kalerkantho

বাঁশিওয়ালা সেলিম উদ্দিন

অমিতাভ দাশ হিমুন   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাঁশিওয়ালা সেলিম উদ্দিন

দিনভর পরিশ্রম করেও পরিবারের প্রতিদিনের খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে। হিমশিম খাচ্ছেন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যয় মেটাতে। 'কিশোর বয়স থেকে মন পড়ে আছে বাঁশিতে। বাড়িতে কত বড় বড় শিল্পীর আসা-যাওয়া, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক। পেশা ছাড়লে কি আর সেই জীবন থাকবে!' দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন বাঁশির জাদুকর সেলিম

গাইবান্ধা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পলাশবাড়ী উপজেলার বৈরী হরিণমারী গ্রাম। এখানেই থাকেন বাঁশির জাদুকর সেলিম উদ্দিন। পলাশবাড়ী বন্দর থেকে রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক ধরে কিছুটা এগিয়ে বাঁ দিকে মেঠো পথে নামতেই চারদিকে সবুজের হাতছানি। জমিতে চাষরত এক কৃষককে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন সেলিম উদ্দিনের বাড়ি। কাছাকাছি যেতেই কানে এলো বাঁশির সুর। সেই সুরই পৌঁছে দিল সেলিমের ঘরের দাওয়ায়। সেখানে বসেই সদ্য তৈরি করা বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন তিনি। পরিচয় দিতেই ঠোঁট থেকে বাঁশি নামিয়ে এগিয়ে এসে হাত মেলালেন। মুখ ঝলমল করছে হাসিতে।

রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের বংশীবাদকদের প্রিয় মানুষ সেলিম উদ্দিন। বয়স ৬০। তাঁর তৈরি করা বাঁশিতে ওঠে মন আকুল করা সুরলহরী। কিন্তু সেলিম উদ্দিনের এখন বড় দুঃসময়। মন খারাপ করা কণ্ঠে বললেন, জীবন বাঁচাতে পেশা বদলানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই তাঁর। একই অবস্থা একই গ্রামের বাঁশির কারিগর তসলিম উদ্দিন ও শহীদুল ইসলামের। দিনভর পরিশ্রম করেও পরিবারের প্রতিদিনের খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে। হিমশিম খাচ্ছেন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যয় মেটাতে। 'কিশোর বয়স থেকে মন পড়ে আছে বাঁশিতে। বাড়িতে কত বড় বড় শিল্পীর আসা-যাওয়া, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক। পেশা ছাড়লে কি আর সেই জীবন থাকবে!' দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন বাঁশির জাদুকর সেলিম। বাবা ফারাজ উদ্দিন ছিলেন দিনমজুর। পাকিস্তান আমলে একবার মেলায় গিয়ে শখের বশে বেশ কটি বাঁশি কিনে আনেন। হঠাৎ করে প্রতিবেশীর বাঁশের ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে ওই বাঁশিগুলো দেখে হুবহু নকল করে বাঁশি বানিয়ে ফেললেন। বিক্রিও হয়ে গেল। সেই থেকে শুরু হলো নতুন পেশা। হাত লাগালেন বড় ছেলে সেলিম উদ্দিনও। একসময় গোটা পরিবারই নির্ভরশীল হয়ে গেল বাঁশি তৈরির আয়ের ওপর। তখন থেকে বাঁশি বানানো নেশা-পেশা দুটোই হয়ে গেল সেলিম উদ্দিনের। মুক্তিযুদ্ধের পর সংসার বেড়েছে। ছোট তিন ভাইও তাঁর দেখাদেখি বাঁশির কারিগর হয়ে গেছে। বছর তিন-চার আগেও বাঁশি বানিয়ে যে আয় হতো তা দিয়ে মোটামুটি ভালোই চলে যেত সেলিম উদ্দিনের সংসার। হাতে কিছু টাকা জমায় একসময় নেমে পড়েন কাঁচা তরকারির ব্যবসায়। দুই মেয়ের বিয়েও দেন। লেখাপড়া শিখে এক ছেলে ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনের চাকরি জুটিয়ে নেয়। ছোট ছেলে স্থানীয় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র। তাকে নিয়ে অনেক আশা বাঁশির জাদুকরের। কিন্তু বাঁশির রোজগার দিয়ে এখন ছেলের পড়াশোনার খরচ মেটানো দায়। এদিকে বয়স থেমে নেই, আগের মতো পরিশ্রমও করতে পারেন না।

সেলিম উদ্দিনের কাছ থেকে জানা গেল বাঁশির সাত-সতেরো। বাঁশি তৈরির জন্য প্রয়োজন বিশেষ জাতের বাঁশ। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কাছ থেকে ওই বাঁশ কিনতে প্রতি মাসে চট্টগ্রামে যেতে হয় তাঁকে। আগের তুলনায় বাঁশের দাম বেড়েছে অনেক। চট্টগ্রাম থেকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পর্যন্ত এক হাজার কোটা বাঁশ আনতে খরচ গুনতে হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এক হাজার কোটা বাঁশ থেকে ৬০০ থেকে ৮০০ ছোট, বড় ও মাঝারি আড় ও মুখবাঁশি তৈরি হয়। বাঁশ কিনে আনলেই তো হলো না। বাঁশি তৈরির জন্য ধাপে ধাপে করতে হয় অনেক কাজ। রোদে শুকানো, বাঁশের গাঁটের সঙ্গে সংগতি রেখে মাপমতো করাত দিয়ে কেটে নেওয়া, কাদামাটির আলপনা এঁকে হাপরের আগুনে আঁচ দিয়ে নকশা করা, এরপর আগুনে তাতানো রড দিয়ে ফুটো করা, শিরিষ কাগজ দিয়ে মসৃণ করে রং করলে তবেই তৈরি হয় বাঁশি।

চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন মেলাকে কেন্দ্র করে পাইকাররা বাঁশি কিনে নিয়ে যান সেলিম উদ্দিনের বাড়ি থেকে। দেশের নানা এলাকা থেকে বাঁশি কিনতে শিল্পীরা আসেন সারা বছর। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে অনেক। কিন্তু মানুষ বাঁশি কিনতে চায় সেই আগের দরেই। সারা দিন কাজ করে গোটা ত্রিশেক বাঁশি বানাতে পারেন সেলিম। চার রকম বাঁশির দাম আলাদা আলাদা। একেকটি ছোট মুখবাঁশির দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা। প্রতিটি ছোট বাঁশি ২০ থেকে ২৫, মাঝারি ৩৫ থেকে ৪০ ও বড় বাঁশি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিকোয়। খরচ বাদ দিয়ে সারা দিনে বাঁশি বিক্রি করে আয় হয় আড়াই থেকে ৩০০ টাকা। কখনো সমঝদার কেউ এলে নামমাত্র দামেও বাঁশি দিয়ে দেন সেলিম উদ্দিন।

হতাশা স্ত্রী পারুল বেগমেরও। বলেন, 'বাঁশির সুরের ঘোর লাগিয়্যা ওমার কোন দিনে টাকা-পয়সা জমান হয় নাই। ভিটেমাটি সম্বল। ন্যাকাপড়া শ্যাষ করি ছোট ছোলটা একটা চাকরি পালে সংসারের অভাব হামার দূর হবে।' এদিকে ছোট ছেলে শামিকুল ইসলামের এই পেশায় আগ্রহ নেই। কারণও আছে। ছোটবেলা থেকেই বাপ-চাচাদের বাঁশি বানানোর কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছে। কিন্তু বাঁশির কদর থাকলেও এই সমাজ বাঁশির কারিগর বাপ-চাচাদের দাম দেয়নি। রংপুর বেতারের নিজস্ব বাঁশিশিল্পী আলিম উদ্দিন বললেন, 'পলাশবাড়ীর প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ সেলিম উদ্দিন একটি শিল্পকে ধরে রাখতে দীর্ঘকাল ভূমিকা রাখছেন। তাঁর তৈরি বাঁশি বাজিয়ে অনেকে বিখ্যাত হলেও ভাগ্য বদলায়নি সেলিম উদ্দিনের।'

পলাশবাড়ীর বিশিষ্ট সমাজসেবী অধ্যাপক সামিকুল ইসলাম লিপন জানালেন, বাঁশি বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে হারিয়ে যাচ্ছেন সেলিম উদ্দিনের মতো মানুষ। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বিরল ওই পেশার মানুষদের ধরে রাখা সম্ভব নয়।

মন্তব্য