঙালি সংস্কৃতির পরিচর্যায় নানামাত্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ছায়ানট নিজেই একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

পাকিস্তানি শাসনামলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু নয়, পাকিস্তানিরা আসলে বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিল। বাঙালি শব্দটা তাদের কাছে ছিল অসহনীয়। তখন অনেকে নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কথা ভাবতেও পারতেন না। এ অবস্থায় নিজেদের সংস্কৃতি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। বাঙালির সংস্কৃতির বোধ বাঙালির ভেতর ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাঙালির ভেতর বাঙালির বোধ ও সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে যাঁরা নিরলস কাজ করছেন, সন্জীদা খাতুন তাঁদের অন্যতম। কে না জানে, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির এই বোধ জাগ্রত হওয়ার ফলেই বাঙালি জাতি খুঁজে পেয়েছিল তার স্বাধীন সত্তাকে, প্রিয় বাংলাদেশকে।

মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সন্জীদা খাতুন। এখানেও তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও সাহিত্যদর্শন। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নানা উদ্দীপক গানের সঙ্গে প্রচারিত হয় রবীন্দ্রনাথের গান। এর পেছনে মূল কারিগর ছিলেন সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক। তাঁদের সক্রিয় উদ্যোগে গড়ে ওঠে গানের দল। তাঁরা ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ জুগিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো স্মরণ করে সন্জীদা খাতুন বলেন, "আমাদের পালিয়ে যেতে হয়েছিল কলকাতায়। সেখানে গিয়ে আমরা 'রূপান্তরের গান' সংগঠন করি। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে, শরণার্থীদের শিবিরে এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আমরা এই গান গাইতাম। কাজেই রবীন্দ্রসংগীত আমাদের আন্দোলনের মস্ত বড় একটা হাতিয়ার ছিল এবং এখনো আছে। এখনো আমরা বলি, রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।"

পহেলা বৈশাখ রমনা বটমূলে উৎসব আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তাও তিনি। এ উৎসবের উদ্দেশ্য ছিল সব বাঙালিকে এক করা। আয়োজকরা সাফল্যের সঙ্গে তা করেছেন। এখন পহেলা বৈশাখে কাউকে বলতে হয় না যে শাড়ি পরতে হবে, পাঞ্জাবি পরতে হবে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসবে অংশ নেয়। সারা দেশের মানুষ এদিন বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। অত্যন্ত সাধারণ ঘরের মানুষও এদিন নতুন পোশাক পরে। সন্তানদের নিয়ে বের হয়। সেদিন তারা কিছু বিশেষ রান্না করে। বাঙালি সংস্কৃতিকে বরণ করে। পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়। শুভেচ্ছা বিনিময় করে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে ভুলিয়ে দেয় সম্প্রদায়ভেদ, ভরিয়ে তোলে ভালোবাসা। বাঙালির মধ্যে এই অসাম্প্রদায়িক বোধ জাগ্রত করার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন এই মহীয়সী নারী।

ব্যক্তিজীবনে শুধু গান পরিবেশন নয়, শিক্ষকতা নয়, সফল সংগঠকও নয়; সন্জীদা খাতুন ব্রতী হয়েছেন গভীরতর বিশ্লেষণে, বাঙালির স্বরূপ সন্ধানে। তাঁর এই সন্ধানের জন্য ছুটে চলছেন নিরন্তর। কাজ করছেন নানা শাখায়। বাঙালির আত্মপরিচয় ও স্বরূপসন্ধানে তাঁকে গভীর অনুপ্রেরণা দিয়েছে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথের গান। তাঁর যাপিত জীবনের অনুষঙ্গও রবীন্দ্রদর্শন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'রবীন্দ্রনাথকে দূরে সরিয়ে রাখলে চলবে না, আবার চোখ বুজে তাঁর গান গাইলেই তাঁকে বোঝা যাবে না। তাঁকে সঠিকভাবে জানতে ও বুঝতে হলে প্রতিনিয়ত চর্চা করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যে মানবধর্মের কথা বলে গেছেন, তা প্রথমে নিজেদের আচার-আচরণে দেশজ হতে হবে।'

সন্জীদা খাতুন এই দেশজ চর্চার জন্যই শিল্প-সাহিত্যের নানা মাধ্যমে কাজ করছেন, বাঙালির স্বরূপসন্ধানের জন্যই লিখেছেন গবেষণাধর্মী নানা বই। মননশীল লেখক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়। ভাষা, সাহিত্য ও সংগীতবিষয়ক গবেষণা ও মৌলিক রচনায় তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তাঁর গায়ক সত্তা ও অধ্যাপক সত্তার অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে তাঁর রচনায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগীত ও চিন্তা ছাড়াও রবীন্দ্রসাহিত্যের ব্যাখ্যা ও পর্যবেক্ষণের বিস্তার ও গভীরতার ভিত্তিতে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় আবু সয়ীদ আইয়ুব কিংবা শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে শ্রদ্ধাভরে। সুর-সংগীত বোধ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য বিশ্লেষণে সন্জীদা খাতুন প্রবর্তন করেছেন অন্যতর মাত্রা। তাঁর 'কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত', 'রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ', 'ধ্বনি থেকে কবিতা', 'অতীত দিনের স্মৃতি', 'তোমারি ঝর্ণাতলার নির্জনে', 'রবীন্দ্রনাথ : বিবিধ সন্ধান', 'কাজী মোতাহার হোসেন', 'রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে', 'বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই', 'ধ্বনির কথা আবৃত্তির কথা', 'সংস্কৃতির বৃক্ষছায়ায়', 'সংস্কৃতি কথা সাহিত্য কথা' ইত্যাদি গ্রন্থে তাঁর বহু বিস্তৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। মননশীল ও সৃজনশীল নানা রচনায় আমরা তাঁর যে উপলব্ধির সাক্ষাৎ পাচ্ছি, সন্জীদা খাতুন তা অর্জন করেছেন তাঁর সাহিত্যসাধনা ও উচ্চতর গবেষণার মধ্য দিয়ে। বাংলা কাব্যগীতি বিশ্লেষণ ও রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ উন্মোচনে বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ ডিগ্রি ও ডক্টরেট সম্মাননাও অর্জন করেছেন তিনি।

সন্জীদা খাতুন ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিকভাবে তিনি একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছেন। বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক কাজী মোতাহার হোসেন ও রত্নগর্ভা মা মাজেদা খাতুনের একান্ত সান্নিধ্যে নিজের জীবনকে গড়ে তুলেছেন একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংগীত, দাবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন কাজী মোতাহার হোসেন। মুসলমান সমাজের সার্বিক অগ্রগতিতেও তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয়।

আধুনিক বাঙালি মুসলমান সমাজের চিন্তাশক্তির অস্পষ্টতা দূর, চিন্তা ও কর্মে যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। মুসলমান সমাজের অনগ্রসরতা দূর করতে ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মুসলিম সাহিত্য সমাজ। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন, মোতাহার হোসেন চৌধুরী প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলন শিখা গোষ্ঠী। পরে 'শিখা' নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই শিখা গোষ্ঠী বাঙালি জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ফলে পারিবারিক ঐতিহ্য ও মুক্তমনা পরিবেশ সন্জীদা খাতুনের বেড়ে ওঠা, মানস গঠন ও চিন্তাচেতনায় রেখেছিল গভীর প্রভাব। শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি সন্জীদা খাতুনের সব ভাইবোনের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। সন্জীদা খাতুন ছাড়াও তাঁর অন্য ভাইবোনও সবাই প্রতিষ্ঠিত। দুই বোন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। কাজী আনোয়ার হোসেন এ দেশের জনপ্রিয় লেখক, গোয়েন্দা সিরিজ, মাসুদ রানার রচয়িতা। ছোট ছেলে কাজী মাহবুব হোসেনও অনুবাদ সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত।

ছোটবেলা থেকে নাচ, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্জীদা খাতুনের ঝোঁক ছিল বেশি। পরে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকেই নিয়েছেন জীবনের আরাধনা হিসেবে। এর আগে তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স করেন। ১৯৫৫ সালে বিশ্বভারতী থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৮ সালে তিনি 'রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ' গবেষণাপত্রে পিএইচডি লাভ করেন। পরে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত পিএইচডি-উত্তর গবেষণা করেন। সন্জীদা খাতুন ১৯৫৭ সাল থেকে ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘ জীবনে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত 'দেশিকোত্তম' (ডি.লিট), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের 'রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার', কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে 'রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য' উপাধি, বাংলাদেশ সরকারের 'একুশে পদক', বেগম জেবুননেছা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ জনকল্যাণ ট্রাস্টের স্বর্ণপদক ও সম্মাননা, 'সা'দত আলী আখন্দ পুরস্কার', 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার', 'অনন্যা পুরস্কার', বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানজনক ফেলোশিপ, বিজয় দিবস পদক ২০০৯ বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন।

বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবধর্ম প্রচারে সন্জীদা খাতুনের তুলনীয় তেমন কেউ নেই। অনেক খ্যাতিমান শিল্পী রয়েছেন, সংগীতাঙ্গণে তাঁরা নমস্য, কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায় নিয়ে এগিয়ে এসেছেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন- আমাদের সমাজে এমন মানুষের দৃষ্টান্ত বিরল। আমাদের একজন সন্জীদা খাতুন রয়েছেন- আমাদের জন্য এ এক বড় পাওয়া।

মন্তব্য