kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

কাজ সমান, বেতন অর্ধেক!

মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা

মো. তানফিজুর রহমান, লামা (বান্দরবান)   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাজ সমান, বেতন অর্ধেক!

বান্দরবানের লামা, আলীকদম এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে চলতি মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার একর ফসলি জমিতে ক্ষতিকর তামাক চাষ হয়েছে। এসব জমিতে তামাক চাষে পুরুষ শ্রমিকদের সাথে প্রায় ৩ হাজার নারী শ্রমিক কাজ করছেন।

তামাক চাষের দৈনন্দিন কাজে পুরুষের সমান শ্রম ঘণ্টা কাজ করলেও পারিশ্রমিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।

একজন পুরুষ যেখানে দৈনন্দিন কাজের জন্য ৪০০ টাকা পারিশ্রমিক পান সেখানে একজন নারী শ্রমিক একই সময়ে শ্রম দিয়ে মাত্র ২০০ টাকা পারিশ্রমিক পান বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, লামা, আলীকদম এবং পার্শ্ববর্তী বমু বিলছড়ি এলাকায় চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন তামাক কম্পানির পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রায় ১০ হাজার একর ফসলি জমিতে ক্ষতিকর তামাক চাষ হয়েছে। তামাক চাষে অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি পরিশ্রম করতে হয়। সে কারণে এ চাষে অধিক শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে।

চলতি বোরো ও রবি মৌসুমে বিভিন্ন কম্পানির আওতায় প্রায় ২ হাজার চাষি তামাক চাষ করেছেন। এ ছাড়া তামাক কম্পানিগুলোর রেজিস্ট্রেশন বহির্ভূত আরো ১ হাজার তামাক চাষি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব চাষির আওতায় পুরুষ শ্রমিকের সাথে সমান পাল্লা দিয়ে চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার নারী শ্রমিক গড়ে প্রতিদিনই তামাক ক্ষেতে কাজ করছেন। তামাক চাষের বীজতলা তৈরি, চারা উত্তোলন, জমি প্রস্তুতকরণ, চারা লাগানো, পরিচর্যাকরণ, পাতা ভাঙানো, স্টিক করা এবং তামাক চুল্লিতে তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পুরুষ শ্রমিকদের সাথে সমানতালে নারী শ্রমিকরা কাজ করে থাকেন।

জানা গেছে, তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে সকালে পুরুষ এবং নারী শ্রমিকরা একসঙ্গে একই সময়ে কাজে আসেন।

মধ্যাহ্ন বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে কোদাল হাতে নারী শ্রমিকরা নিরলসভাবে কাজ করে থাকেন। এক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারী শ্রমিকরা সমান শ্রম ঘণ্টা কাজ করে থাকেন এবং উভয় শ্রমিকরা একই ধরনের কাজ করে থাকেন। দৈনন্দিন কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিকরা ৪০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকরা তাদের কাজের জন্য ২০০ টাকা হারে পারিশ্রমিক পান। এ ছাড়া মধ্যাহ্ন বিরতিতে চা-নাস্তার জন্য সামান্য টাকা পেলে সেখানেও নারী শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হন।

লামা পৌর এলাকার লামা মুখ, নুনারবিল, ছাগলখাইয়া ও আলীকদম এলাকায় তামাক চাষে কর্মরত নারী শ্রমিক বিলকিছ, শরিফা, খতিজা, শাহেনুর ও মেহেরুনসহ আরো অনেকে অভিযোগ করে জানিয়েছেন, অন্যান্য ফসলের চেয়ে তামাক চাষে বেশি শ্রম দিতে হয়।

পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে একই সময়ে কাজে এসে, একই সময়ে কাজ ছাড়ার পরও পারিশ্রমিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। নারী-পুুরুষ উভয়ে একই শ্রম ঘণ্টা কাজ করার পরও তাঁরা শুধু নারী, এ অজুহাতে তাদেরকে পুরুষের অর্ধেক বেতন দেওয়া হচ্ছে।

লামা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও তামাক চাষি স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মো. শাহজাহান চলতি মৌসুমে ২ একর জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তিনি জানান, তামাক চাষে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে। পর্যাপ্তসংখ্যক পুরুষ শ্রমিক পাওয়া না যাওয়ায় তাঁরা তামাক চাষের কাজে নারী শ্রমিক নিচ্ছেন। নারী শ্রমিকরা পুরুষের সমান কাজ করতে পারেন না।

তিনি বলেন, ‘একজন পুরুষ শ্রমিক ২/৩ জন নারী শ্রমিকের সমান কাজ করেন। সেজন্য পুরুষ শ্রমিকের পারিশ্রমিক বেশি আর নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিক কম।’

লামা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি শারাবান তহুরা বলেন, ‘সরকার নারীদের উন্নয়নে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। সকল ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দিয়ে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন হলেও আমাদের বেশির ভাগ জনগণেরই এখনো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। কর্মক্ষেত্রে

নারী-পুরুষের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে এমন বৈষম্য কাম্য নয়।’

তামাক চাষের নারী শ্রমিকদের এ বৈষম্য দূর হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।

চলতি শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে তামাক ক্ষেতে কাজে আসা নারী শ্রমিকরা তাঁদেরকে পুরুষের সমান পারিশ্রমিক প্রদান করা না হলেও এ বৈষম্যের ব্যবধান কমানোর জন্য দাবি জানিয়েছেন।

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা