kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

পারকি : চর থেকে সম্ভাবনাময় সৈকত

‘বারুনীর স্নান ঘাট’ থেকে এক সময় নাম রটে যায় ‘পারকির চর’। এখন মানুষের ভিড়ে মুখর ওই জায়গার নাম ‘পারকি বিচ’। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের গাছবাড়িয়া কলেজ গেট থেকে সড়কপথে বরকল ও আনোয়ারা সদর হয়ে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছানো যায় পারকি সমুদ্রসৈকতে। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরের কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ থেকে মাত্র ৩০ টাকা বাসভাড়ায় ৪০ মিনিটের দূরত্বে পারকির অবস্থান। সম্প্রতি সৈকতটি ঘুরে এসেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক : মনু ইসলাম, বান্দরবান

৩১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পারকি : চর থেকে সম্ভাবনাময় সৈকত

প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সৈকত পারকি। পারকির গা ঘেঁষে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। ওপারে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। কর্ণফুলী নদীর মোহনা ভাগ করে রেখেছে দুই সৈকতকে।

কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে-এর একপ্রান্ত কর্ণফুলীর ওপারে চট্টগ্রাম শহরে। পারকি বিচ ঘেঁষেই বেরিয়ে আসবে অপরপ্রান্ত। এমন একটি সৈকত পর্যটকদের যে কাছে টানবেই।

তাই বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই সমুদ্রসৈকতে পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নেওয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা।

চট্টগ্রাম বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির অন্যতম সদস্য কাইয়ুম শাহ জানান, পারকি বিচের জন্যে ৬২৭ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) বৈঠকে চট্টগ্রাম জেলার বিচ উন্নয়নে ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ কোটি টাকা দেওয়া হবে পারকি বিচ উন্নয়নে। বরাদ্দকৃত অর্থে পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় পারকি সমুদ্রসৈকতকে প্রাথমিকভাবে সাজিয়ে তোলা সম্ভব হবে।

কাইয়ুম শাহ জানান, পারকি বিচে মোটেল স্থাপনের জন্যে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। সম্প্রতি তারা ১২ দশমিক ৩৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়ের পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রস্তাবিত মোটেল এলাকায় কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে। এগুলো সংগ্রহ করতে ৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

পারকির পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে প্রথম অবকাঠামোগত কাজ শুরু করেন কাইয়ুম শাহ। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও তিনি। বেশ কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে পারকির চর ঘেঁষা জমিতে ২০১২ সালে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘লুসাই রিসোর্ট অ্যান্ড পিকনিক স্পট।’ কাইয়ুম শাহ জানান, প্রথমদিকে লাভজনক না হলেও এখন এর আয় দিয়েই রিসোর্টের পরিচালন ব্যয় ও কর্মচারী বেতন মেটানো যাচ্ছে।

‘দিনের পর দিন সম্ভাবনার হাতছানি বাড়ছে।’-বললেন লুসাই রিসোর্ট ও পিকনিক স্পটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইয়ুম শাহ।

পারকি চরের বিচ হয়ে ওঠার গল্প শোনান স্থানীয় বাসিন্দা অপূর্ব দেব।

‘১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের দুই বছর পর সরকারি উদ্যোগে ঝাউবন গড়ে তোলার পর থেকেই কেমন করে যে পারকির চরের নামটা দ্রুত বদলে গিয়ে সি-বিচ হয়ে গেল, টেরই পাই নি।’

অপূর্ব জানান, ছোটকালে এই ঘাটে বান্নির (বারুনী) স্নান করতে যেতাম। তখন ওই মৌসুম ছাড়া কেউ যেত না। এখন এখানে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট, ভ্রাম্যমাণ শপ, পার্কিং প্লেস এবং শত শত মানুষের কোলাহলে আমাদের প্রিয় পারকির চর মুখরিত।

অপূর্ব দেব ও কাইয়ুম শাহর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বালুচরের পাশের গ্রামের নাম ‘গোপাদিয়া।’ বেশির ভাগ মানুষ এই গ্রামকে চিনতেন ‘পারকি’ নামে। বারুনী স্নানের সময় পারকি গ্রামের লোকজনরাই এখানে অস্থায়ী দোকান বসাতেন। টানা চর জেগে ওঠায় ব্যবসা আরো কিছুটা বিস্তৃত হয়। আর এভাবেই পারকি গ্রামের মানুষের মুখে মুখেই চরের নাম হয়ে গেল ‘পারকি।’

অপূর্ব দেব জানান, নিরাপত্তাহীনতার কারণে ২০১৫ সালেও এই বিচে বিকেলের পর মানুষ দেখা যেত না। নিজের স্ত্রী, বোন, কন্যা নিয়ে বেড়াতে এসে মাস্তানদের হাতে নাজেহাল হওয়ার ঘটনাও কম নয়। কিন্তু এখন এটি প্রায় নিরাপদ।

কাইয়ুম শাহ বলেন, ‘এই বিচে আনোয়ারা থানার পুলিশি টহল আছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুব নগণ্য। তাই কক্সবাজারের মতো এখানেও ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন জরুরি।’

কাইয়ুম শাহ জানান, চট্টগ্রাম বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের সাথে এ বিষয়ে তাঁদের কথা হয়েছে। শিগগিরই সীমিত পরিসরে ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি ফাঁড়ি স্থাপন হওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।

পারকি বিচ দেখতে এসেছেন একটি রপ্তানিমুখী প্রাইভেট গার্মেন্টসের ম্যানেজার মফিজুল ইসলাম মামুন।

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক থেকে পারকি বিচের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু বিদ্যমান সড়কগুলো পর্যটনের দিক থেকে সম্পূর্ণ অনুপযোগী। সরু ও আঁকা-বাঁকা সড়ক, এখানে ওখানে বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচলে বাধার সৃষ্টি করছে। এর ফলে কুড়ি মিনিটের পথ আসতে এক ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে।’

তিনি জানান, এই বিচে পাবলিক টয়লেট নেই। ফ্রেশ হওয়ার সুযোগ না থাকায় নারী-শিশুদের ভীষণ বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা বাসুদেব দাশ। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। এই প্রথমবার পারকি বিচে এসে মোহিত হয়ে গেছেন তিনি। অনেক সমস্যা সত্ত্বেও পারকির পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী তিনি।

বাসুদেব বলেন, ‘কক্সবাজার সৈকতও একদিনে গড়ে ওঠেনি। একটু পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পারকি হয়ে ওঠবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট।’

স্থানীয়রা জানান, পারকির এক প্রান্তে কর্ণফুলী নদীর মোহনা। অন্য প্রান্ত ঘেঁষে সাগরে মিশে গেছে শঙ্খ নদী। দুই মোহনার মাঝখানের ‘পারকি’ সবার কাছেই যে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠবে-এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

আটকে পড়া ‘ক্রিস্টাল বোল্ড’ যেন বাড়তি আকর্ষণ

গত শুক্রবার পারকি সৈকতে গিয়ে দেখা গেল, এর বড় অংশজুড়ে বালুতে আটকে আছে বিশাল এক বাণিজ্য জাহাজ। ‘ক্রিস্টাল বোল্ড’ নামে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি ২০১৬ সালের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’র তাণ্ডবে নোঙর ছিড়ে চলে আসে পারকি সৈকতে। কর্ণফুলী মোহনা থেকে প্রায় ৩০০ ফুট উজানের ডাঙায় ওঠে আসা জাহাজটিকে আর নামানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না মালিক পক্ষ।

ক্রিস্টাল বোল্ড গত প্রায় দুই বছর ধরে পারকি সৈকত দখল করে আছে। তবে এটি যেন পর্যটনের পথে কোনো বাধা নয়। বরং বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে ‘ক্রিস্টাল বোল্ড’ পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে। পারকিতে পা দিয়েই শত শত শিশু, নারী-পুরুষ সবাই ছুটছে ‘ক্রিস্টাল বোল্ড’ এর দিকে।

জাহাজ জড়িয়ে ছবি তোলা, এর বিশাল ইস্পাত নির্মিত দাঁড়, পেতলের ঢাউস প্রফেলারকে পেছনে রেখে প্রতিদিন কতবার যে ক্যামেরায় ক্লিক হচ্ছে, তা গুনে রাখার সাধ্য কার! এত বড় একটি জলের জাহাজ চোখের এত কাছাকাছি দেখে নেওয়ার অভিজ্ঞতা কজনেরই বা আছে। চরে আটকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ক্রিস্টাল বোল্ড’ যেন পারকি সৈকতের বাড়তি আকর্ষণ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা