kalerkantho

স্বাস্থ্যসেবার রঙিন কারিগর ডা. এম আর খান

তৌফিক মারুফ   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



স্বাস্থ্যসেবার রঙিন কারিগর ডা. এম আর খান

ছবি : তারেক আজিজ নিশক

ডাক্তার এম আর খানের বিস্তৃতি আরো অনেক ক্ষেত্রে। সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত আছেন তিনি। তাঁর মতে, 'সবটাই তো সেবা। মানুষকে নিয়েই তো সমাজ। সমাজের বাইরে কারো অস্তিত্ব নেই। আমার লক্ষ্যই যদি থাকে মানুষের সেবা করব, সে ক্ষেত্রে আমার মূল পেশার কাজের পর অন্য যেকোনো মাধ্যমে যদি আমি মানুষের সেবায় কাজ করতে পারি, তাহলে তো ক্ষতি নেই'

হ্যাঙ্গারে কোন দিন কোন তোয়ালে ঝুলবে তার একটি রুটিন সাঁটানো আছে দেয়ালের এক কোণে। এক দিন লাল, আরেক দিন কমলা তো অন্য দিন হলুদ। এক পাশে বাঘের ছবি, অন্য পাশে মানুষের কঙ্কাল। মাঝে ফুটফুটে সুন্দর দুই শিশুর ছবি। কক্ষের একদিকে রাখা এক সারি চেয়ারে বসে আছেন বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ। সঙ্গে একদল শিশু। কেউ মা-বাবার কোলে, কেউ বা চেয়ারে বসে। ছোট-বড় সবার চোখ ঘুরেফিরে স্থির একজনের দিকে। যিনি ওই কক্ষের মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন ঠিক মাঝখানের চেয়ারটায়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়তে পড়তেও যেন ক্ষণে ক্ষণে বাহু সোজা-শক্ত করে নড়েচড়ে বসেন তারুণ্যের ঢংয়ে। এক-দুই মিনিট পর পর চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে যান একেক শিশুর কাছে। বয়স্ক মানুষটির হাতের ছোঁয়া শিশুর মাথা-চোখ-মুখ হয়ে পেটের ওপর যেতেই খিলখিল করে হেসে ওঠে প্রতিটি শিশু। সুঠাম ও দীর্ঘদেহী শরীর বেয়ে ঝুলে থাকা স্টেথোস্কোপের এক মাথা একেক শিশুর বুকে চেপে ধরে চলে হাসি-ঠাট্টা আর ছড়া-কৌতুকের পালা। এর ফাঁকে ফাঁকেই চলে শিশুদের রোজনামচা-খোঁজখবর। কোন শিশু দিনে কয়বার কী খায়, কখন ঘুম ভাঙে, কখন ঘুমায়, কখন খেলে কিংবা কখন স্কুলে যায় বা আসে- আরো কত কী! এমন আচরণে অভিভূত-মুগ্ধ হয়ে কেবলই দেখতে থাকেন অভিভাবকরা। দেখার কৌতূহল যেন আর যায় না। কারণ এ সময়ে কোনো ডাক্তার এত প্রাণজাগানিয়া রঙ্গরসের কৌশলে রোগী দেখেন, তা কি দুই চোখ ভরে না দেখলে বিশ্বাস করা সম্ভব! তাও কিনা কোনো নবীন-জওয়ান নয়, রীতিমতো ৮৬ বছর বয়সের একজন মানুষ। তাঁর ডাক্তারির বয়সও গুনে গুনে ৬২ বছর পার হচ্ছে। যাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে আছে এই বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বহু দেশে, এত বড় একজন মানুষ কী করে এত সহজ-সরল হয়ে মুহূর্তেই মিশে যেতে পারেন কোলের ছোট অবুঝ শিশুটির সঙ্গে! কিভাবেই বা যুগের পর যুগ লাখো-হাজারো শিশুর প্রাণ বাঁচিয়ে জীবন রাঙিয়ে তোলেন অবিরাম!

