kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বেশি বিক্রি কম লাভ এই ধারণায় জনপ্রিয় হাইওয়ে সুইটস!

মোহাম্মদ মুরাদ চৌধুরী ব্যবস্থাপনা পরিচালক

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বেশি বিক্রি কম লাভ এই ধারণায় জনপ্রিয় হাইওয়ে সুইটস!

প্রতিদিন দোকান বন্ধের পর রাতেই অবিক্রিত মিষ্টিগুলো নিজে উপস্থিত থেকে নষ্ট করে ফেলি। এটা শুরু থেকেই আমার নীতি। যা এখনো বহাল আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

 

১৯৮০ সালে যখন চট্টগ্রামের লালখানবাজারের ছোট্ট পরিসরে হাইওয়ে সুইটসের যাত্রা শুরু হয়; তখন চট্টগ্রামে শুধু মিষ্টি বা মিষ্টান্ন বিক্রি হয় এমন দোকান ছিল না। বোস ব্রাদার্সসহ ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মিষ্টি দোকান থাকলেও সঙ্গে চা-পরোটাও বিক্রি হত।

‘পুুরোপুরি মিষ্টির দোকান’ গড়ে তোলার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে মোহাম্মদ মুরাদ চৌধুরী ও তাঁর দুই বন্ধু আনোয়ারুল কিবরিয়া বাপ্পু, মোহাম্মদ শামিম উদ্দিন যাত্রা শুরু করেন হাইওয়ে সুইটস নিয়ে। তিন বন্ধুর প্রাথমিক পুঁজি ছিল ৫০ হাজার টাকা করে মোট দেড় লাখ টাকা। ঢাকা থেকে কারিগর এনে মিষ্টি তৈরি করে বিক্রি শুরু হলো। প্রথমদিকে মিষ্টির আইটেম ছিল ১২ ধরনের। চাহিদার প্রেক্ষিতে এখন আইটেমের সংখ্যা বেড়ে ৩০টি হয়েছে। প্রতিকেজি মিষ্টি ২৩০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।

সেই সময়ের চ্যালেঞ্জ জানতে চাইলে মোহাম্মদ মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামের অধিবাসীরা মিষ্টি নয়, ঝাল খেতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন-যাত্রা শুরুর সময় এই ধারণা দেওয়া হলেও আমরা মানতে রাজি হইনি। চট্টগ্রামে মিষ্টি ব্যবসা হবে না এমন ধারণা পরিবর্তন করতেই দুবছর সময় লেগেছে!’

হাটহাজারী মাদার্শার বাসিন্দা মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘এমনও হয়েছে যাত্রা শুরুর দুই বছর ভালো ব্যবসা করতে না পারায় এক অংশীদার তো প্রস্তাবই দিয়েছিল মিষ্টির পাশাপাশি ঝাল ও চা বিক্রি অর্থাৎ রেস্টুরেন্ট করার। কিন্তু আমি মানতে রাজি নই। মিষ্টির দোকানে চা বিক্রি করতে হলে প্রয়োজনে ব্যবসা ছেড়ে দেব।’ 

‘সেই সিদ্ধান্তে অটল থেকে ব্যবসা চালিয়ে যাই; দুবছর পর ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়তে থাকে এখন মিষ্টি ছানা প্রভৃতি তৈরিতে প্রতিদিন ৪ হাজার কেজি গরুর খাঁটি দুধ প্রয়োজন হয়।’ যোগ করেন তিনি। 

৩৮ বছর ব্যবসার অভিজ্ঞতা জানিয়ে মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘ফুড ব্যবসাটা সিরিয়াসলি দেখতে না পারলে টিকে থাকা অনেক কঠিন। ভোক্তারা এমন যে, ভুলগুলো আপনাকে একবার/দুবার ক্ষমা করবেন। কিন্তু তৃতীয়বার আপনাকে ক্ষমা করবেন না! ফলে আপনাকে ছিটকে পড়তে হবেই।’

নিজের সফলতার পেছনে দুটি বিষয় কঠোরভাবে মেনে চলেছেন উল্লেখ করে মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিদিন দোকান বন্ধের পর রাতেই অবিক্রিত মিষ্টি নিজে উপস্থিত থেকে নষ্ট করে ফেলি। এটা শুরু থেকেই আমার নীতি, যেটি এখনো বহাল আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’

‘শুধু তাই নয়, উৎপাদনের পর যদি কোনো মিষ্টি বা মিষ্টান্ন বা বেকারি আইটেম মনঃপুত না হয় তাত্ক্ষণিকভাবে সেটি বাতিল করে নষ্ট করা হয়। কখনো সেটি শো রুমে যায় না। এটা কঠোর সিদ্ধান্ত আমার। কোনো মিষ্টি যদি আমি নিজে খেয়ে সন্তুষ্ট না হই তাহলে সেই মিষ্টি ক্রেতাকে দেবো কিভাবে?’ বলেন মুরাদ চৌধুরী।

নিজ হাতে গড়া হাইওয়ে সুইটস আরেকটি সংসার হিসেবে মনে করেন মুরাদ চৌধুরী। ঝড়-বৃষ্টি-শীতে দিনে-রাতে বড় একটা অংশ সেখানেই কাটান তিনি। তিনি বলেন, ‘একদিন কারখানায় মিষ্টি উৎপাদন না দেখলে আমি খুব মিস করি। সকাল পৌনে নয়টা থেকে দুপুর দেড়টা মিষ্টি উৎপাদনের মূল সময় এবং সন্ধ্যার পর থেকে রাত সোয়া ১১টা পর্যন্ত নিজে সেই সংসারে উপস্থিত থেকে তদারক করি।’

প্রায় সময়ই দেখা যায়, চট্টগ্রামের সব শ্রেণি পেশার মানুষ, উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সবাই হাইওয়ে সুইটসের মিষ্টি নিতে আসেন। বিভিন্ন উপলক্ষ ছাড়াও হিন্দু ধর্মের পূজায় অংশজুড়ে আছে এই মিষ্টি।

এর প্রধান কারণ হিসেবে হাইওয়ে সুইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘স্বাদ ও মানটাই হচ্ছে প্রধান; যেটা চট্টগ্রামে আমিই ধরে রেখেছি। আর অন্য যেকোনো ব্র্যান্ডের মিষ্টির চেয়ে আমার মিষ্টি দাম তুলনামূলক অনেক কম।’ 

হাইওয়ে সুইটসে মিষ্টির আইটেমে বড় বৈচিত্র্য এসেছে। এ বিষয়ে মুরাদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু একুশে টিভির আবাসিক সম্পাদক রফিকুল বাহার বলেন, ‘কলকাতা গেলে মুরাদ ভাই একটি টেক্সি নিয়ে বের হয়ে বিখ্যাত সব মিষ্টি দোকান ঘুরে স্যাম্পল নিয়ে ফিরতেন। সবাই একসাথে সেগুলো খেয়ে দেখতাম। পরে বাছাইকৃত মিষ্টি চট্টগ্রামে নিয়ে তাঁর পার্টনার ও কারিগরদের সঙ্গে বসে নতুন আইটেমের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈচিত্র্য আনতেন।’ তিনি বলেন, ‘বিপুল বিক্রি কিন্তু কম লাভ এই ধারণাতে চট্টগ্রামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে হাইওয়ে সুইটস।’

চট্টগ্রামে ওয়েল ফুডের মিষ্টি ব্যবসার সাথে জড়িত মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘ইদানীং মিষ্টির ব্যবসা বেশ জমজমাট হচ্ছে, অনেকে বড় বিনিয়োগে মিষ্টির ব্যবসা করছেন। ভালোও করছেন কারণ ক্রেতা বেড়েছে বিপুল। আমি কাউকে প্রতিযোগী মনে করি না; আমি আমার মতো ব্যবসা করছি।’

লালখান বাজারের বাইরে ১৯৮৫ সালে জামালখানে প্রথম শাখা খোলে হাইওয়ে সুইটস। বর্তমানে নগরীতে শাখার সংখ্যা ছয়টি। ব্যবসা বেড়ে এখন টার্নওভার বছরে ১৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামের বাইরে শাখায় দিচ্ছি না কারণ মান ও স্বাদ এখনকার মতো ধরে রাখতে পারব না! মান ও স্বাদ নিয়ে আপস নেই বলেই এখন পর্যন্ত হাইওয়ে সুইটস আমাদের কর্মী দিয়ে পরিচালনা করছি, কাউকে ব্রাঞ্চও দিইনি।’

বর্তমানে কালুরঘাটে বিসিক শিল্প এলাকায় একটি, লালখানবাজারে একটি কারখানা আছে। যেখান থেকে এসব মিষ্টি, বেকারি, বিস্কুট পণ্য তৈরি হয়।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘রাতারাতি কোটিপতি হব এমন পরিকল্পনা আমার ছিল না, এখনো নেই। ব্যবসা যে গতিতে চলছে তাতেই আমি সন্তুষ্ট। ছেলে মেয়েরা বিদেশে পড়াশোনা করছে; তারা এই ব্যবসা ধরবে কিনা সময়ই বলবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা