kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মুক্তিযোদ্ধাদের ভোট ভাবনা

আসন্ন সংসদ নির্বাচন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী দলের প্রতীক নৌকা এবার না জিতলে মুক্তিযোদ্ধাদের চলমান ভাতা-বোনাস কর্মসূচি থাকবে কিনা সন্দেহ।

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মুক্তিযোদ্ধাদের ভোট ভাবনা

বাঁ থেকে : কক্সবাজারের চার মুক্তিযোদ্ধা কেলাসু বড়ুয়া, আবদুল মান্নান, আবদুল খালেক ও সুনিল বড়ুয়া।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ভবনের তিন তলার বারান্দায় গত রবিবার চার মুক্তিযোদ্ধা অপেক্ষা করছিলেন একজন অফিস সহকারীর জন্য। তাঁরা বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের বোনাসের পাঁচ হাজার টাকা উত্তোলনের জন্য গিয়েছিলেন তাঁর কাছে। দেখা গেল চারজনই বেশ ক্লান্ত। জানালেন, তাঁরা একাত্তরের ডিসেম্বরে একবার বিজয় অর্জন করেছিলেন। এবার তাঁদের সামনে আরো একটি বিজয়ের ক্ষণ অপেক্ষা করছে। সেটি হচ্ছে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দলের প্রতীক নৌকা নির্বাচনে না জিতলে মুক্তিযোদ্ধাদের চলমান ভাতা-বোনাস কর্মসূচিও থাকবে কিনা তাঁদের সন্দেহ।

এসব কারণে এসব বীর মুক্তিযোদ্ধা নেমেছেন ভোটের প্রচারণায়। ঘরে ঘরে গিয়ে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন নৌকা প্রতীকের জন্য। যে যেভাবে পারছেন সেভাবেই ভোট চেয়ে চলেছেন তাঁরা।

আবদুল খালেক কয়েক কিলোমিটার দূরের কলাতলী বড়ছড়া এলাকা থেকে হেঁটেই এসেছেন এখানে। বললেন তিনি, দুটি উদ্দেশ্য নিয়েই এত দীর্ঘ পথের হাঁটা। একে ত হাঁটার কারণে শরীর ভালো থাকবে। দ্বিতীয়ত দীর্ঘদিন ধরে এ শহরে রিকশা চালানোর কারণে পরিচিতজন রয়েছেন হরেক রকমের মানুষ। এসব মানুষকে আগামী ৩০ ডিসেম্বর নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ করা। প্রতিদিনই খালেক নৌকায় ভোট প্রদানের আকুতি জানিয়ে আসছেন পরিচিত-অপরিচিত লোকজনের কাছে। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আগামী ৩০ ডিসেম্বর যদি নৌকা প্রতীকের সরকার আবার ক্ষমতায় না আসে তাহলে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের কী অবস্থা হবে সেটা আমরা ছাড়া আর কে বুঝবে?’

তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের বোনাস দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। সেই বোনাসের অংক প্রথম পর্যায়ে অনেক কম ছিল। বর্তমানে একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিবছর এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা ও বোনাস পেয়ে আসছেন। এর মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিমাসে ভাতা পেয়ে থাকেন ১০ হাজার টাকা করে। স্বাধীনতার মাস মার্চ ও বিজয়ের মাস ডিসেম্বর পেয়ে থাকেন ৫ হাজার করে দুই মাসে ১০ হাজার টাকার বোনাস। আর দুই ঈদ ও পহেলা বৈশাখ ৫ হাজার করে ১৫ হাজার টাকার বোনাস পেয়ে থাকেন।’

কক্সবাজারের ঝিলংজা বড়ুয়াপাড়ার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা কেলাসু বড়ুয়া বলেন, ‘আমি রোজ রোজ ভোটের প্রচারণার কাজ করছি। এ পর্যন্ত কম করে হলেও ৫০০ জন ভোটারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে।’

তিনি বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কারও কাছে ভোটের প্রচারণা নিয়ে যখন কথা বলতে যাই তখন অন্তত মানুষ সন্মান করে। তাঁদের বলি, সরকারের চলমান উন্নয়নের কথা, দেশের সমৃদ্ধির কথা সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত সরকারের কথা। লোকজন অন্তত এ ক্ষেত্রে না করছেন না।’

কক্সবাজারের উখিয়ার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা সুনিল বড়ুয়া বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার না থাকলে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা-বোনাস চালু থাকবে কিনা তাও এক প্রকার অনিশ্চিত। কেননা স্বাধীনতা বিরোধীরা যদি একবার সরকারের ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধূলিসাৎ করে দেবে। তাই আমরাও নৌকা প্রতীকের ভোটের প্রচারণায় নেমেছি।’

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিনের মধ্যে অন্তত ৫০/৬০ জনের কাছে নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানিয়েছি। কেউই আমার অনুরোধ ফেরাবেন বলে মনে হয়নি।’

একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, ‘ধানের শীষের বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের পুনরুত্থান। কসাই কাদের মোল্লার যেদিন ফাঁসির রায় হয়েছিল সেই রাতে আরেক নারকীয় ঘটনার অবতারণা করেছিল জামায়াত-শিবির। সেই রাতেও জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা আমার বাড়ি-ঘরে হামলে পড়েছিল। জামায়াত-শিবিরের এমন দিন যাতে আর না আসে সেটাই আমার কাম্য।’

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন জামায়াত-শিবিরকে রুখে দাঁড়াতেই আমি এবং আমার সহকর্মী মুক্তিযোদ্ধারা এখন ভোটারদের কাছে ধর্না দিচ্ছি। ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট ভিক্ষা করছি। আমরা বোঝাতে চাচ্ছি, এদেশ স্বাধীন হয়েছে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে। জামায়াত-শিবির এ দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবিরের প্রকাশ্য সহযোগিতায় পশ্চিমা হানাদার বাহিনী দীর্ঘ নয় মাস ধরে নিরস্ত্র বাঙালি নিধনে নেমেছিল।’

মুক্তিযোদ্ধা মান্নান আরো বলেন, ‘দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধ শেষে একাত্তরের এই বিজয় দিবসে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় লাভ করেছিলাম। এবার আরো একটি বিজয় দিবসের মাস ডিসেম্বর এসেছে দেশের অস্তিত্ব রক্ষার একটি নির্বাচন নিয়ে। ৩০ ডিসেম্বরের এই নির্বাচনে আমাদের আরো একবার বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। বিজয় না পেলে কেবল আমরা পিছিয়ে পড়ব না। পিছিয়ে পড়ব গোটা দেশ ও জাতি। তাই এবারের ৩০ ডিসেম্বরের বিজয় আমাদের আনতেই হবে।’

তাঁরা বলেন, আগামী ৩০ ডিসেম্বরের বিজয়ের জন্যই আমরা মুক্তিযোদ্ধারা এখন ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। ভোটারদের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, দেশের চলমান উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে সমৃদ্ধশালী করতে হবে আমাদের দেশকে। এ জন্য নৌকা প্রতীকেই ভোট দিতে হবে। নৌকা প্রতীকে ভোট দিতেই আমরা যাচ্ছি

ঘরে ঘরে।

মুক্তিযোদ্ধা মান্নান বলেন, ‘আমি জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দা। এ কারণে বার বার জামায়াত-শিবিরের হামলার শিকারও হচ্ছি। জামায়াত নেতা কসাই কাদেরের

ফাঁসির রায় ঘোষণার দিন রাতে স্থানীয় খরুলিয়া পশ্চিম মুক্তারকূল এলাকার আমার ঘরে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা হামলা চালিয়েছিল।’ তিনি জানান, ২০১৫ সালে রামু বিজয় মেলা থেকে ফিরে আসার পথে জামায়াত-শিবির আরো এক দফায় হামলা চালিয়েছিল কক্সবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ চৌধুরীর গাড়িতে। সেই গাড়িতে মান্নাও ছিলেন। জামায়াত-শিবিরের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। বারে বারে ওই এলাকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী লোকগুলোর ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। এসব কারণে আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি আগামী ৩০ ডিসেম্বর নিয়ে।

মুক্তিযোদ্ধা মান্নান বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমি কমপক্ষে তিন হাজার মানুষের কাছে নৌকা প্রতীকের জন্য ভোট ভিক্ষা চেয়েছি। ভোট ভিক্ষা চেয়েছি বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগের জন্য। আমরা ভোট ভিক্ষা করছি জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার নৌকা প্রতীকের জন্য।’

মুক্তিযোদ্ধা মান্নান আশাবাদী আগামী ৩০ ডিসেম্বর আরো একটি ডিসেম্বরের বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা