kalerkantho

তোয়াব খান : পাঠক যাঁর প্রাইমারি কনসার্ন

আলী হাবিব   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



তোয়াব খান : পাঠক যাঁর প্রাইমারি কনসার্ন

ছবি : রফিকুর রহমান রেকু

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে একেকটি মাইলফলক রচিত হয়েছে তাঁরই নেতৃত্বে। প্রথম চাররঙা সংবাদপত্র এর মধ্যে একটি। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, 'সব সময়ই পাঠকরা আমার প্রাইমারি কনসার্ন। প্রতিবারই আমি তাদের নতুন কিছু দিতে চেয়েছি'

ষাট দশকের পেশাদার জীবন। আশি পেরিয়েও সমান সক্রিয়। যেকোনো তরুণের সঙ্গে সমান তালে কাজ করতে পারেন। প্রতিদিন রুটিন মেনে চলা; ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ। একটুও এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষণ তাঁর রুটিন করা। ঘুম থেকে উঠে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রায় সব খবরের কাগজ সামনে বিছিয়ে বসেন। সামনে তখন হয়তো টেলিভিশনের পর্দায় কোনো নিউজ চ্যানেল। রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে টিভি পর্দায় শেষ খবরটি দেখা। নিজের কাগজের অবস্থার খোঁজখবর নেওয়া- এসব তাঁর প্রাত্যহিক রুটিনের অংশ। আর এভাবেই পেশাদারিতে ছয়টি দশক পার করে দিলেন দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক, একাত্তরের কলমযোদ্ধা তোয়াব খান। যে আদর্শিক চিন্তায় দীক্ষা নিয়েছিলেন কৈশোর উত্তীর্ণকালে, সেই জীবনবোধ থেকে কোনো দিন চ্যুত হননি। চাকরি খুুইয়েছেন, লড়াই করেছেন। কিন্তু পা বাড়াননি আপসের পথে। তাই প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তি নিয়ে কোনো হিসাব করতে বসেন না। এমনকি গায়ে মাখেন না উপেক্ষাও। ১৯৫৫ সালে সাংবাদিক হিসেবে পেশাদারির শুরু। পরে কাজ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে। ছিলেন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও পিআইবির মহাপরিচালকও। আবার ফিরেছেন নিজের কাগজ দৈনিক বাংলায়। সেখান থেকেও চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আপস করতে যাননি কোথাও। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান বলতে যা বোঝায়, তার শেষ সলতে তোয়াব খান। যদিও নিজেকে মানিক মিয়া কিংবা জহুর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে তুলনা করতে একেবারেই নারাজ তিনি। বলেন, 'তাঁরা যে সাংবাদিকতা করেছেন, তার ধারেকাছেও আমরা নেই।'

অন্য রকম এক জীবন। জীবনবোধটাও তাই নিতান্তই নির্মোহ। বেড়ে ওঠা সাতক্ষীরায়। জন্মগ্রাম রসুলপুর আলোকিত ও বর্ধিষ্ণু। সেখানেই কেটেছে ছেলেবেলা। ছেলেবেলায় মা যতটা, ততটাই তাঁর জীবনকে প্রভাবিত করেছেন খালা, জাতীয় অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এম আর খানের মা। আর সেই বেড়ে ওঠার পরিবেশ? তোয়াব খানের ভাষায়, 'বাড়িতে বহমান ছিল স্বদেশিকতার উতল হাওয়া। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত আত্মীয়স্বজন।' মওলানা আকরম খাঁ তাঁদের অন্যতম। তিনি মাদ্রাসা গড়েছেন বিকল্প শিক্ষায় গ্রামবাসীকে শিক্ষিত করতে। তাঁর জামাতা রেজ্জাক খান, যিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মুজফফর আহমেদ, ডাঙ্গেদের সঙ্গে। তিনিও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন স্থানীয়দের শিক্ষিত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতে। খেলাফত আন্দোলনের জন্য জিহাদিদের ট্রেনিং হতো তুরস্কে। যেতে হতো আফগানিস্তান হয়ে। পূর্ববাংলা থেকে সেখানে যাওয়ার ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল ওই রসুলপুর গ্রাম। এসব খুব কাছ থেকে দেখা। জীবনের সূচনাপর্বের এ সব কিছুই সারা জীবন কাজ করেছে চলার পথের প্রেরণা ও অনুঘটক হিসেবে।

তোয়াব খান পড়েছেন সাতক্ষীরার শতাব্দীপ্রাচীন পিএন (প্রাণনাথ) স্কুলে। দেশের এক প্রান্তে হলেও পিএন স্কুল ছিল সময়ের নিরিখে যথার্থ অগ্রসর আর বিশেষ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। শিক্ষকরা এখনো উজ্জ্বল তাঁর স্মৃতিতে। শৈশব থেকে কৈশোরের উত্তরণপর্বটা তাঁদের জন্যই যে যথাযথ হতে পেরেছে, তা স্বীকার করেন পরম শ্রদ্ধায়।

দীর্ঘ জীবনে অভিজ্ঞতার ঝুলিটি সমৃদ্ধ হয়েছে নানা ঘটনার ভেতর দিয়ে। প্রত্যক্ষ করেছেন পঞ্চাশের মন্বন্তর। বাংলা ১৩৫০। ইংরেজি ১৯৪২। তখন নিতান্তই শিশু তিনি। মাত্র ৮। কিন্তু স্মরণ করতে পারেন সেসব দিন। মনে আছে চারদিকে বুভুক্ষু মানুষের মিছিলের কথা। কী সব দুর্বিষহ দিন গেছে! প্রতিদিন মরছে মানুষ। সাতক্ষীরার পাকা রাস্তা দিয়ে লোহার চাকা লাগানো মড়া ফেলার গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ডোমেরা। 'ঘড়ঘড়ানি আওয়াজ শুনলেই বুঝে যেতাম আরো এক হতভাগ্যের জীবনে পূর্ণচ্ছেদ পড়ল'- স্মৃতি হাতড়ে বলেন তোয়াব খান।

পাকাপাকিভাবে ঢাকায় চলে আসা ১৯৫১ সালে। উঠলেন মামার বাসায়। কিন্তু বছর না ঘুরতেই ভাষা আন্দোলনে দেশ উত্তাল। মামার বাসাটা আবার পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ড আখড়া। মাঝেমধ্যেই সেখানে ডাকসাইটে নেতারা আসছেন। থাকছেন আত্মগোপন করে। মণি সিংহ, খোকা রায়, নেপাল নাগ, সালাম ভাই ওরফে বীরেন দত্ত- এমনকি আলতাফ আলীও। তাঁদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে। ভেতরে ভেতরে একটা পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে যৌবনের চৌকাঠে পা রাখা তোয়াব খানের। বললেন, 'বোধ হয় এভাবেই অজান্তে হয়ে গেছে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দীক্ষা। বদলে গেছে জীবনের গতিপথও। এভাবে অনেকটা ঘোরের মধ্যে চলে যাওয়া। তাতে ক্রমেই শিকেয় উঠছে পড়াশোনা। পেয়ে বসছে বিপ্লবের নেশা।' স্বীকার করেন, এই সময়টা তাঁর জীবনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

১৯৫৫ সালে শুরু করেছিলেন সংবাদের অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে। কেমন ছিল তখনকার দিনের সংবাদ? তোয়াব খানের ভাষায়, "সংবাদের তখন একেবারে ভঙ্গুর দশা। আহমেদুল কবীর সাহেব করাচি থেকে এসে হাল ধরলেন। তিনি ছিলেন করাচিতে ডেপুটি চিফ কন্ট্রোলার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট। ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসে তিনি এখানে প্রথম একটি কাঠপেনসিলের ইন্ডাস্ট্রি করলেন। এর নাম ছিল এসেন্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রিজ। কোকা-কোলা এ দেশে চালু হওযার আগে ভিটাকোলা নামে একটি পানীয় বাজারজাত করেছিলেন আহমেদুল কবীর সাহেব। এটাই ছিল তাঁর ব্যবসা। তখন রাজনৈতিক অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের ক্ষমতাত্যাগ, যুক্তফ্রন্টের বিজয়, নুরুল আমীনের বিদায়- সব মিলিয়ে অবস্থাটা তখন একটু অন্য রকম। আহমেদুল কবীর সাহেবরা ভাবলেন, কাগজ একটা বের করা যায়। সংবাদ ছিল নুরুল আমীনের কাগজ। আহমেদুল কবীর সাহেবরা ছিলেন তাঁর ভাগ্নে। তাঁরা এই কাগজটা বের করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সাংবাদিকদের বেতনে ঘাটতি পড়তে শুরু করল। তখন অনেক নামকরা সাংবাদিক ওখানে কাজ করতেন। কবি হাবীবুর রহমান থেকে শুরু করে রাজ্জাক সাহেব ('কন্যাকুমারী' উপন্যাসের লেখক, পরে দৈনিক বার্তার সম্পাদক), সানাউল্লাহ নূরী- সবাই সংবাদে। রণেশ দাশগুপ্ত তখনো জেলে। তখন সংবাদের রিপোর্টার ছিলেন দুজন। একজন ফয়েজ আহমেদ, অন্যজন কুদ্দুস। কুদ্দুস সাহেব বিআইডাব্লিউটিএর প্রথমে পিআরও, পরে ডাইরেক্টর হয়েছিলেন। অবস্থাটা আরেকটু বলা দরকার। প্রথমে কুদ্দুস সাহেব চলে গেলেন। এরপর ফয়েজ সাহেব। বেতন নেই। প্রতিদিন কাজ বন্ধ হয়। ১৯৫৬ সালের দিকে কেজি মুস্তাফা সাহেবকে আনা হলো। ওদিকে প্রত্যেক দিন বেতনের জন্য ঝগড়া করতে হয়। একসময় কে জি ভাই সংবাদ ছেড়ে চলে গেলেন।"

'বিয়ের পর আলাদা সংসার। হ্যাঁ, সে এক দিন গেছে বটে! কষ্টের ভেতর দিয়েই সংসার শুরু। শুরুতে খুবই কষ্ট করতে হয়েছে। মাত্র ২৫০ টাকা বেতন, তাও ঠিক সময়ে হয় না। ভেঙে ভেঙে বেতন দেয়। কাজ করি সংবাদে। বার্তা সম্পাদক। সকালে রিপোর্ট করতে বেরিয়ে যেতাম। অ্যাসেম্বলি কাভার করতাম। এর পেছনেও ছিল আর্থিক কারণ। অ্যাসেম্বলি কাভার করলে অফিস থেকে নগদ ১০ টাকা পাওয়া যেত। সেখান থেকে পয়সা বাঁচানো যেত। অফিসের এক রিপোর্টারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে একটা বাসা নিয়ে থাকতাম। তো সেই চরম কষ্টের দিনগুলোতেও নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল। দৈনিক পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পর সংসারে কিছুটা সচ্ছলতা আসে। একসময় নিজের একটা গাড়িও কিনি।'

তোয়াব খান ১৯৬১ সালে বার্তা সম্পাদক হন সংবাদের। ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক পাকিস্তানে। ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলার সম্পাদক হন। ওই সময় বাংলাদেশের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নানা বিচ্যুতি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে কলাম লেখায়। 'সত্যবাক' নামে দৈনিক বাংলায় শুরু করেন 'সত্যমিথ্যা, মিথ্যাসত্য' শিরোনামে বিশেষ কলাম। এই কলামে উঠে আসে একটি স্বাধীন দেশের আর্থসামাজিক চিত্র।

১৯৭৩-৭৫ সালে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেসসচিব। আর ১৯৮৭ থেকে ৯১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এরশাদ ও প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রেসসচিব। ১৯৮০-৮৭ সালে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা। পালন করেছেন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের দায়িত্বও। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক। তাঁর তীক্ষ্ন লেখনী আর আকর্ষক উপস্থাপনায় নিয়মিত প্রচারিত হয়েছে 'পিন্ডির প্রলাপ'। স্বাধীন বাংলা বেতার নিয়ে তাঁর রয়েছে ভালো ও মন্দে মেশানো অনুভূতি।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে একেকটি মাইলফলক রচিত হয়েছে তাঁরই নেতৃত্বে। প্রথম চাররঙা সংবাদপত্র এর মধ্যে একটি। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, 'সব সময়ই পাঠকরা আমার প্রাইমারি কনসার্ন। প্রতিবারই আমি তাদের নতুন কিছু দিতে চেয়েছি।'

সংবাদপত্রে পুরো পাতা ফ্যাশন আর টেকনোলজির জন্য বরাদ্দের কথা তাঁর আগে আর কে-ই বা ভেবেছেন! দৈনিক জনকণ্ঠে তিনি সেটাই করেছেন। পাঠককে দিয়েছেন নতুন স্বাদ। এটা একদিকে যেমন পাঠকদের কথা মাথায় রেখে, তেমনি সময়ের দাবিকে মেনে। আজকে বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির যে রমরমা অবস্থা, তার নেপথ্যে দৈনিক জনকণ্ঠের ফ্যাশন পাতার রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। আর সেই পাতার রূপকার তোয়াব খান।

ব্যক্তিগত জীবনে তোয়াব খান এক সুখী মানুষ। সুখী দাম্পত্যের গুপ্তিমন্ত্রটা কী? তোয়াব খান বললেন, 'শুরু থেকে একটা পরিকল্পনা থাকতে হবে। কী চাই, সেটা নির্দিষ্ট করে ফেলতে হবে। কী করব, কেন করব, কিভাবে করব- পরিকল্পনা স্পষ্ট থাকতে হবে। তাতে জীবনটা সহজ হয়ে যায়। সব কিছু সহজভাবে নিলে কোনো কিছুই আর কঠিন মনে হয় না। জীবন উপভোগ্য হয়। মনে হয়, ভেসে ভেসেই পেরিয়ে গেল জীবন। তবে আমি ম্যানেজমেন্টটা তাঁর হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাঁর। শুরু থেকেই বেতনকড়ি যা পেয়েছি, তাঁর হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত থেকেছি। বাড়ি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর। ওখানে আমি কখনো হস্তক্ষেপ করিনি। যে বাড়িতে এখন থাকি, এই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর। ওখানে আমি কোনো দিন মাথা গলাতে যাইনি।'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা