kalerkantho

পর্যটক গাইড

পাহাড়িদের সম্ভাবনাময় বিকল্প পেশা

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পাহাড়িদের সম্ভাবনাময় বিকল্প পেশা

‘হ্যাল্লো স্যার, প্লিজ শুনুন। এখন আমরা রাতের খাবার খাব।’-বুঝা গেল, গেস্ট এবং গাইডের মধ্যে কথোপকথন।

শুদ্ধ উচ্চারণে আগন্তুকদের সাথে এমনভাবে কথা বলতে শুনে অবাক হয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে চায়ের দোকানে কথা হয় রাতে শোনা অমৃতকণ্ঠী গাইডের সাথে। “সফুল বড়ুয়া” বলেই হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। তবু সুঠাম দেহ। নিরলস। নিজে তো স্বাচ্ছন্দ্যে পাহাড় ডিঙোতে পারেনই। আরো ২/১ জনকে নিয়েও গল্প করতে করতে উঠে যেতে পারেন পাহাড় চূড়োয়। পেশায় তিনি ট্যুর গাইড। এক সময় ছোটখাটো কাজ করতেন। এখন পুরোদস্তুর ট্যুর গাইড। দৈনিক ৬০০ টাকার বিনিময়ে পর্যটকদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান বগালেক, কেওক্রাডং, তাজিন ডং। রেমাক্রি, তিন্দু, বড় মোদক, নাফা খুম।

বগালেকে দেখা তাঁর সাথে। একদল ট্যুরিস্ট নিয়ে এসেছেন। বগালেক পাড়ায় একরাত থেকে পরদিন চলে যাবেন কেওক্রাডং।

সফুল বড়ুয়া গাইডদের মধ্যে সিনিয়র। গত ২৫ বছর ধরে এই কাজটিই করছেন। প্রথমদিকে অন্য পেশার পাশাপাশি খণ্ডকালীন। এ ধরনের গাইডদের খাওয়া-দাওয়া, আবাসন-পর্যটক দলই বহন করে। কাজে সন্তুষ্ট হলে চুক্তিমূল্যের বাইরে বকশিস হিসেবে বাড়তি টাকাও দেন কেউ কেউ।

সফুল বড়ুয়ার মতো আরো কয়েজন গাইডের সাথে দেখা হল পথে পথে। তারাও পর্যটকদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অন্য কোন ডেস্টিনেশনে।

বান্দরবানের রুমা এবং থানচিতে এমন গাইড প্রায়ই দেখা যায়। এ দুটি উপজেলায় উঠতি যুবকরা ক্যারিয়ার হিসেবে গাইড পেশাকে বেছে নিচ্ছেন।

‘অ্যাডভেঞ্চার আছে, ঘুরে দেখার আনন্দ আছে, পরিচিত হবার সুযোগও আছে। তাই অনেকেই ঝুঁকে পড়েছেন গাইড পেশায়। শুধুমাত্র রুমা উপজেলায় এমন গাইড আছেন ৬৪ জন।’-সুফল বড়ুয়া তথ্য দেন।

তাঁর সাথে কথা বলে জানা গেল, গাইড পেশার বাইরে অনেক বেকার যুবকই এখন জড়িয়ে পড়েছেন মোটর সাইকেল ড্রাইভিং পেশায়। বান্দরবান-রুমা, মুনলাইপাড়া-রুমা, রুমা-বগালেক, বান্দরবান-থানচি, বলিপাড়া-থানচি, থানচি-আলীকদম এসব রুটে মোটরসাইকেলে চড়িয়ে তারা নিয়ে যান পর্যটকদের। সবগুলো রুটের ভাড়া নির্ধারিত। নিজে ছাড়া আরো দু’জনকে চড়াতে পারেন। ভাড়া জনপ্রতি হিসেবে। দল বেঁধে যেসব পর্যটক আসেন না, বাহন হিসেবে মোটরসাইকেল তাদের কাছে বেশ পছন্দ। কম খরচে স্পটে যাওয়া-আসা করা যায়।

মং ওয়াই জনি এমনই একজন চালক। কুড়ি পেরোনো এই তরুণ ড্রাইভিং-এ বেশ পাকা। তার মোটরসাইকেলে চড়েই রুমা থেকে মুনলাইপাড়ায় যাওয়া-আসা। নির্মাণাধীন মাটির রাস্তায় বেশ সতর্কতার সাথে ড্রাইভ করে মুনলাইপাড়া থেকে আমাদের ঘুরিয়ে আনলেন নিরাপদে।

রুমা উপজেলায় এমন মোটরসাইকেল চালকের সংখ্যা ৫৩। তারা একটি সমিতিও গড়ে তোলেছেন। এই সমিতির তত্ত্বাবধানে নিজেদের মধ্যে কোনো বাক-বিতণ্ডা ছাড়াই পালাক্রমে তারা যাত্রী বহন করেন।

রুমা উপজেলায় বিকশমান পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি ট্যুর গাইড এবং মোটরসাইকেল ড্রাইভ পেশাও বিকশিত হয়েছে।

মোটরসাইকেল ড্রাইভার জনি জানান, “রুমা থেকে বগালেক ১৯ কিলোমিটার দূরে। চাঁদের গাড়ি (খোলা জিপ) রিজার্ভ করে যেতে অনেক টাকা লাগে। আমরা যাওয়া-আসায় দেড় হাজার টাকা নিয়ে থাকি। তেল খরচ যায় শ’ খানেক। বাকিটা আমাদের পারিশ্রমিক।”

তিনি জানান, প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন চালক এমন ট্রিপ পেয়ে থাকেন। অন্যরা কেউ মুনলাইপাড়া বা মুন্নান পাড়াসহ কাছাকাছি কোনো দূরত্বে যায়। জনি জানায়, “ড্রাইভিং করে কোনোভাবে সংসারের খরচ জুগিয়ে ফেলি।”

এমন অবস্থা দশ বছর আগেও রুমায় ছিল না। বিরূপ প্রকৃতি আর দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে করেই জীবন এগিয়েছেন এখানকার অধিবাসীরা।

শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য বিহীন এসব প্রান্তিক অঞ্চলে জীবিকার অন্য কোনো উপায় না থাকায় বাসিন্দাদের জন্যে জুম চাষই ছিল একমাত্র পেশা।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, অনাবৃষ্টি-অতিবৃষ্টি, টানা খরা, নদী ভাঙন, পাহাড়ি ঝর্নাগুলোর শুকিয়ে যাওয়া, একই পাহাড়ে বছরের পর বছর ক্রমাগত ফসল ফলানোর কারণে গত এক দশকে জুমচাষে ফলন এক তৃতীয়াংশে নেমে যায়। ফলে জুমচাষ কেন্দ্রিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। বিপন্ন হয় জীবিকাও।

অসমর্থিত তথ্যমতে, চাহিদা অনুযায়ী ফসল না পেয়ে অনেকেই শত বছরের পৈতৃক সাকিন ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন ভিন দেশে, ভিন অঞ্চলে। ভূমিচ্যুত ও পেশাচ্যুত হয়েছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীভুক্ত অসংখ্য মানুষ। পরিবর্তিত জলবায়ূর প্রভাবে জীবনের এমন দুর্বিষহ সময়ে পর্যটনের সম্ভাবনা তাদের জীবনকে পাল্টে দিতে থাকে। পাল্টে যায় এককালের অবহেলিত রুমা উপজেলার আর্থ-সামাজিক চিত্রও।

অনেকেই মনে করেন, অশান্ত পরিস্থিতির কারণে বৈচিত্র্যময় জীবনধারা, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা এই অঞ্চল ছিল উন্নয়ন থেকে অনেক দূরে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোতে থাকে স্থানীয় পর্যটন। পর্যটকদের পদচারণা এবং তাদের চাহিদার সমান্তরালে কিছু কিছু রেস্টুরেন্টে নতুনত্ব আসে। গড়ে ওঠে হোম স্টে ট্যুরিজম বা ঘরোয়া পর্যটন ধারণাও।

স্থানীয়দের এই নতুন চিন্তা-চেতনার পাশে এসে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা  ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমড)।’

হিমালয় বিধৌত হিন্দুকুশ অঞ্চলের পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী মানুষকে পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাবজনিত ক্ষতির মোকাবিলা করে এর সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সংস্থাটি কাজ করে। নেপাল, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, চীন, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশে সংস্থাটি সবচেয়ে সক্রিয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে ইসিমড-এর ফোকাল মিনিস্ট্রি।

বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটাতে ইসিমড এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘হিমালিকা পাইলট প্রকল্প।’ এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নেয়া হয় বছর তিনেক আগে।

পরিবর্তিত জলবায়ূর সম্ভাব্য ক্ষতি এড়িয়ে পরিস্থিতির সাথে বাসিন্দাদের খাপ খাওয়াতে ‘হোম স্টে ট্যুরিজম’ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, পর্যটন খাতে স্থানীয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রদান, কমলা, কফিসহ স্থানীয় ফলচাষ, বাজারজাতকরণ এবং ট্যুর গাইডদের প্রশিক্ষণ দানের মধ্য দিয়ে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে কাজ শুরু করে সংস্থাটি।

এসব উদ্যোগের ফলে পাহাড় ঢালে বা নদী তীরের বাড়ির পাশের এক চিলতে উঠোনে কিংবা ঘরের একটি অংশকে অথবা কাঠের তৈরি ঘরকে উপরের দিকে একটু উচ্চতা বাড়িয়ে সেখানে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করে বিকল্প জীবিকার পরিবেশ গড়ে তুলে স্থানীয়রাই।

এর পাশাপাশি পর্যটক কেন্দ্রিক বিকল্প পেশার প্রতি তরুণদের আগ্রহী করতে বেড়াতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের  জন্যে সেবা নিশ্চিত করতে ‘হিমালিকা’ প্রকল্পের আওতায় ট্যুর গাইডদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ট্যুর গাইড সফুল বড়ুয়া জানান, প্রথম দফায় ২০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।  ১০ দিনের এই প্রশিক্ষণ কোর্সে তিনি নিজেও অংশ নিয়েছেন।

‘স্যাররা আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়ে দিয়েছেন। এখন আমরা ইংরেজি ভাষায় স্বাগতম ও বিদায় জানাতে পারি।’ উত্ফুল্ল সফুল বড়ুয়া প্রশিক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতার কথা শোনান।

বগালেক পাড়ার কার্বারি রিয়াল থম এর দোকানে গিয়ে আরো চমক। তার স্ত্রী চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এসে এমন ভাবে টেবিলে রাখলেন, মনে হলো কোনো ফাইভ স্টার হোটেলের চৌকস ওয়েটার তিনি। গরম চায়ের কাপে ধোঁয়ার ভাপের সাথে আসছে কফির ঘ্রাণও। অপরিচিত এক পর্যটকের সামনে কফি মিশ্রিত চায়ের কাপ রাখতে রাখতে তিনি বললেন, ‘কফি-চা। খেয়ে দেখুন। ভাল লাগবে।’

বগালেক পাড়ার পিছিয়ে পড়াব বম জনগোষ্ঠীর সামান্য এক নারীর মধ্যে কেন এই পরিবর্তন?

কারণটা বুঝিয়ে দিলেন স্বামী রিয়াল থম।

‘গত বছর হিমালিকা আমাকে নেপালে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে আমি এসব দেখে এসেছি। বাড়ির গিন্নী আমার কাছ থেকে গেস্টদের ওয়েলকাম ‘টি’ দিতে শিখে নিয়েছেন।’

বদলে যেতে শুরু করেছে রুমার জীবন ধারা। বগালেক, কেক্রাডং, তাজিন ডং, নাফা খুম ছাড়াও দিনে দিনে আরো অসংখ্য পর্যটন স্পট যেমন আবিষ্কৃত হচ্ছে, রুমাবাসীও বদলে যাচ্ছেন ক্রমশ। রুমা বাজারে একসময় ছিল খুপড়ির মতো ছোট ছোট দোকান-পাট। এখন অবয়ব পরিবর্তনের পাশাপাশি তাতে লাগছে নান্দনিকতার ছোঁয়াও। সাধারণ মানের রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি নান্দনিক কিছু রেস্টুরেন্টও গড়ে ওঠেছে। পরিবারের সদস্যরাই চালাচ্ছেন এসব ব্যবসা। গরম গরম খাবার, হরেক রকমের তরকারি-মাছ-মাংস-ভর্তা পরিবেশনেও এসেছে নতুন মাত্রা। রুমার সাংবাদিক শৈ হ্লা চিং মারমা বললেন, বিকশমান এই এগিয়ে চলা আরো বদলে দেবে রুমাকে। আরো কিছুটা সুযোগ পেলে শিলং-দার্জিলিং কিংবা নেপাল-ভুটানের মতো ছোট্ট এই উপজেলা বাংলাদেশের পর্যটনের ভাবনাকেও পাল্টে দিতে পারে।

মন্তব্য