kalerkantho

আলোকিত পথিকৃৎ ড. জাফর ইকবাল

আহমেদ নূর   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



আলোকিত পথিকৃৎ ড. জাফর ইকবাল

ছবি : আশকার আমিন রাবি্ব

শিক্ষার্থীদের গণিতভীতি দূর করতে এবং গণিতকে জনপ্রিয়করণের মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে ড. জাফর ইকবালের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে 'নিউরনে অনুরণন' নামের পত্রিকায় একটি কুইজ চালু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু হয় গণিত অলিম্পিয়াড। শুরু থেকেই তিনি এই অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন

'দুঃস্বপ্নের রাত এবং দুর্ভাবনার দিন' কাটিয়ে তাঁর প্রত্যাশা 'আরো একটি বিজয় চাই'। বাংলাদেশ তাঁর কাছে 'স্বপ্নের দেশ'। যে দেশ 'এখনো স্বপ্ন দেখায়'। প্রতিনিয়ত নিউরনে অনুরণিত হয় স্বপ্নগুলো। আর আদর্শ 'এক টুকরো লাল-সবুজ কাপড়'। তিনি তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত মানুষ হওয়ার মন্ত্র শোনান। যা কিছু অসুন্দর, অশুভ ও অন্ধকার, তার বিরুদ্ধে আলোর মশাল হাতে অবিরাম ছুটে চলেন তিনি। সাহসে-সংকল্পে আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনিই হন প্রজন্মের সারথি। যাকে নিয়ে প্রজন্ম গর্ব করে- সেই সফল মানুষ, আলোকিত মানুষ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

বাংলাদেশ আজ বিশ্ব গণিত অলিম্পিয়াডের সদস্য, দেশের আকাশে উড়ছে ড্রোন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি রেজিস্ট্রেশন করতে এখন একটি মোবাইল এসএমএসই যথেষ্ট। এখন তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে। আর নেপথ্য থেকে যিনি এসবে অবদান রেখে চলেছেন, তিনিই সেই আলোকিত শিক্ষক। দেশের খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বর্তমানে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান।

যে বছর এ দেশের মানুষ বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়ে মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, সেই বছরই জন্ম হয় এই খ্যাতিমান মানুষটির। ১৯৫২ সালের ২৩ ডিসেম্বর তিনি সিলেটের মীরাবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা আক্তার খাতুন। দেশে শিক্ষাজীবন শেষ করে পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। পিএইচডি শেষে খ্যাতনামা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বেল কমিউনিকেশনসে রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের একটি ক্যালটেকে কাজ করেন, যে প্রতিষ্ঠানে সে সময় আরো ১০ জন নোবেল লরিয়েট কাজ করতেন। তার পরও যুক্তরাষ্ট্রে এত সম্ভাবনার হাতছানি তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের অপার সম্ভাবনা ফেলে চলে আসায় কোনো আক্ষেপও নেই তাঁর। বরং জাফর ইকবাল মনে করেন, আরো আগে তাঁর দেশে আসা উচিত ছিল। তিনি বলেন, 'আমেরিকার যেটা হাতছানি, সেটা আমার কাছে কখনোই হাতছানি মনে হয়নি। আমি আমার নিজের দেশে আসার জন্য খুব ব্যস্ত ছিলাম। দেরি হয়ে গেছে আসতে। আরো আগে আসা উচিত ছিল। তার পরও এখানে এসে জীবনের একটি অংশ দিতে পেরেছি, এ জন্য আমার নিজের একটা সান্ত্বনা আছে। আমি আমার পুরো জীবনটাই আমেরিকার জন্য দিইনি। দেশের জন্যও দিয়েছি।'

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এখন পর্যন্ত সেখানেই আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন, যা সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অনুকরণীয় হয়ে আছে। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাকবোনের মাধ্যমে ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়। দেশের ইতিহাসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে সেটি ছিল প্রথম ঘটনা। একসময় পাবলিকবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং ফলাফলের জন্য মাসাধিককাল অপেক্ষা করতে হতো শিক্ষার্থীদের। কিন্তু এখন দেশের যেকোনো জায়গা থেকে ঘরে বসেই ভর্তি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করতে পারছে শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার এক দিন পরই ফলাফলও দিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। দেশের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি রেজিস্ট্রেশন শুরু করে, যা এখন সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুসরণ করা হচ্ছে।

শুধু কি তা-ই, আরো অনেক উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অনেকের চেয়ে এগিয়ে, যার মূল নেতৃত্বে রয়েছেন জাফর ইকবাল। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলাফেরার সুবিধার্থে 'অবস্টেকল ডিটেকশন ফর ব্লাইন্ড পিপল' নামের যন্ত্র। অন্ধদের পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে 'ডিজিটাল ব্রেইল রিডার', যার মাধ্যমে যেকোনো লেখা প্রিন্ট করে নেওয়া, এমনকি পেনড্রাইভের মাধ্যমে ব্রেইল রিডারে প্রবেশ করালে তা ব্রেইলে কনভার্ট হয়ে যায়। হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য তৈরি করা হয়েছে 'হার্টবিট সেন্টার' নামক যন্ত্র। এর মাধ্যমে রোগীর অবস্থান যেখানেই থাকুক না কেন, হৃৎকম্পন অস্বাভাবিক হলেই পরিবারের সদস্যরা জানতে পারবেন। গুণী এই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানেই শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছে ট্র্যাকিং ডিভাইস। মূলত বিআইডাব্লিউটির জন্য এটি করা হয়েছে। সেটি ব্যবহারও করা হচ্ছে। কিন্তু এই ডিভাইসটি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলোতে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। তারা একটি মোবাইল মেসেজের মাধ্যমেই জেনে নিতে পারে বাসটি রাস্তার কোথায় আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানোর ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে এসএমএস বেইজড কন্ট্রোলিং সিস্টেম, যার মাধ্যমে দূর থেকে একটি মোবাইল এসএমএস দিয়ে অফিস কিংবা বাসায় থাকা যেকোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালু অথবা বন্ধ করা যাবে। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, জিএসএম নেটওয়ার্কের আওতায় পৃথিবীর যেকোনো স্থানে এটি কাজ করবে।

তবে সবচেয়ে সাড়াজাগানো ঘটনা হচ্ছে চালকবিহীন আকাশযান ড্রোন তৈরি। ইতিমধ্যে ড্রোনের প্রথম দফা পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। আর এ সব কিছুর পেছনে যিনি নিজের মেধা দিয়ে, শ্রম দিয়ে, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়ে করিয়ে নিচ্ছেন, তিনি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। যদিও এ সব কিছুর কৃতিত্ব তিনি নিজে নিতে চান না। তাঁর মতে, 'এখানে অনেক কাজ করেছি এ জন্য সব সময় আমাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। সেটা আসলে পুরোপুরি সঠিক নয়। অনেক কাজ করতে পেরেছি, কারণ যাঁরা আমার সাথি, সহকর্মী ছিলেন, আমার তরুণ শিক্ষকরা ছিলেন, তাঁরা আমাকে সব সময় সাহায্য করেছেন।' তিনি বলেন, 'টেকনোলজির বিভিন্ন জিনিস আমি হয়তো সাহস করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি; কিন্তু বাস্তবায়ন করেছেন তাঁরা।'

গবেষণা, আবিষ্কার কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রের বাইরেও তাঁর রয়েছে অসামান্য অবদান। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে তাঁর কর্মকাণ্ড অবিস্মরণীয়। তাঁর মতে, 'এখানে এসে আমি দেখেছিলাম বাংলাদেশে একটা জেনারেশন তৈরি হয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ঠিক ভালোভাবে জানে না এবং অনেক কিছুতে তারা কনফিউজড।' আর এই উপলব্ধি থেকেই নিজের দেশকে জানার এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার ইতিহাস জানাতে তিনি শুরু করেন 'মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো' কর্মসূচি। সারা দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সংযোগ ঘটিয়ে দেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ থেকে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধগাথা শোনে তরুণ প্রজন্ম, যা একসময় গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। পাশাপাশি নিজে 'ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস' নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সহজ ও সাবলীল ভাষায় দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিসংগ্রামের কাহিনী এর আগে এভাবে তুলে ধরা যায়নি। সারা দেশে লাখ লাখ কপি বই পড়েছে শিক্ষার্থীরা। তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও সফল হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠেছে। এখন তাঁর নিজের উপলব্ধি, 'যখন গণজাগরণ মঞ্চ হলো, তখন আমরা প্রথম টের পেলাম আসলে আমাদের দেশের ইয়াং জেনারেশন আছে, যারা মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসে এবং ধারণ করে। এবং সেই ঘটনা ঘটার পর থেকে আমি এখন অনেক রিলাক্স। কারণ তারা আমাদের থেকেও তীব্রভাবে অনেক জায়গায় মুক্তিযুদ্ধটাকে অনুভব করতে পারে। কাজেই এখন আর বাংলাদেশ নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই।'

শিক্ষার্থীদের গণিতভীতি দূর করতে এবং গণিতকে জনপ্রিয়করণের মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে ড. জাফর ইকবালের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে 'নিউরনে অনুরণন' নামের পত্রিকায় একটি কুইজ চালু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু হয় গণিত অলিম্পিয়াড। শুরু থেকেই তিনি এই অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এ বিষয়ে একাধিক গ্রন্থও তিনি রচনা করেন। সেই উদ্যোগের ফলে আজ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে পারছে। প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করছে। গণিতকে এখন আর ভয় করে না শিশুরা। তারা গণিতকে জয় করেছে। শিশুরা এখন গণিতের মজা পেয়ে গেছে। যার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় আমাদের শিশুরা গণিত জয়ের স্বপ্ন দেখছে।

জাতিকে বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সায়েন্স ফিকশন ও বিজ্ঞানবিষয়ক তাঁর ৫৪টি বই রয়েছে, যা এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি করেন। শুধু তা-ই নয়, ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নে তিনি ভূমিকা রাখেন। এ নিয়ে তিনি নিজেও সন্তুষ্ট। তাঁর মতে, 'আমি ওখানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। পাঠ্য বইগুলো ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইয়ের ভেতরে আছে। আমাদের দেশের প্রায় তিন কোটি ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে। গত পাঁচ বছরে সঠিক ইতিহাস পড়ার সুযোগ ওরা পেয়েছে। কাজেই এটা তাদের মাথার মধ্যে গেঁথে গেছে। তারা যখন বড় হবে, তারা যখন কাজ করতে যাবে তাদের আর কনফিউজ করা যাবে না। কারণ তারা জানে। কাজেই আমার মনে হয়, বাংলাদেশের ভিত্তিটা, মুক্তিযুদ্ধের যে ভিত্তিটা সেটা মোটামুটিভাবে তৈরি হয়ে গেছে।'

একাডেমিক শিক্ষার বাইরে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারেও তিনি ইনফরমেটিক অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া ফিজিক্স অলিম্পিয়াড, সায়েন্স অলিম্পিয়াড, চেজ অলিম্পিয়াড, অ্যাস্ট্রনমি অলিম্পিয়াড, চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি অসামান্য অবদান রাখছেন। চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রতিবছর শিশুদের দেখানোর জন্য সারা পৃথিবী থেকে সুন্দর সুন্দর ছবি আনা হয়। এ ছাড়া এই উৎসবে শিশুদের ছবি নির্মাণে আগ্রহী করে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এখন শুধু একটি নাম নয়; বরং একটি আদর্শ, একজন সফল মানুষ, সর্বোপরি স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক সারথির নাম। শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও যাঁর কর্ম ও নাম সুবিদিত, যিনি এই দেশ নিয়ে, দেশের উন্নয়ন নিয়ে, তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন, অজেয়কে জয় করার স্বপ্ন, সর্বোপরি আলো দিয়ে আলো জ্বালানোর স্বপ্ন দেখেন। বারবার মৃত্যুর হুমকিও নিজের আদর্শ থেকে তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। সাফল্যকে কখনোই বড় করে দেখতে চান না তিনি। অনেকটা নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন নিজের মতো করে। এত কাজের কাজি হয়েও নিজেকে অলস প্রকৃতির মানুষ বলেই মনে করেন তিনি। আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে তিনি নিজের সম্পর্কে লিখেছেন, 'আমার ধারণা, যারা অলস প্রকৃতির মানুষ, সৃষ্টিকর্তা মায়াবশত তাদের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেন। আমাকে যেমন দিয়েছেন!' এই হলেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

প্রাচুর্য তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। দেশমাতৃকার টানে ছুটে এসেছেন। নেপথ্যে সেই সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন। অবশ্য তিনি সেই স্বপ্নের কথা বলেন না। বলেন, 'আমি তো সেখানে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলাম। আমি আমার দেশে ফিরে এসেছি।' তিনি সব সময়ই বলেন, 'আমি দেশে আসার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তা অত্যন্ত সঠিক একটা সিদ্ধান্ত ছিল। আমি যদি বিদেশে থাকতাম, আমার পুরো জীবনটা ওদের কাজ করে কাটাতে হতো। আমি হয়তো অনেক ভালো থাকতাম। ভালো গাড়ি থাকত, বাড়ি থাকত। টাকা-পয়সা অর্জন করতাম। রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অন্য কোনো ঝামেলায় থাকতে হতো না। মৌলবাদীর হুমকি আমাকে খেতে হতো না প্রতিদিন। তার পরও আমি মনে করি, এখানে আসার সিদ্ধান্তটা আমার ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। আমি আমার সময়টা খুব সুন্দর উপভোগ করেছি এবং করে যাচ্ছি।'

পারিবারিক জীবন : স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়। ছেলে নাবিল ইকবাল, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিওরেটিক্যাল ফিজিক্সে পিএইচডি করেছেন। মেয়ে ইয়েশিম ইকবাল, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পিএইচডি করছেন।

প্রকাশনা : প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৬৫। এর মধ্যে সায়েন্স ফিকশন ৪২টি, কিশোর গল্প-উপন্যাস ৩৪টি, বিজ্ঞানবিষয়ক ১২টি, উপন্যাস সাতটি, ভৌতিক ছয়টি, স্মৃতিচারণা পাঁচটি, কলামগ্রন্থ ১৯টি, শিশুতোষ আটটি, ছোটগল্প চারটি, সংকলনসমগ্র ১৭টি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দুটি, ইংরেজি অনূদিত চারটি এবং নাটক, কবিতা, কমিক সম্পাদনা ও ভ্রমণবিষয়ক একটি করে বই রয়েছে। এ ছাড়া ২৭টি জার্নাল, তিনটি আবিষ্কারের পেটেন্ট রাইট, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ২৫টি প্রবন্ধ উপস্থাপনসহ অর্ধশতাধিক বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ ও নিবন্ধ রয়েছে।

পুরস্কার ও সম্মাননা : বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৫ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পদক, কাজী মাহবুবুল্লাহ জেবুন্নেছা সাহিত্য পদক ২০০২, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পদক ১৪১০ বঙ্গাব্দ, শেলটেক পদক ২০০৩, ইউরো শিশুসাহিত্য পদক ২০০৪, মো. মোছাব্বের-হোসনেআরা সাহিত্য পুরস্কার ২০০৫, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড পদক ২০০৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন পদক ২০০৫, আমেরিকান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন পদক ২০০৫, নাট্যমঞ্চ পদক ২০০৫, ইউরো সাহিত্য পদক ২০০৬, দেওয়ান গোলাম স্মৃতিপদক ২০০৯, অগ্রণী শিশুসাহিত্য পদক ১৪১০ বঙ্গাব্দ, ঢাকা জেলা প্রশাসক পদক ২০০৯, সিড পদক রোটারি ক্লাব অব মেট্রোপলিটন ঢাকা।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড : তিনি জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৭ সাল থেকে তিনি নোবেল লরিয়েট সম্মেলনে বাংলাদেশের একাডেমিক অ্যাম্বাসাডর। বাংলাদেশ ফেডারেশন ফিল্ম সোসাইটির উপদেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধ উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আরো অর্ধশতাধিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

মন্তব্য