kalerkantho

অনেক কাজের কাজি \'সিরাজ স্যার\'

তোফায়েল আহমদ   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনেক কাজের কাজি \'সিরাজ স্যার\'

শিক্ষা বিস্তার ছাড়াও সিরাজ স্যারের দিনরাত কাটে সমাজের অবহেলিত মানুষকে উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, কক্সবাজার বায়তুশ শরফেই রয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় চক্ষু হাসপাতাল। চক্ষুসেবা দিতে জেলার আটটি উপজেলায়ই রয়েছে রিসোর্স সেন্টার। চালু রয়েছে ভ্রাম্যমাণ চক্ষুশিবিরও। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধীদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে এ প্রতিণ্ঠান

বাবা-ছেলে, ছোট-বড়- সবারই তিনি 'সিরাজ স্যার'! পুরো নাম এম এম সিরাজুল ইসলাম। হতে চেয়েছিলেন পাইলট। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে সামান্য অজুহাতে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বদলে ফেলেন সিদ্ধান্ত। উদ্যোগ নেন মানুষ গড়ার, সমাজ গড়ার। তাই শিক্ষকতাকে বেছে নিলেন পেশা হিসেবে। পর্যটন শহর কক্সবাজারে 'সিরাজ স্যার'কে সবাই এখন একনামে চেনে। সরকারি বিদ্যালয়ে দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় শিক্ষকতার চাকরি শেষে আত্মনিয়োগ করেছেন সমাজসেবায়। ১৯৭১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরি শেষ হলেও শিক্ষকতার কাজটি এখনো ছাড়েননি তিনি।

খুবই ব্যস্ত তাঁর দিনলিপি। ফজরের নামাজ পড়ে যান এতিমখানায়। ১৫০ জন এতিমের লেখাপড়া ও তাদের খাওয়াদাওয়ার তদারকি করেন। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারে দুই লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ সময় এতিম হয় কয়েক হাজার শিশু। তাদের অনেকের স্থান হয় কক্সবাজার শহরের বৌদ্ধ মন্দির এলাকার বায়তুশ শরফ এতিমখানায়। তাদের কান্নায় ভিজে যায় সিরাজ স্যারের মন। তাই হাল ধরেন বায়তুশ শরফ এতিমখানার। এর সাধারণ সম্পাদক তিনি। বায়তুশ শরফ একটি ধর্মীয় ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। পীরে কামেল মরহুম মওলানা আবদুল জব্বারের পর মওলানা কুতুব উদ্দিন এখন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান। এতিমদের লেখাপড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। সিরাজ স্যার জানান, এতিমখানার অনেকেই এখন ভালো অবস্থানে আছেন। তাঁদের একজন মুজিবুর রহমান আমেরিকায় কম্পিউটারবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছেন। মুজিবুর প্রতিবছর এই এতিমখানার জন্য দান করেন মোটা অঙ্কের টাকা।

দেশের নানা স্থানে বায়তুশ শরফের শাখা থাকলেও সিরাজ স্যারের পরিচালনায় কক্সবাজার শাখাটি সবচেয়ে সমাদৃত। মাত্র ১২ শতক জমির ওপর একটি মসজিদ ও এতিমখানা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। ১৯৯৮ সালে সিরাজ স্যার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। তাঁর নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠানটির অধীনে এখন প্রায় তিন একর জমি, তিনতলা মসজিদ, চারতলা প্রশাসনিক ভবন, এতিমখানা, হাফেজখানা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, চারতলা বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি, গ্রন্থাগার, চারতলা ১০০ শয্যার চক্ষু হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন তিন শতাধিক। এর বাইরে কক্সবাজার জেলাজুড়ে বায়তুশ শরফের অর্ধশতাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, হাফেজখানা ও এতিমখানা স্থাপনেও ভূমিকা রাখেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তি ও ভক্তদের দানের টাকায় ভালোই চলছে এসব। আর হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অর্জন করেছে স্বনির্ভরতা।

শিক্ষা বিস্তার ছাড়াও সিরাজ স্যারের দিনরাত কাটে সমাজের অবহেলিত মানুষকে উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, কক্সবাজার বায়তুশ শরফেই রয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় চক্ষু হাসপাতাল। চক্ষুসেবা দিতে জেলার আটটি উপজেলায়ই রয়েছে রিসোর্স সেন্টার। চালু রয়েছে ভ্রাম্যমাণ চক্ষুশিবিরও। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধীদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে এ প্রতিণ্ঠান। ২০০০ সাল থেকে শুরু হয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন কার্যক্রম, ২০০৮ সাল থেকে সেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় আনা হচ্ছে সব ধরনের প্রতিবন্ধীকে।

বায়তুশ শরফের প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন প্রকল্পেরও সাধারণ সম্পাদক সিরাজ স্যার। একই সঙ্গে কক্সবাজার ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিমের সভাপতি ও জাতীয় ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলের সদস্যও তিনি। সারা দেশে মাত্র আটটি ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিমের অন্যতম কক্সবাজার টিমকে তিনি কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে এ পর্যায়ে নিয়ে আসেন। এ ছাড়া তিনি ঝিনুকমালা খেলাঘর কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সিরাজ স্যার প্রায় প্রতিদিন এতিমদের খোঁজখবর নেওয়ার পর বায়তুশ শরফের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন। এসব প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম দেখে নানা দিকনির্দেশনা দেন। এরপর নিজ কার্যালয়ে বসে জেলার বিভিন্ন স্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের সমস্যা ও অভিযোগ শোনেন। পরে এসবের সমাধান করেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন।

কক্সবাজার সরকারি বালক ও সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের সফল শিক্ষক হিসেবে সুনাম অর্জনের কারণেই সিরাজ স্যার যেখানে, শিক্ষার্থীদের ভিড়ও সেখানে। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি ও উত্তরণ মডেল স্কুলের দায়িত্বে থাকায় সবার আগ্রহও বাড়ছে প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতি। ইতিমধ্যে জেলার অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জব্বারিয়া একাডেমি পরিচিতি লাভ করেছে। একাডেমির অধ্যক্ষ সিরাজ স্যার কালের কণ্ঠকে জানান, শিশু থেকে এসএসসি পর্যন্ত তিন হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। নিয়মিত লেখাপড়ার পাশাপাশি এখানে খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। একসঙ্গে ৫০০ ছাত্রীর নামাজ পড়ার আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে রাখাইন শিক্ষার্থীদেরও বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়।

শহরতলির উত্তরণ মডেল টাউনে স্থাপিত উত্তরণ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনার দায়িত্বেও রয়েছেন সিরাজ স্যার। স্কুলটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে তিনি এটি দেখভাল করছেন। বর্তমানে শিশু থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে স্কুলটিতে। এ ছাড়া তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ি পেকুয়া উপজেলার মগনামায় আন নাহার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মসজিদ, মাদ্রাসা, হাফেজখানা, কবরস্থান স্থাপন করেছেন। কুতুবদিয়া উপজেলায় দাদা মকবুল আলী সিকদার ফাউন্ডেশনের নামেও একইভাবে মসজিদ, মাদ্রাসা, হাফেজখানা ও কবরস্থান গড়ে তুলেছেন।

এম এম সিরাজুল ইসলাম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের দক্ষিণ মগনামা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আলহাজ মওলানা ফজলুল হক ও মা আলহাজ নুরুন নাহার বেগম। দুজনই প্রয়াত।

সমাজসেবা ও সমবায় পুরস্কার পেয়েছেন সিরাজ স্যার। সম্মাননা পেয়েছেন জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ ও প্রথম আলোর পক্ষ থেকেও। কক্সবাজার সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থাকাকালে স্কুলে বৃক্ষ রোপণ করে আলোচনায় আসেন তিনি। ওই স্কুল দুটি বর্তমানে সবুজে ছেয়ে গেছে। বৃক্ষরোপণে ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ স্কুল ও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে তাঁর বিদ্যাপীঠ। বৃক্ষ রোপণ করে উত্তরণ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমিকেও সবুজে ছেয়ে দিয়েছেন তিনি।

মন্তব্য