যাঁকে নিয়ে এত কথা, এত বর্ণনা, তিনি কে? তিনি আর কেউ নন, ডা. এম আর খান। শিশু-বুড়ো সবাই এক নামে চেনে তাঁকে। শুধু দেশের নবম জাতীয় অধ্যাপক হিসেবেই নয়, তিনি স্বাস্থ্যসেবার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে যাচ্ছেন দেশের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে শুরু করে দেশের বাইরেও। শিশুদের রোগ চিকিৎসার জীবন্ত কিংবদন্তি এম আর খান অসাধারণ সেবায়-বলনে-চলনে ব্যতিক্রমী অনন্য উচ্চতায় আসন গেড়ে নিয়েছেন মানুষের মনে, রাষ্ট্রে ও সমাজে। হয়ে উঠেছেন মানবসেবার আদর্শ উদাহরণ। রকমারি বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই গুণীজন চিকিৎসা ও সমাজসেবায় অনন্য অবদানের জন্য অর্জন করেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনেক সম্মাননা পদক। ব্যতিক্রমী মানবব্রতী জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান কেবলই কি চিকিৎসক বা শিক্ষক! প্রতিক্ষণ হাস্যরস-সাহিত্য উপমার মিশেলে প্রাণবন্ত সেবা সাধনায় ডুবে থাকা এই মানুষটি একাধারে শিশুবান্ধব ও জনমুখী সমাজকল্যাণধর্র্মী অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক। কথার ভাঁজে ভাঁজে কবিতা-গান-প্রবাদ-প্রবচন-বাণী-উদ্ধৃতির আদলে নিজ জ্ঞানের আলো অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এই ব্যক্তিত্ব সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনেও জড়িত ছিলেন। একদফা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি (২০১৪) রাত সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় ১২টা পর্যন্ত ঢাকার ধানমণ্ডির ৩ নম্বর সড়কে ডা. এম আর খানের বাড়ির চেম্বারে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। রাত ১২টায় রোগী দেখা শেষ করে নিজের এক সহকর্মীর সহায়তায় নিজের ব্লাড প্রেশারটা দেখে নিলেন।

আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে চেয়ার ছেড়ে উঠে রোগীর কাছে যাওয়া-আসা দেখে সহজেই মুখ থেকে প্রশ্ন বেরিয়ে এলো, এই বয়সে এই শরীর নিয়ে এখনো নিয়মিত রোগী দেখছেন, এখন একটু বিশ্রাম নিতে পারেন না?

কথাটি শুনে হাতে তুলে ধরা একটি এক্স-রে প্লেট নামিয়ে রেখে এক মায়াবী চেহারায় বলতে লাগলেন, 'মানুষের সেবায় ব্রতী হলে বিশ্রামের সুযোগ কই? যত দিন পারি এভাবেই চালিয়ে যাব। এতেই আমার সব আনন্দ ও জীবনশক্তি মিশে আছে। দেখেছেন তো আমার এখানে এত শিশু রোগী! কিন্তু সেই অনুসারে কোনো ঝামেলা নেই, কান্নাকাটি নেই। একের পর এক রোগী দেখছি। শিশুরা বাড়ি থেকে আসে কাঁদতে কাঁদতে আর এখান থেকে ফিরে যায় হাসিমুখে। আমি ওদের দেখা শুরু করলেই ওরা হেসে ওঠে, মজা পায়, এতেই ওরা অনেকটা সুস্থ হয়ে যায়। এ ছাড়া আমি কোনো রোগীকেই কখনো অতিরিক্ত ওষুধ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়ায় বিশ্বাস করি না। আমি প্রতিটি শিশুর প্রতিদিনকার রুটিন শুনি, ওদের শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি বাসার পরিবেশ, দিনে কয়বার কখন কী খায় না খায়, কতটুকু সময় পড়াশোনা বা খেলাধুলা করে কিংবা অন্য কী করে সব শুনে-বুঝে তারপর পরামর্শ দিই। এমনও হচ্ছে যে কোনো ওষুধই লাগল না, কেবল শিশুটির কিছু রুটিন পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দিই। পরে অভিভাবকরা এসে জানান, শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠেছে। কারণ শিশুদের বেড়ে ওঠার মূল বিষয় হচ্ছে তার দৈনন্দিন জীবনাচার। আমার কাছে যারা আসে, তাদের যে আমি একটু সেবা দিয়ে ভালো করতে তুলতে পারছি, এর চেয়ে শান্তি কি আর বিশ্রামে পাওয়া যাবে!'

একজন আদর্শ চিকিৎসক হতে হলে কী মন্ত্র প্রয়োজন? জানতে চেয়েছিলাম এম আর খানের কাছেই। তিনি বিষয়টিকে ব্যাখা করতে গিয়ে বলেন, 'আদর্শের রকমফের আছে। একেক আদর্শ একেক রকম। সেবা যদি প্রধান ধরি, তাহলে সেটাই মুখ্য ব্রত হতে হবে। আর এক দিনে এটা ধারণ-লালন করা যায় না, ধীরে ধীরে শিক্ষাদীক্ষা, পরিবার-পরিবেশ থেকে এটা উঠে আসে। যেমন বীজ আমার ভেতরে বপন করে দিয়েছিলেন আমার স্কুলজীবনের একজন শিক্ষাগুরু গিরেন্দ্রনাথ ঘোষ। আমি আমার পরিবার থেকে যতটা না শিখেছি, তার চেয়েও অনেক বেশি শিখেছি শিক্ষকদের কাছ থেকে। আজকে আমার যতটুকু ধ্যান-জ্ঞান এর অন্যতম প্রেরণাই ছিলেন আমার স্কুলশিক্ষক গিরেন্দ্রনাথ ঘোষ। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল অসীম। তিনি সব সময় চেয়েছিলেন আমাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। আমরাও চেষ্টা করেছি তাঁর আদর্শ বাঁচিয়ে রাখতে। এ ছাড়া পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার ব্যাপারটিতেও তখন গুরুত্ব দেওয়া হতো। এসবের পাশাপাশি আমরা তখন থেকেই শিখেছি, কী করে মানুষকে ভালোবাসতে হয়, বড়দের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে হয়। কী করে মানুষের সেবা করা যায়। আমাদের সময় বড়দের সম্মান দেখানো ছিল বংশ ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এখন এসবের কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল পাওয়া যায় না। মানুষে-মানুষে ভালোবাসার বোধ, সম্মান-শ্রদ্ধায় বড় ঘাটতি পড়ে গেছে। তাই আদর্শও ঠিক থাকছে না।'

দেশের বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন তিনি। কথা বলেন স্বাস্থ্যসেবার সেকাল-একালের পার্থক্যের মাত্রা ধরন-ধারণ নিয়ে। বলেন, 'অন্য সেক্টরের মতো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায়ও সেকাল-একালে বড় ধরনের পার্থক্য তো চোখে পড়ছেই। এই যেমন ধরুন, এখন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক, হাসপাতালে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকরাও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, আমাদের সময়ে যা পারতেন না। এটা নীতিগতভাবেও ঠিক নয়। একজন শিক্ষক যদি প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে তিনি পড়াশোনার প্রস্তুতি নেবেন কখন? ছাত্রছাত্রীদেরই বা কী পড়াবেন! আমার মতে, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ সংযুক্ত হাসপাতালের সব ডাক্তারকে 'নন-প্র্যাকটিসিং' করে দিয়ে এর বিপরীতে তাঁদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করা দরকার। তবে মানুষের সেবা ও মেডিক্যাল শিক্ষা- দুটোই ভালোভাবে চলবে। এ ছাড়া কেবল পয়সার জন্যই রোগী দেখলে চলবে না। আমরা ডাক্তারি পড়ার সময় এমন শিক্ষাই পেয়েছি। কিন্তু এখনকার অনেকে ডাক্তার হওয়ার আগেই পয়সার খোঁজে নামে।' নিজের চাকরিজীবনের শুরুর সময়কার স্মৃতিচারণা করে বলেন, "আমি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করেই ছুটে যাই আমার নিজ এলাকা সাতক্ষীরায়। আমি গ্রামের অবহেলিত মানুষের সেবার বিষয়টিকে সবার আগে বিবেচনায় নিয়েছিলাম। সাতক্ষীরার মানুষ হয়েও যখন রাজশাহীতে চাকরি করেছি, তখন আমি পুরোপুরি 'রাজশাহীবাসী' হয়ে উঠেছিলাম। এ ছাড়া খুলনা-রাজশাহী-ঢাকা-বিলেত অনেক জায়গায় ঘুরেছি মেডিক্যাল শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার কাজে। তবু আমি কখনোই আমার মূল মাটির টান ছাড়িনি, আমি আমার এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় সাধ্যমতো অবদান রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন তো শুনি ডাক্তাররা গ্রামে থাকতেই চান না। অর্থাৎ আমার চাকরি কোথায় হবে না হবে, পোস্টিং কোথায় হলো না হলো তা ভাবনায় না রেখে যেখানেই থাকব সে এলাকার মানুষকেই আপনজন ভেবে একজন ডাক্তার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।"

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ-অনুযোগ, ওষুধ কম্পানি কিংবা ল্যাব-ক্লিনিক থেকে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে এম আর খানের প্রতিক্রিয়া হলো, "আমাদের দেশের মতো ডাক্তারদের বিরুদ্ধে পাইকারি হারে অভিযোগ অন্য কোনো দেশে নেই। উন্নত বিশ্বে ডাক্তারদের অবশ্যই 'এথিকস' মেনে চলতে হয়। ফলে ওসব দেশে অভিযোগের মাত্রাও কম। তবে আমাদের দেশে সব পেশা নিয়েই প্রশ্ন আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, সব পেশার সবাইকে ঢালাওভাবে এক পাল্লায় মাপা যাবে না। সবার নীতি-নৈতিকতাও এক করে দেখা যাবে না। বাংলাদেশে সবার বিরুদ্ধেই অভিযোগ থাকে। ডাক্তাররা যেহেতু মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত, তাই ডাক্তারের ওপর মানুষের প্রত্যাশাও বেশি থাকে। কিন্তু ডাক্তাররাও তো মানুষ, ফেরেশতা নন। তবে অন্য পেশার তুলনায় মানবসেবার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের ভূমিকা যেহেতু অনেক ঊর্ধ্বে, তাই ডাক্তারদের উচিত এমন সব নেতিবাচক প্রশ্নের যত ঊর্ধ্বে থাকা যায় তেমন চেষ্টা করা। আর নিজের শিক্ষাদীক্ষা থেকেও এসব নৈতিকতা পাওয়া যায়। এ জন্য অবশ্য গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলাম, আমরা মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় যে মানের শিক্ষক ও শিক্ষা পেয়েছি, এখন তেমনটা নেই বলেই ডাক্তারদের সম্পর্কে মানুষের মূল্যায়ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এ কথা বলে আমি তো ভীষণ তোপের মুখে পড়ে গিয়েছিলাম। কেউ কেউ আমাকে রীতিমতো ধরে ছিল, আমি কেন ওই কথা বললাম। কিন্তু কী করব বলুন, আমি যা বিশ্বাস করি এবং যা দেখি, তা কি আমি বলব না! আমার তো চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই মানবসেবা ছাড়া।"

ডাক্তার এম আর খানের বিস্তৃতি আরো অনেক ক্ষেত্রে। সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত আছেন তিনি। তাঁর মতে, 'সবটাই তো সেবা। মানুষকে নিয়েই তো সমাজ। সমাজের বাইরে কারো অস্তিত্ব নেই। আমার লক্ষ্যই যদি থাকে মানুষের সেবা করব, সে ক্ষেত্রে আমার মূল পেশার কাজের পর অন্য যেকোনো মাধ্যমে যদি আমি মানুষের সেবায় কাজ করতে পারি, তাহলে তো ক্ষতি নেই।'

এম আর খানের জন্ম সাতক্ষীরা জেলার রসুলপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে, ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট। বাবা আবদুল বারী খান ছিলেন খুলনা জেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান। মা জায়েরা খানম। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি মেজ। মা-বাবা উভয়েই শিক্ষিত ছিলেন এবং সমাজসেবায় অবদান রেখে গেছেন। মামা-চাচারা ছিলেন সংবাদপত্রজগতের মানুষ। এখনো বৃহৎ পরিবারের অনেকেই আছেন গণমাধ্যম ও শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে বেশ সুখ্যাতি নিয়ে। সহধর্মিণী বেগম আনোয়ারা খান সমাজ ও মানবসেবায় অবদান রেখে গেছেন। একমাত্র সন্তান ম্যান্ডি করিম লন্ডনে বসবাস করছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে।

এম আর খান ম্যাট্রিক পাস করার পর কলকাতা গিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে মামা-চাচাদের কাছে থেকেই চলে পড়াশোনা। ১৯৫২ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ফিরে আসেন সাতক্ষীরা ও খুলনায়। প্র্যাকটিস করেন। যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯৫৬ সালে বিলেতে চলে যান তিনি। বিলেতে বিভিন্ন হাসপাতালে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেন। উঞগ ্ ঐ, উঈঐ ও গজঈচ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিলেতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬৩ সালে দেশে ফেরেন এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অব মেডিসিন পদে যোগ দেন। ১৯৭০ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শিশু বিভাগের অধ্যাপক হন। এই পদে বাংলাদেশে তিনিই প্রথম। ১৯৭১ সালে তৎকালীন ওচগেজ (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়)-এ অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে এখানে উঈঐ ও ঋঈচঝ কোর্স চালু করেন। ১৯৭৯ সালে ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরিচালক পদে যোগ দেন। আজকের ঢাকা শিশু হাসপাতালে এই স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রভূত উন্নতি শুরু হয় তাঁর সময় থেকেই। পরে আবার ওচগেজ-এ ফিরে গিয়ে ৯ বছর কাটান। ১৯৮৮ সালের ১ আগস্ট সরকারি কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। অবসরে এসে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি আরো বেড়ে যায়। শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে সমমনা আরো অনেকেই আছেন। ১৯৯৫ সালে সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক উপাধিতে ভূষিত করে।

