kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

বদলে যাচ্ছে ভাসানচর

১৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বদলে যাচ্ছে ভাসানচর

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদেরকে নিজ দেশে না ফেরা পর্যন্ত নোয়াখালীর হাতিয়ার মেঘনা নদী তীরবর্তী ভাসানচরে আশ্রয় দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। চরটি জোয়ারে তিন থেকে চার ফুট পানিতে তলিয়ে গেলেও ভাটার সময় ভেসে ওঠে। তবে সম্প্রতি জোয়ার-ভাটা থেকে রক্ষার জন্য চরের বিভিন্ন স্থানে বালু ফেলে উঁচু করা হয়েছে। নৌ-যোগাযোগ সহজ করতে পল্টুন স্থাপন করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে হেলিপ্যাড। অভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে সড়ক। নিরাপত্তায় রয়েছে নৌবাহিনী। সম্প্রতি ভাসানচর ঘুরে এসে বিস্তারিত জানাচ্ছেন : সামসুল হাসান মীরন, নোয়াখালী

 

নোয়াখালীর মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা ভাসানচর নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মানুষ বসবাসের উপযোগী করার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নৌবাহিনী প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজিসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা চরটি একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন।

চরটির নাম নিয়ে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ঠেঙ্গারচর’ বা ‘জালিয়ারচর’ এর নাম বদলে ‘ভাসানচর’ হিসেবে ঘোষণা দেন।

নোয়াখালী জেলার বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ভাসানচরের মোট আয়তন ১৬ হাজার একর। এর মধ্যে জালিয়ারচরের আয়তন ছয় হাজার একর ও ঠেঙ্গারচরের আয়তন ১০ হাজার একর। চর দুটির অবস্থান পাশাপাশি হওয়ায় নাম নিয়ে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, জালিয়ারচর ঠেঙ্গারচর নয়। ঠেঙ্গারচরও জালিয়ারচর নয়। দুটি ভিন্ন ভিন্ন চর। যার নতুন নামকরণ হয়েছে ‘ভাসানচর’।

তবে নোয়াখালী-৬ হাতিয়া আসনের সংসদ সদস্য বেগম আয়েশা ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘‘স্থানীয়রা চরের নাম নিয়ে দুই অংশে বিভক্ত ছিল। অবশ্য এক পর্যায়ে সবাই চর দুটির নাম ‘চরপ্রিয়া’ রাখার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি চরটির নাম ‘ভাসানচর’ রেখেছেন। তাই নামটি নিয়ে এখন এখানকার বাসিন্দাদের মাঝে আর কোনো দ্বিমত নেই।’’

এ প্রসঙ্গে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, হাতিয়ার আশপাশের চরগুলোর প্রতিটিরই একাধিক নাম রয়েছে। ঠেঙ্গারচরেরও একাধিক নাম রয়েছে। কেউ এটাকে বলে ঠেঙ্গারচর, কেউ বলে জালিয়ারচর। নাম যা-ই হোক রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের জন্য চরটিকে নির্বাচন করে অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। ভাসানচরের দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৪.৫ কিলোমিটার। হাতিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এটি। চরটির নিচু অংশ ভরা জোয়ারের সময় পানিতে তলিয়ে যায়। মাছধরার নৌকায় করে হাতিয়া থেকে ঠেঙ্গারচরে পৌঁছতে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। জায়গাটি ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ। যাতায়াত ব্যবস্থাও নাজুক। তবে চরটির সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ সহজ করতে এরই মধ্যে পল্টুন স্থাপন করা হয়েছে। হেলিকপ্টার অবতরণে হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। নিরাপত্তায় রয়েছেন নৌবাহিনীর সদস্যরা। ভাসানচরকে জোয়ার-ভাটার হাত থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন স্থানে বালু ফেলে উঁচু করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে সড়ক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নোয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার ও উপকূলীয় উপজেলা সুবর্ণচর উপজেলা হতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার পশ্চিম প্রান্ত থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং হাতিয়া উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার পূর্বদিকে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় প্রায় ২০ বছর আগে জেগে ওঠে বিচ্ছিন্ন ও জনমানবশূন্য ভাসানচর। সেখানে কোনো মানুষের বসতি নেই। একসময় এটি বনদস্যু ও জলদস্যুদের অভয়ারণ্য ছিল। বাংলাদেশ নৌবাহিনী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু করার পর থেকে বনদস্যু ও জলদস্যুরা আস্তে আস্তে ওই চর থেকে সরে যায়।

ঠেঙ্গারচর এলাকায় মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও হাতিয়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, মূল হাতিয়ার উত্তর-পূর্ব দিকে ঠেঙ্গারচর। যা উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি। এখনো জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় ঠেঙ্গারচরের কিছু অংশ। গত ২০ বছর ধরে বনায়ন হচ্ছে। এখনই ঠেঙ্গারচর বসবাসের উপযোগী নয়। সেখানে বেড়িবাঁধ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে বসবাস করা যেতে পারে।

তাঁদের মতে, প্রশাসন বা সরকার যেটাকে ঠেঙ্গারচর বলছে তা আসলে ঠেঙ্গারচর নয়, এটি জালিয়ারচর।

হাতিয়াসহ উপকূলের অধিবাসীদের মতে, এ চরটি ভরা কাটালের জোয়ারের সময় পানিতে তলিয়ে যায়। তখন এর সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে। মাছধরা নৌকায় করে হাতিয়া থেকে ঠেঙ্গারচরে যাতায়াত করতে হয়। এটি ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ এলাকা। নিচু হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জোয়ারে প্লাবিত হয়। যাতায়াত ব্যবস্থাও নাজুক। জনশূন্য এলাকাটি কর্দমাক্ত ও গহিন বন। এ চর কোনোভাবেই বাসযোগ্য নয়, প্রতিমুহূর্তে রয়েছে মৃত্যুঝুঁকি। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন হবে অমানবিক। সরকার যদি এ চরকে বসবাসের উপযুক্ত করতে চায়, তাহলে অন্তত ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে। ঝড় জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পেতে সাইক্লোন সেল্টার, রাস্তাঘাট এবং জমিকে চাষযোগ্য করতে অনেক সময় প্রয়োজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চরের গবাদিপশুর মালিক ও রাখালরা (স্থানীয় নাম বাতাইন্যা) জানান, যখন নদী শান্ত থাকে, তখন জলদস্যুরা জেলেদের অপহরণের খোঁজে এখানে আস্তানা পাতে। জেলেদের কাছ থেকে আদায় করে মুক্তিপণ। চরটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ এলাকা ঠেঙ্গারচর। তবে নৌবাহিনী এখানে আসার পর থেকে দস্যুদের তেমন একটা দেখা না গেলেও জেলেরা শঙ্কিত। এছাড়া সাধারণ মানুষ তথা সংবাদকর্মীরা চরে এখনো যাতায়াত করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের এ চরে আনার খবরে শঙ্কিত হাতিয়াসহ উপকূলবাসী। রোহিঙ্গাদের সেখানে আশ্রয় দিলে মাদকসহ নানা ধরনের অসামাজিক কাজ এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

তবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মনির-উজ-জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের এখানে পুনর্বাসন করা হলে পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল বাড়বে। নিরাপদ হবে চর ও নদী।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ভাসানচর কতটা বাসযোগ্য অথবা জলবায়ুর পরিবর্তনে এ চরের গতিপথ কতটা পরিবর্তন হবে-এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এসব কিছুই আছে প্রাথমিক পর্যায়ে, পরিকল্পনা ও গবেষণার পর্যায়ে।’

ভাসানচর রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ‘ভাসানচর হবে একটি আধুনিক শরণার্থী শিবির। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিনোদনকেন্দ্র, খেলার মাঠসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। কয়েকটি ধাপে রোহিঙ্গাদের এখানে আনা হবে। প্রথম ধাপে ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করা হবে। খুব দ্রুত সময়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে চায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী।’

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মাহবুবুল আলম তালুকদার বলেন, ‘এখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা অবশ্যই বসবাসের উপযোগী করার পরই করা হবে। বিষয়টি নৌবাহিনী দেখছে। প্রথমে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর পরই রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হবে।’

নোয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই চরে আমরা ২০০১ সাল থেকে বনায়ন করছি। চরের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা নদীতে ভাঙছে। আর পশ্চিমাংশে চর জাগছে।’ তাঁর মতে, একটি চর পরিপূর্ণ বসবাসযোগ্য হতে ৩০/৪০ বছর লাগে। তবে সরকার চাইলে এটি দ্রুততম সময়ে বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা