kalerkantho

সততাই মঞ্জুর এলাহীর শক্তি

ফারজানা লাবনী   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



সততাই মঞ্জুর এলাহীর শক্তি

জীবনের অভিজ্ঞতা কম নয় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর। চড়াই-উতরাই কম পার হননি। তবে এখানেই থামতে রাজি নন। এখনো স্বপ্ন দেখেন ব্যবসা সম্প্রসারণের। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের নতুন কারখানা গড়ে তুলতে চান, যেখানে এ দেশের মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তৈরি হবে আরো নতুন নতুন পণ্য। তবে তিনি মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া উচিত

পুঁজি ছিল ১৫ হাজার টাকা। তা নিয়েই ৩০ বছর বয়সে ব্যবসা শুরু করেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। কালের পরিক্রমায় কেটেছে ৪০ বছরের বেশি সময়। গড়ে তুলেছেন চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের শীর্ষস্থানীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। প্রমাণ করেছেন সততার সঙ্গে ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। কঠোর পরিশ্রম, তীক্ষ্ন বুদ্ধি ও কথা দিয়ে কথা রাখার অসাধারণ গুণাবলি তাঁকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। এখানেই থামতে রাজি নন তিনি। এগিয়ে যেতে চান অনেক দূর। গড়ে তুলতে চান নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। স্বপ্ন দেখেন সুস্থ রাজনীতি-গতিশীল অর্থনীতির স্বনির্ভর বাংলাদেশের। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপচারিতায় অভিজ্ঞ এ ব্যবসায়ী জানান তাঁর এগিয়ে চলার কথা। দেশের সমসাময়িক রাজনীতি ও অর্থনীতির কথাও হয় এ সময়। ব্যবসাজগতের এ দিকপাল আগামী প্রজন্মের জন্যও রাখেন কিছু উপদেশ। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে তৈরি করা হলো এ প্রতিবেদন।

রাজধানীর গুলশান এলাকায় ছিমছাম সুন্দর অল্প কিছু আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো অফিস কামরাটি। যেন শিল্পীর আঁকা ছবি। ঘরের কোনায় কালো টেবিল-চেয়ারে বসে কী যেন পড়ছিলেন ৭১ বছরের সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। সাদা শার্ট, কালো কোট-প্যান্ট পরা। পায়ে কালো জুতা। কালের কণ্ঠের ফটোসাংবাদিককে নিয়ে তাঁর অফিস কামরায় ঢোকামাত্র মিষ্টি হেসে বসতে বললেন। অল্প কিছু কথার পর শুরু হলো কথোপকথন।

বসন্তের মিষ্টি বিকেলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে শুরুতেই বললাম, আপনার অফিসরুমটি খুব সুন্দর। উত্তরে বললেন, 'সিম্পলি। শুধু ঘর সাজানো নয়, জীবন সাজাতেও সাদামাটা কাজ পছন্দ করি। প্রথমে নির্বাচন করতে হবে আপনি কী চান, আপনি কিসে আনন্দ পান। অর্থাৎ লক্ষ্য নির্বাচন করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে, ভুল হলেই জীবনের হিসাব মিলবে না। সফলতা আসবে না। সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের পর কঠোর পরিশ্রম করতে হবে লক্ষ্য পূরণে। এরপর কমিটমেন্ট রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে। প্রয়োজনে ব্যবসায় লোকসান দিয়ে হলেও কথা রাখতে হবে। সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ, কঠোর পরিশ্রম ও কমিটমেন্ট- এ তিনের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই নিশ্চিত সাফল্য আসবে। আমি বিশ্বাস করি, দ্রুত আসা অর্থ দ্রুত চলে যায়। পরিশ্রম করে সততার সঙ্গে অর্থ উপার্জনে আনন্দ আছে। আবার বিন্দু বিন্দু সঞ্চয়েও রয়েছে তৃপ্তি। ব্যবসায় লাভ-লোকসান, জীবনে হার-জিত থাকবে। দুঃসময়ের পরই সুসময়। তাই কোনো অবস্থায়ই হতাশ হওয়া যাবে না। হতাশাগ্রস্ত মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।'

দেশের শীর্ষস্থানীয় জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'ব্যবসায় ৪০ বছর পার করেছি। এ দীর্ঘ সময়ের হিসাব কষতে গেলে বলা যায়, সফলতা এমনি আসেনি, তাকে আনতে হয়েছে। পাহাড়সমান বাধা এসেছে। ভেঙে পড়িনি। চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে গেছি।'

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই, তিন বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। স্কুল, কলেজ শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে অনার্স করেন। এরপর পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে চলে আসেন ঢাকায়। স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্থনীতিতেই মাস্টার্স করেন সেখান থেকে।

পড়ালেখা শেষ হয়েছে। এবার জীবিকার পালা। ব্যবসা করার ইচ্ছা। কিন্তু পুঁজি নেই। আবার কী ধরনের ব্যবসা করবেন সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত চাকরিতে যোগ দিতে হলো। ১৯৬৫ সালে পরিবারের সিদ্ধান্তে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী পাকিস্তান টোব্যাকো কম্পানিতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) শাখায় নিয়োগ পান। পরের বছর ১৯৬৬ সালে বিয়ে করেন নিলুফার চৌধুরীকে। স্ত্রীকে নিয়ে কর্মস্থলে চলে যান। নতুন সংসার, রুটিন বাঁধা জীবন। খারাপ চলছিল না। উচ্চ বেতন, সম্মান, সচ্ছলতা সবই ছিল। কিন্তু মনের অতৃপ্তি দূর হলো না।

চাকরি ভালো লাগত না কখনোই। ব্যবসার আকাঙ্ক্ষা ছিল ছাত্রজীবন থেকে। তাই ভালো চাকরি করলেও ব্যবসা করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

অন্যদিকে কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সততা, কঠিন পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তার কারণে প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের কাছে মঞ্জুর এলাহী প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধিসহ চাকরি-সংক্রান্ত সুবিধা বাড়তে থাকে।

কিন্তু মন টানে ব্যবসার দিকে। তাঁর মনে হতে থাকে চাকরি নয়, ব্যবসা তাঁর ঠিকানা। অন্যের প্রতিষ্ঠানে মেধা ব্যয় না করে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেশ ও জাতির সেবা করতে হবে। এ ছাড়া তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে থাকতে ভালো লাগত না। বাংলাদেশের প্রতি টান অনুভব করতেন। মঞ্জুর এলাহীর কাজকর্ম, কথাবার্তায় বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন লক্ষ করা যেত। বাংলাদেশে বদলি করা হয় তাঁকে। ১৯৭১ সাল, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর শ্বশুর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাই পাকিস্তানি হানাদারদের নির্যাতনও তাঁদের ওপর বেশি। অনেকটা নিরুপায় হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডন চলে যান তিনি। সেখানে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যায় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ও তাঁর পরিবারের। অন্যদিকে লন্ডনের বড় একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগও হয় তাঁর। কিন্তু বাংলাদেশ ছেড়ে থাকতে রাজি ছিলেন না মঞ্জুর এলাহী। উচ্চ বেতনের চাকরি, বাড়ি-গাড়ি, প্রাচুর্য, নিশ্চিত জীবন সব ছেড়ে ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর ফিরে আসেন পরিবার নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে।

মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল স্থবির। মানুষের খাওয়ার পয়সা ছিল না। বাড়িঘর, কলকারখানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্বজন হারানোর হাহাকারে বাতাস ভারী হয়ে থাকত। তার মধ্যে ছিল বিজয়ের আনন্দ। খুব কষ্ট পেতাম সে সময়ের বাংলাদেশ দেখে। মনের মধ্যে অদম্য ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশের জন্য কিছু করার। ভাবতে থাকি কী করা যায়। ব্যবসার সুযোগ খুঁজতে থাকি।'

এরই মধ্যে যোগাযোগ হয় বিদেশি এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে, যিনি বাংলাদেশ থেকে চামড়া আমদানি করেন এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য বাংলাদেশে রপ্তানি করেন। মঞ্জুর এলাহী প্রস্তাব দেন তাঁকে, বাংলাদেশ থেকে চামড়া সংগ্রহের দায়িত্ব নিতে চান। একই সঙ্গে সরবরাহকৃত রাসায়নিক দ্রব্য বিক্রিতে এজেন্সি হিসেবে কাজ করবেন। আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ায় চাকরিতে ইস্তফা দেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। ওই সময় সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে টোব্যাকো কম্পানিতে কাজ করতেন তিনি। বিদেশি ব্যবসায়ী রাজি হয়ে যান তাঁর প্রস্তাবে। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন তিনি।

শুরু হয় তরুণ মঞ্জুর এলাহীর নতুন পথচলা। ১৫ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ওয়েট ব্লুু চামড়া সরবরাহ করতেন এজেন্সিকে। একই সঙ্গে তাদের আমদানীকৃত রাসায়নিক দ্রব্য বাংলাদেশে বিক্রি করা ছিল মঞ্জুর এলাহীর ব্যবসা।

নিজের অনুভূতির বর্ণনায় মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'প্রত্যেকটি মানুষের পছন্দনীয় কাজটিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া উচিত। এতে সফলতা আসবে সহজে। আবার কাজটি করেও সে আনন্দ পাবে। আমি চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করতে এসে ব্যবসায়িক প্রতিটি কাজ আনন্দের সঙ্গে করতাম।'

হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্বল্প পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করেও অচিরেই সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ব্যবসা বাড়তে থাকে। এরই মাঝে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসে পরিবর্তন।

তৎকালীন সময়ে নতুন সরকার এসে বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেয়। ট্যানারি করপোরেশনকে ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে নিলামে সরকারের কাছ থেকে ১২ লাখ ২২ হাজার ডলারে ওরিয়ন ট্যানারি কিনে নেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী।

মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'ওই সময় ১৪ টাকায় এক ডলার পাওয়া যেত। লোকসানি প্রতিষ্ঠান কিনে চ্যালেঞ্জ নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। ওরিয়ন ট্যানারির নাম পরিবর্তন করে অ্যাপেক্স ট্যানারি করা হয়।'

নিজের সে সময়কার দিনগুলোর বর্ণনায় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'কত দিন গেছে একটিবারের জন্য অফিসে বসার সুযোগ পাইনি। দিনের পর দিন ট্যানারির ফ্লোরে দাঁড়িয়ে কাজ করেছি। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ছুটে গেছি ব্যবসার প্রয়োজনে। আবার মাসের ২০ দিনই থেকেছি দেশের বাইরে। স্ত্রী-বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাইনি। ব্যবসায় টিকে থাকার প্রয়োজনে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।'

নিজের ব্যবসার একটি ঘটনা উল্লেখ করে মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'ট্যানারি করেছি তখন মাত্র তিন বছর হবে। পুঁজি প্রায় সবই বিনিয়োগ করা। এমন সময় দেশে কাঁচা চামড়ার দাম দুই-তিন গুণ বেড়ে গেল। আবার বিশ্ব বাজারেও দাম অনেক কমতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ট্যানারি থেকে আগে অর্ডার নেওয়া মাল সরবরাহ করতে পারে না। আবার অনেকে লোকসান গুনে মাল বায়ারদের দেয় না। কিন্তু অ্যাপেক্স ট্যানারি থেকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনেও সময়মতো মাল সরবরাহ করি। আমি ওই সময় সিদ্ধান্ত নিই, কথা যখন দিয়েছি ব্যবসায় যত লোকসানই হোক মাল সরবরাহ করবই। এ ঘটনায় বায়ারও বিস্মিত হয়। এরপর মন্দা কেটে যাওয়ার পর ইতালির এ বায়ার তার কম্পানির সব অর্ডার বাংলাদেশে একমাত্র অ্যাপেঙ্কেই দিত।'

মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'পণ্যের গুণগত মানের সঙ্গে আপস করিনি। কাউকে ঠকাতে চাই না।' রাতারাতি ধনী হওয়া আশা করে ব্যবসা করা উচিত নয় বলে মনে করেন দেশে শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের এ কর্ণধার।

জীবনের শুরু থেকে চেয়েছেন, যে কাজ করবেন সেখানে নেতৃত্বে দেবেন। তাই শুধু নিজের ব্যবসা নিয়ে নয়, বাংলাদেশের সমগ্র চামড়া খাতের বিরাজমান সমস্যার সমাধানে কাজ করেছেন। যখন যে সরকার এসেছে তার সঙ্গে চামড়া খাতের সার্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনায় বসেছেন।

ইতালিতে চামড়া রপ্তানির মধ্য দিয়ে অ্যাপেক্স ট্যানারির যাত্রা। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের জুতা বিক্রির প্রধান বাজার ইতালি, ভারত, চীন, তাইওয়ান ও জাপান। এ ছাড়া বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে অ্যাপেক্সের জুতা বিক্রি হয়। গড়ে তুলেছেন ১১টি প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে রয়েছে অ্যাপেক্স ট্যানারি, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, এপেক্স ফার্মা, ব্লু ওশান ফুটওয়্যার, অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ, অ্যাপেক্স ইনভেস্টমেন্ট, অ্যাপেক্স অ্যাডভারটাইজিংসহ আরো প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ১২ হাজার ৮০০ লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোতে। স্থানীয় বাজারের বড় অংশীদারি রয়েছে অ্যাপেক্সের। দেশের শীর্ষস্থানীয় জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের একটি।

অভিজ্ঞ এ ব্যবসায়ী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চামড়াশিল্প সম্ভাবনাময় খাত। শ্রমঘন শিল্প হিসেবে চামড়াশিল্প এ দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। চামড়া এমন একটি খাত, যার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানসহ জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলা যায়।

মঞ্জুর এলাহী বলেন, কারখানায় কর্মপরিবেশ উন্নত করা না হলে এ দেশের চামড়াশিল্প হুমকির মুখে পড়ে যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কারখানার পরিবেশ উন্নত করা না হলে এ দেশ থেকে চামড়া রপ্তানি না করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই অচিরেই হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরে পদক্ষেপ নিতে হবে।

অ্যাপেক্স ট্যানারি কেন এখনো সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাপেক্স ট্যানারির চেয়ারম্যান বলেন, সাভার শিল্পনগরীতে এখনো সিইটিপি নির্মিত হয়নি। এ অবস্থায় ট্যানারিগুলো নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার পরিবেশ আবারও দূষিত হয়ে যাবে। তাই আগে সিইটিপি নির্মাণ শেষে তার কার্যকারিতা পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট ইতিবাচক হলে ট্যানারি স্থানান্তর করা হবে। না হলে ট্যানারি স্থানান্তর যে উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে তা পূরণ হবে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত- এমন মত জানিয়ে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, হরতাল, অবরোধসহ নানা ধরনের সহিংসতাপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এ দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষভাবে রপ্তানিমুখী শিল্পে ধস নেমেছে। বায়াররা সময়মতো মাল না পাওয়ার আশঙ্কায় অর্ডার দিতে চাচ্ছে না। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন- এমন মত জানিয়ে অভিজ্ঞ এ ব্যবসায়ী বলেন, এ দেশে অনেক রাজনীতিবিদ ব্যবসা করেন। আবার ব্যবসা করে কিছু অর্থ হলেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। অথচ পৃথিবীর বেশির ভাগ উন্নত দেশেই অর্থনীতি ও রাজনীতি পৃথক দুটি ধারায় চলে। এতে সরকার বা বিরোধী দল পরিবর্তন হলেও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'আমি প্রমাণ করতে চাই, সৎভাবে ব্যবসা করা যায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী হলেও বাসার পরিবেশ সব সময় অত্যন্ত সাধারণ মানের।' এক ছেলে নাসিম মঞ্জুর আমেরিকায় গিয়ে পড়ালেখা শেষ করে উচ্চ বেতনে চাকরি নেন। কিন্তু ছেলে দেশে ফিরে আসুক এমন ইচ্ছা ছিল বাবা মঞ্জুর এলাহীর।

মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'আমার স্ত্রী ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল সানবিমস প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করছেন। আমার একমাত্র মেয়ে মায়ের সঙ্গে আছে। ভাই-বোন সবাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত।'

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, 'অর্থ কোনো ব্যক্তির মনুষ্যত্ব বিচারের মাপকাঠি নয়। একজন মানুষ কেমন তা তার ব্যবহার-আচরণে প্রকাশ পায়।'

৭০ বছর পার করেছেন। অবসরে যাবেন না জানতে চাইলে দেয়ালে আঁকা ছবির দিকে তাকিয়ে কল্পনায় যেন ভবিষ্যৎকে দেখে নিয়ে বললেন, 'যত দিন বাঁচব কাজ করে যাব।'

জীবনের অভিজ্ঞতা কম নয় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর। চড়াই-উতরাই কম পার হননি। তবে এখানেই থামতে রাজি নন। এখনো স্বপ্ন দেখেন ব্যবসা সম্প্রসারণের। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের নতুন কারখানা গড়ে তুলতে চান, যেখানে এ দেশের মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তৈরি হবে আরো নতুন নতুন পণ্য। তবে তিনি মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া উচিত। অনেক বিষয়ে কাজ করতে চাইলে কোনো বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আবার শেখাও হয় না কিছু। তাই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কাজ করে যেতে হবে। মঞ্জুর এলাহী মনে করেন, যে বিষয়ে ব্যবসা করতে হবে সে বিষয়ে পুঁথিগত বিদ্যা জানতে হবে। বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে হবে। তা না হলে ঠকতে হবে। কথোপকথন শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে তাঁর সেক্রেটারি জানালেন মিটিংয়ে বসতে হবে। তার পরও প্রশ্ন রাখলাম, অবসর কিভাবে কাটান, কী খেতে ভালোবাসেন।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বললেন, 'অবসর সময়টুকু পরিবারের সঙ্গে কাটাতে পছন্দ করি। মাছ, ডাল ও সাদা ভাত প্রিয়। রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান প্রিয়।'

উঠে অফিসের দরজা পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই এলেন। বিদায় জানানোর সময় বললেন, 'অনেক দিন পর সাক্ষাৎকার দিলাম। ভালো থাকবেন। দোয়া করবেন যেন দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে যেতে পারি। পাঠকদের কাছেও দোয়া চাই।'

মন্তব্য