এম আর খানের বহু গবেষণা ও প্রকাশনা রয়েছে। এগুলো হয়তো নতুন প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। আটটি বই, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে ৩৭টি গবেষণা উল্লেখযোগ্য।

নতুন প্রজন্মের ডাক্তারদের নিয়েও প্রত্যাশার কমতি নেই এত কিছুর পরও এম আর খানের। তবে নিজের আদর্শ ধারণ করে কেউ সামনে এগিয়ে যেতে চাওয়ার প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত হতে দেখা গেল বর্ষীয়ান এই গুণীজনকে। ঠোঁটের কোণে আধো হাসি আর চোখের ভাষায় কিছুটা আশার ঝিলিক ছড়িয়ে আপন মনে বলেন, 'আমাকে কি কেউ আদর্শ হিসেবে এখন মানে! মনে তো হয় না। তবু যদি কোনো ডাক্তার আমার মতো মানুষের সেবার আদর্শে কিছু করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই রোগীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা শিখতে হবে। ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে রোগী না দেখে রোগীদের সঙ্গে ভালো করে কথা বললে, একটু সময় নিয়ে রোগীর সমস্যা শুনলে, জ্ঞানচর্চা করলে মানুষের আস্থা অর্জন আর নিজেরও দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া সব সময় আগে মানুষের সেবার ব্রতটাকেই সামনে রাখতে হবে। কে আমার প্রশংসা-অপ্রশংসা করল না করল, তা নিয়ে ভাবলে চলবে না। একজন ডাক্তারের ক্ষেত্রে চিকিৎসাকেই মানবসেবার মূলমন্ত্র ধরে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ একজন মানুষ অসুস্থ হলে তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, স্বামী-স্ত্রী, মা-বাবা, ভাইবোন, সন্তান- কেউ ওই অসুস্থ সময়ে অসহায়ত্ব কাটিয়ে তুলতে পারে না, যা পারেন একমাত্র চিকিৎসক। বিধাতার পরেই চিকিৎসকদের অবস্থান বলে একটি কথা আছে। তাই ডাক্তারদের রোগীর সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তুলে তার প্রতি নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যেতে হবে।'

দেশের স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন আছে তাঁর। তবে এ স্বপ্নের মাত্রা খুব বড় কিছু নয়। তাঁর ভাষায়, 'আমি চাই দেশের কোনো মানুষ যেন স্বাস্থ্যসেবার বাইরে না থাকে। যেন সব মানুষের দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যায়। টাকার জন্য যেন কারো স্বাস্থ্যসেবা আটকা না পড়ে। এ জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ বা বিশেষ স্বাস্থ্যবীমা চালু হলে মানুষ খুবই উপকৃত হবে।'

শুরুতে তাঁর চেম্বারে ঢুকে যে তোয়ালের রং বদলের রুটিনটি চোখে ধরেছিল, ফেরার সময় আর কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জানতে চাইছিলাম এর রহস্য। ছোট্ট করে বললেন, 'ওটাকে কেবল পরিচ্ছন্নতার কারণ ভাববেন না। কিংবা রং বদলের ব্যাপারটুকুর মধ্যে আটকা নয়; শৃঙ্খলাবোধের মস্ত এক টনিক হিসেবেই বিবেচনায় নিতে পারেন। একটি তোয়ালে যদি একবার হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখেন, তা সহজে ধোয়া হয় না। অথচ দিনে বহুবার ওটা ব্যবহার করা হয়। পরের দিন ঠিক একই রকম দেখায়। ময়লা চোখে পড়ে না। আবার চোখে ময়লা না দেখলে ধোয়ারও গরজ থাকে না। আবার কর্মচারীরা নিষ্ঠাবান না হলে অনেক সময় না ধুয়েই বলতে পারে ধোয়া হয়েছে। কিন্তু যদি একেক দিন একেক রংয়ের তোয়ালে ঝোলানোর রুটিন মানা হয়, তাহলে অটোমেটিক সব দিক ঠিক থাকে। এ জন্য যে খুব বেশি কিছু ব্যয় হয় তাও কিন্তু নয়। কেবল প্রয়োজন একটু সচেতনতা, যা দিয়ে একদিকে যেমন জীবাণুমুক্ত থাকা যায়, বাড়ে কক্ষের সৌন্দর্য, তেমনি রং বদল ঘটে, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা