kalerkantho

কাইয়ুম চৌধুরী : ব্রাশ হাতে ভবিষ্যতের দিকে

আলী হাবিব   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কাইয়ুম চৌধুরী : ব্রাশ হাতে ভবিষ্যতের দিকে

ছবি : রফিকুর রহমান রেকু

কাইয়ুম চৌধুরী চেয়েছেন তাঁর ছবিতে এ অঞ্চলের পরিচয় যেন ফুটে ওঠে। যে আলো-হাওয়ার ভেতর দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা, কাইয়ুম চৌধুরী তার আনুগত্য ও ঋণ স্বীকার করতে চান। নদীমাতৃক এই কৃষিনির্ভর সমাজকে তিনি তাই তুলে আনেন তাঁর ছবিতে, যেখানে ফুটে ওঠে লোকজ শিল্পের বিভিন্ন দিক। সমালোচকদের ভাষায়, 'লোকজ শিল্প কাইয়ুমকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, এ সব কিছুর মূলে তাঁর স্বদেশ ও স্বাজাত্যভিমান এবং গৃহাভিমুখিতা, গৌরবের দিকে হিসেবে'

কী বলা যাবে তাঁকে? রঙের জাদুকর? শিল্পী তিনি। রং নিয়ে কেটে গেল জীবনের এতগুলো বছর। সেই কবে হাতে তুলে নিয়েছিলেন রংতুলি। বাংলাদেশের চিত্রশিল্পকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি। এবার সম্মানিত হয়েছেন স্বাধীনতা পদকে। বয়স ৮০ হলেও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী মনেপ্রাণে এখনো তরুণ। ক্যানভাসে রঙের ছোঁয়ায় যে বাংলাদেশকে তিনি ফুটিয়ে তোলেন, এই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কেটেছে তাঁর জীবনের একটা সময়। খুব কাছ থেকে দেখেছেন ঋতুতে ঋতুতে এ দেশের প্রকৃতির রংবদল। মানুষের জীবনসংগ্রামকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। ক্যানভাসে রঙের ছোঁয়ায় সেটাই ফুটে ওঠে তাঁর তুলিতে। দেশের মুদ্রণশিল্প সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর হাত ধরে। সৃজনশীল প্রকাশনার প্রচ্ছদশিল্পের অগ্রদূত তিনি। দেশের প্রকাশনাজগৎ ঋদ্ধ হয়েছে যাঁর হাতে, সেই কাইয়ুম চৌধুরী সম্পর্কে শিল্প-সমালোচকদের বক্তব্য, 'তাঁর কাজে তরলতা নেই, আছে গভীরতা।...তিনি ব্রাশ হাতে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই তাকানো থেকে জন্ম নেয় তাঁর অহংকার- শিল্পী হওয়ার অহংকার। তিনি ঘুরে বেড়ান সাধারণ মানুষের সঙ্গে সর্বত্র, তিনি ফিরে পান শিল্পের জোর, তাঁর কবজিতে। তাঁর চোখে তিনি ক্রমেই হয়ে ওঠেন একজন বড়মাপের মানুষ, একজন বড়মাপের শিল্পী।'

জন্ম ১৯৩৪ সালের ৯ মার্চ ফেনীতে। বাবা ছিলেন ব্যাংকের কর্মকর্তা। বাবার বদলির চাকরিতে কাইয়ুম চৌধুরীকে তাই থাকতে হয়েছে দেশের বিভিন্ন শহরে। ঘুরে বেড়িয়েছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এ সময় বাংলার প্রকৃতি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। বাড়িতে ছিল পড়াশোনার পরিবেশ। বইয়ের জগতের সঙ্গে শৈশবেই যোগসূত্র তৈরি হয়। সংগীতে আগ্রহও বাড়ির পরিবেশের কারণে। তবে শিক্ষার হাতেখড়ি মক্তবে, সেই শৈশবে। এরপর ভর্তি হলেন চট্টগ্রামের নরমাল স্কুলে। কিছুদিন কেটেছে কুমিল্লায়। নড়াইলে চিত্রার পাড়ে কেটেছে তিনটি বছর। সেখান থেকে চলে আসা সন্দ্বীপে। সেখানে প্রথমে সন্দ্বীপ হাই স্কুল, পরে কারগিল হাই স্কুল। এভাবে একের পর এক জায়গা বদল। সন্দ্বীপ থেকে ফেনী হয়ে ফরিদপুর। ফরিদপুর থেকে ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহের কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৪৯ সালে। তত দিনে বিদায় নিয়েছে ব্রিটিশরাজ।

আঁকাআঁকির শখ ছাত্রজীবন থেকেই। সেই শখ থেকেই শিল্পী হওয়ার গোপন বাসনা ছিল মনে। তখন তো শিল্পী হতে হলে যেতে হতো কলকাতায়। সেখানে তাঁকে পাঠানোর সামর্থ্য পরিবারের ছিল না। তবে বাবা জানতেন ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানের কথা, যার প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল আবেদিন। ছেলের আগ্রহে বাবা একদিন আলাপ করলেন জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে, ময়মনসিংহে। এরপর ঢাকায় চলে আসা। না, থাকার মতো জায়গা ছিল না। উঠলেন বোনের বাসায়, বাবার দেওয়া মাসোহারা চার টাকা পুঁজি করে।

১৯৪৯ সালে আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হলেন কাইয়ুম চৌধুরী। এখান থেকে শিক্ষা শেষ করলেন ১৯৫৪ সালে। তত দিনে ঢাকার চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। ভাষা আন্দোলন হয়েছে। স্বাধিকারের পথে নিজেদের চেনাতে শুরু করেছে বাংলার মানুষ। আর্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় অংশ নিয়েছিলেন একটি গ্রুপ প্রদর্শনীতে। শিল্পী জয়নুল আবেদিন নিয়ম করে দিয়েছিলেন, দর্শনীর বিনিময়ে সেই প্রদর্শনীতে ঢুকতে হবে। ১৯৫১ সালে দর্শনীর বিনিময়ে চিত্র প্রদর্শনী, ভাবা যায়!

১৯৫৪ সালে কাইয়ুম চৌধুরী আর্ট ইনস্টিটিউটের পাট যখন চুকালেন, তখন তিনি ২০ বছরের তরুণ। শিক্ষাজীবন শেষ করেই স্থায়ীভাবে কোনো পেশাকে গ্রহণ করেননি। বিজ্ঞাপনের কাজ থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করেছেন তখন। বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। কিছুকাল 'ছায়াছবি' নামে একটি সাময়িক পত্রও সম্পাদনা করেছেন। ১৯৫৪ সালে অংশ নিলেন পাকিস্তান চিত্র প্রদর্শনীতে। ১৯৫৬ সালে মুর্তজা বশীর ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে গড়ে তুললেন পেইন্টার্স ইউনিট। পেইন্টার্স ইউনিটের প্রথম ও শেষ প্রদর্শনী হলো ঢাকা প্রেসক্লাবে। এর পাশাপাশি চলতে লাগল প্রচ্ছদের কাজ। ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে রেলওয়ের টাইম টেবিলের প্রচ্ছদ এঁকে পেয়েছিলেন প্রথম পুরস্কার। ১৯৫৭ সালে আর্ট কলেজে যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে। আর্ট কলেজে যখন তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, তখন এ প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন এই আর্ট কলেজের ছাত্রী তাহেরা খানমকে। কী করে পরিচয় হলো? পরিচয় অন্তে প্রেমের প্রস্তাব কি দিতে পেরেছিলেন কেউ? কেমন ছিল শিক্ষকদের সামনে শিক্ষক হিসেবে তাঁর প্রথম দিন? শোনা যাক তাঁর মুখ থেকেই, 'আমি তখন মাত্র আর্ট কলেজে জয়েন করেছি। ও তখন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। একদিন আমাকেই ক্লাস নিতে যেতে হলো। ফিগার ড্রইং। দেখি, সবাই কাজ করছে, একজন শুধু আমাকেই দেখছে। আমার তো ভেতরে কাঁপুনি ধরে গেল। আমাদের সময়ে কোনো মেয়ে ছিল না। কোনো রকমে ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে এলাম। পরিচয় করিয়ে দিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলামের স্ত্রী রুবি ইসলাম। তিনি ওর বন্ধু। খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ি থেকে প্রস্তাব গেল। ওদের বাড়ির অমত ছিল না। বিয়ে হয়ে গেল। হ্যাঁ, প্রথম দেখায় ভালো লেগেছিল। প্রেম যদি বলতে হয়, সেটা হয়েছে বিয়ের পর। বিয়ের আগে প্রেম করার সুযোগ হয়নি।'

সে সময়ের স্মৃতিচারণা করেছেন শিল্পী তাহেরা চৌধুরী এভাবে, 'আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলেন মিসেস আমিনুল ইসলাম। তিনিই পরিচয় করিয়ে দিলেন একদিন। এরপর পারিবারিকভাবেই প্রস্তাব দেওয়া এবং বিয়ে। বিয়ের প্রস্তাবের পর হয়তো রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটাহাঁটি করেছি। কখনো কোথাও খেতে যাওয়া, তাও দল ধরে। তখন ঢাকায় অত বেড়ানোর জায়গা কোথায়। এত রেস্তোরাঁও তো হয়নি। দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া হতো। আড্ডা জমত।'

বিয়ের সিদ্ধান্তটা পাকাপাকিভাবে নেওয়া হলো কেমন করে? বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কি কোনো দ্বিধা ছিল মনে? না, তাহেরা চৌধুরী কোনো দ্বিধা করেননি। তা ছাড়া পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর বন্ধু সৈয়দ শামসুল হককে ডেকেছিলেন একদিন। আর্ট কলেজ ছুটির সময় কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখিয়েছিলেন বন্ধুকে। যে মেয়েটি রিকশায় উঠছে, তাঁকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন তিনি। কেমন? জানতে চেয়েছিলেন বন্ধুর মত। 'ভালোই তো', সৈয়দ শামসুল হকের এই মন্তব্যের পর মনে কোনো দ্বিধা কাজ করেনি। যুগলজীবনের ৫৪ বছর অতিক্রম করছেন শিল্পী দম্পতি কাইয়ুম চৌধুরী ও তাহেরা চৌধুরী।

১৯৬০ সালে বিয়ের পর আর্ট কলেজ ছেড়ে যোগ দিলেন কামরুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত আর্ট সেন্টারে। ১৯৬১ সালে ডিজাইন সেন্টার ছেড়ে যোগ দিলেন অবজারভার হাউসে চিফ আর্টিস্ট হিসেবে। অবজারভার হাউস থেকে তখন ইংরেজি দৈনিক ছাড়াও প্রকাশিত হচ্ছে সিনে-সাপ্তাহিক 'চিত্রালী'। ১৯৬২ সালে কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর বটম ছবির জন্য লাহোরের ন্যাশনাল এক্সিবিউশন অব পেইন্টিংসে সম্মাননা লাভ করেন।

চিত্র সমালোচকরা কাইয়ুম চৌধুরীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কাইয়ুম চৌধুরী চেয়েছেন তাঁর ছবিতে এ অঞ্চলের পরিচয় যেন ফুটে ওঠে। যে আলো-হাওয়ার ভেতর দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা, কাইয়ুম চৌধুরী তার আনুগত্য ও ঋণ স্বীকার করতে চান। নদীমাতৃক এই কৃষিনির্ভর সমাজকে তিনি তাই তুলে আনেন তাঁর ছবিতে, যেখানে ফুটে ওঠে লোকজ শিল্পের বিভিন্ন দিক। সমালোচকদের ভাষায়, 'লোকজ শিল্প কাইয়ুমকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, এ সব কিছুর মূলে তাঁর স্বদেশ ও স্বাজাত্যভিমান এবং গৃহাভিমুখিতা, গৌরবের দিকে হিসেবে।'

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৩ সালে প্রথম যে মিছিলটি বেরিয়েছিল, তার সম্মুখভাগে কাইয়ুম চৌধুরী যেমন ছিলেন প্ল্যাকার্ড হাতে, তেমনি দেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর ক্যানভাসে। বাংলাদেশ '৭১, গণহত্যা, দগ্ধ গ্রাম, শহীদ '৭১, মৃত জেলেরা, জ্বলন্ত ঘাট ইত্যাদি ছবি কাইয়ুম চৌধুরীর প্রতিবাদী শিল্পীসত্তাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরে।

১৯৭৭ সালে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল শৈশব স্মৃতি। একই বছর তিনি ভূষিত হন শিল্পকথা একাডেমি পুরস্কারে। এর আগে ১৯৭৫ সালে পান জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিশেষ স্বর্ণপদক। ১৯৯৯ সালে শিল্পাঙ্গন আয়োজন করে তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনীর। এই নব্বইয়ের দশকে এসে কাইয়ুম চৌধুরী যেন নতুন এক জগতের সন্ধান পেলেন। তাঁর কাজে এ সময় থেকে নতুন এক ছন্দের দ্যোতনা পাওয়া যায়। নিজের ছবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন, 'গ্রামবাংলার ছবি আমার মনকে সজীব করে দেয়।'

কাইয়ুম চৌধুরীর ছবি রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় চিত্রশালা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বঙ্গভবন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট, সাও পাওলো, ব্রাজিলসহ দেশ-বিদেশে অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে।

মন্তব্য