kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

অপরাজিতা
রাঙামাটির লংগদুর সাবরিনা তানিয়া

বাবার স্বপ্ন পূরণে শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতির মাঠে

আরমান খান, লংগদু (রাঙামাটি)   

৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাবার স্বপ্ন পূরণে শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতির মাঠে

শৈশব থেকে স্বপ্ন দেখতেন শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৯৫ সালে সেই স্বপ্ন সত্যি হলো। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে সাফল্যের সাথে চাকরি করেছেন একযুগ। কিন্তু যাঁর শরীরে রাজনীতিবিদ বাবার রক্ত বহমান তাঁর কি চাকরি করা মানায়!

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুর রশিদ সরকারের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে শিক্ষকতায় ইস্তফা দিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হলেন সাবরিনা তানিয়া হাওয়া। ২০০৯ সালের সেই নির্বাচনে ১৬ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন তিনি। চেয়ারম্যান হয়ে পাঁচ বছর সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। নারী-পুরুষ সকলের সুখেদুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছেন এমনটাই জানালেন লংগদু উপজেলা পরিষদের সাবেক নারী ভাইস চেয়ারম্যান সাবরিনা তানিয়া হাওয়া।

সম্প্রতি একান্ত আলাপচারিতায় কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন তাঁর শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিবিদ হওয়ার গল্প। নারী ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর দ্বিতীয় মেয়াদে আর নির্বাচন করেননি তিনি। এবার তিনি জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হলেন। প্রথম কাউন্সিলে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের লংগদু উপজেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

এখন একজন পুরোদস্তর রাজনীতিবিদ সাবরিনা তানিয়া সকলের কাছে পরিচিত ‘হাওয়া’ আপা নামে। দিনরাত রাজনীতি করেই পার করেন তিনি। তানিয়ার এক ছেলে ও দুই মেয়ে এবং বৃদ্ধ মাকে নিয়ে ছোট সংসার। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটা পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করছেন। ছোট মেয়েটি পড়াশোনা করছে।

চেয়ারম্যান বাবার যোগ্য কন্যা তানিয়া শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে এসে তৃপ্ত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা তাঁর প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেছেন স্থানীয় একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাবাকে দেখেই মূলত শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখি শৈশবে। এরপর বাবাকে দেখলাম শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে আসলেন। প্রথমে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন। এরপর লংগদু উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান হলেন তিনি। ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর। চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তের গুলিতে ১৯৮৯ সালে ৪ মে নিহত হন তিনি। তখন থেকে আমাদের পরিবারের সবাই রাজনীতি থেকে দূরে ছিলাম।’

‘কিন্তু উপজেলার মানুষ আমার বাবাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর নামে স্কুল করলেন যা করল্যাছড়ি আরএস উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। এছাড়া কালাপাকুজ্যা ইউনিয়নে একটি গ্রামের নাম রশিদপুর। যা আমার বাবার নামে। এমনকি আমার ভাইয়ের নামেও গ্রামের নাম রেখেছে মামুনপুর। এ ভালোবাসা অস্বীকার করি কি করে! নিয়তি আমাকে রাজনীতির মাঠে নিয়ে এসেছে। তবে আমি তৃপ্ত। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি রাজনীতিতে এসে। রাজনীতি করি বলে মানুষের উপকারে আসতে পারি।’ যোগ করেন তানিয়া হাওয়া।

রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে উপজেলা আওয়ামী লীগের দুজন নেতার অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান তিনি। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল বারেক সরকার ও সাংগঠনিক সম্পাদক বাবুল দাশ বাবুর প্রতি কৃতজ্ঞ তিনি। এ দুজন নেতাই তাঁকে রাজনীতির পাঠ শিখিয়েছেন নানাভাবে সহযোগিতা করছেন।

রাজনীতে নারীদের অংশগ্রহণ এবং জনগণের জন্য কাজ করার নানা প্রতিকূলতার কথা বলতে গিয়ে তানিয়া বলেন, ‘অতীতের তুলনায় বর্তমানে মফস্বলের অনেক নারী রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু এখনো নারী জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে নানা ধরনের বৈষম্য আছে। বিশেষ করে উপজেলা পরিষদে ভাইস চেয়ারম্যানদের জন্য আলাদা বরাদ্দ নেই।

চেয়ারম্যান যেসব প্রকল্প ভাইস চেয়ারম্যানদেরকে দেন তাতে নিজেরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নারীদের নির্বাচিত হতে হয়। কিন্তু চেয়ারে বসে জনগণের জন্য কিছু করতে না পারলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আশা করব বর্তমান সরকার নারীদের জন্য বিশেষ করে নারী জনপ্রতিনিধিদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেবেন।’   

রাজনীতিতে সফল এ নারী ভাইস চেয়ারম্যান থাকাকালীন অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন। সেখানকার আদিবাসীদের জীবনযাপন, অধিকার ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ছিলেন নারী ও শিশু নির্যাতন বিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামে জেলা ও উপজেলায় কাজ করেছেন দীর্ঘদিন।

শৈশবে বাবাকে হারিয়ে বাবার দেখানো পথে রাজনীতিতে আসলেও তাঁর বাবাকে হত্যার বিচার আজো পাননি তিনি। ১৯৮৯ সালের ৪ মে দুর্বৃত্তের গুলিতে তাঁকে হত্যার পর পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করলেও সেসব অজ্ঞাত আসামিদের আজও আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।

সব শেষে ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এ নারী রাজনীতিক আজীবন রাজনীতির মাঠে থাকতে চান বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। দল চাইলে আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও প্রার্থী হতে চান সাবরিনা তানিয়া হাওয়া।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা