kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

পাহাড়ে ‘সংস্কৃতির বাতিঘর’

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

২৬ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাহাড়ে ‘সংস্কৃতির বাতিঘর’

জুম ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশন কার্যালয়ে গান শেখে পাহাড়ি শিশুরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

... তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে জ্ঞানকীর্তি চাকমা ‘সাত গাং সাজুবী বাক্কো এজের আহ পরি’ অর্থাৎ ‘সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাঘ আসছে হা করে’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন। এটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন তোলে। প্রামাণ্যচিত্রে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া, মৃত্তিকা গবেষক, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং প্রান্তিক কৃষকের মতামত গুরুত্ব পায় ...

 

শিশুকালেই বাবা হারিয়েছেন জ্ঞানকীর্তি চাকমা। মা আর ছোট ভাই-বোনের চিন্তায় মনটা ভারী থাকত সারাক্ষণ। চিকিৎসক হয়ে মানবসেবার ইচ্ছা থাকলেও নানা বাস্তবতা আর আর্থিক দৈন্যতায় তা হয়ে ওঠেনি। কেবল মানসিক শক্তিকে পুঁজি করে নতুন স্বপ্নে এগিয়ে চলেন তিনি। এখন তাঁর একটাই লক্ষ্য, ‘সংস্কৃতিনির্ভর পরিচ্ছন্ন সমাজ বিনির্মাণ’। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ আগ্রহী হন জ্ঞান কীর্তি।

হাইস্কুলে পড়ার সময়ই লিখে ফেলেন আস্ত নাটক। এমনকি ওই সময়ে মঞ্চ নাটকেও অভিনয় করেন। শুধু তাই নয়, লোভের বশে তামাক চাষসহ পরিবেশবিরোধী তত্পরতায় যেন সাধারণ পাহাড়িরা ঝুঁকে না পড়েন, সেটিও ভীষণ ভাবাত তাঁকে। শত বছরের লালিত জীবনধারা ও বৈচিত্র্যময় কৃষ্টি-সংস্কৃতি অটুট রাখতে করণীয় নিয়েও মগ্ন থাকতেন। নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা ও প্রথাগত পুঁথি যেন হারিয়ে না যায়-এসব নিয়ে নীরবে অশ্রুপাত করতেন। তাই তো ঝাঁপিয়ে পড়লেন সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধে।

সংগ্রামী এই মানুষটি থাকেন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার অজ পাড়াগাঁ ‘উদাল বাগান’ এলাকায়। সেখানেই গড়ে তুলেছেন ‘জুম্ম ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশন’ (জুফা) নামের সংগঠন। চাকমা জাতি-গোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চর্চা, প্রচার, প্রসার এবং লালনে সংগঠনটি এখন পথিকৃৎ। স্ত্রী মধুমিতা মারমা, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে খুবই সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত জ্ঞানকীর্তি চাকমা। গান আর অভিনয় শিখিয়ে পাওয়া সামান্য অর্থেই চলে পরিবার। যেভাবে শুরু সংগ্রামী জীবন : পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির শিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত ভালোই কাটছিল জ্ঞানকীর্তির পরিবারের। দীঘিনালার উদাল বাগানের আরো শত পরিবারের সাথে তাঁর বাবা-মা ছোট ভাই-বোনদের সাথে নিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী ‘মনোঘরে’ পড়াশোনার সুবাদে ভীন দেশে যেতে হয়নি শিশুছাত্র জ্ঞানকীর্তি চাকমাকে। ১৯৮৯ সালে হঠাৎ দুঃসংবাদ আসে ভারতের পঞ্চরাম শিবিরে অসুস্থ বাবা সুপেন্দ্র চাকমা মারা গেছেন। তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র তিনি। চিকিৎসার অভাবে বাবার মৃত্যুর পর স্বপ্ন জাগে চিকিৎসক হতে। অভাব এতটাই ছিল যে, স্বপ্ন আর সত্য হয়নি। অন্যদিকে পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি সমাজ, সংস্কৃতি ও স্বকীয় জীবনধারার প্রতি বিশেষ আগ্রহী করে তোলে তাঁকে। বিলুপ্ত প্রায় সংস্কৃতি ধরে রাখার উপলব্ধি থেকে মনের অজান্তেই লেখালেখি, অভিনয় ও গানসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নাটকের চারটি স্ক্রিপ্ট লেখা হয়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালে ‘কবালে বাজ পজ্জে’ (কপালে বজ্রাঘাত) নাটকটি লিখে এবং মঞ্চনাটক করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন রাঙামাটিতে। ‘দজ বারা এগার’ (অসামাজিক) নাটকটি মনোঘর ছাড়াও সেই সময়ে রাঙামাটি টাউনহলে মঞ্চস্থ হয়। নিজের লেখা নাটকে নিজেই অভিনয় করেন। ওই সময়ে দেশের বিশিষ্ট নাট্যকার অভিনেতা মামুনুর রশীদের সান্নিধ্যে নাটক লেখা ও অভিনয় সম্পর্কে টিপস নেওয়ার সৌভাগ্য হয় তাঁর। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পদচারণার পেছনে মনোঘরের শিক্ষক মৃত্তিকা চাকমার অনুপ্রেরণা আর রাঙামাটির ‘জুম ইসথেটিকস্ কাউন্সিল-জাক’ অবদানও কম ছিল না। পাহাড়ে শিক্ষা সংস্কৃতির বাতিঘর নামে পরিচিত ‘মনোঘর’ -এ থেকে এসএসসি পাস করেন জ্ঞানকীর্তি চাকমা। চরম অভাব আর সংকটের মধ্যে মা ও ভাইবোনদের পাশে দাঁড়াতেই রাঙামাটি থেকে দীঘিনালায় ফিরেন ১৯৯৮ সালে।

সাংস্কৃতিক যুদ্ধ : অভাব-অনটন আর হতাশার পরও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে অনড় তিনি। রাঙামাটি থেকে ফিরেই ‘জুম্ম সাহিত্য সংসদ’ ও ‘সজপদর’ (বেইন তৈরির সরঞ্জাম) নামের দুটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুললেও আঞ্চলিক নানা রাজনৈতিক বাধায় বেশি দূর যাওয়া হয়নি। তবু নাটক, গানসহ নানা সাংস্কৃতিক চর্চা এতটুকুন কমেনি। একটা সময় ঢাকায় ‘প্রাচ্যনাট স্কুল অ্যাকটিং অ্যান্ড ডিজাইন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে নাটক আর অভিনয়ের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ হয়। ওই প্রশিক্ষণ শেষ করে দীঘিনালার উদাল বাগান হাইস্কুলের একটি কক্ষে ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি ‘জুম্ম ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশন-জুফা’ নামের সংগঠনটির অস্থায়ী কার্যালয় গড়ে তুলেন তিনি।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জ্ঞানকীর্তি চাকমা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কেবল চাকমা সংস্কৃতি নিয়েই জুফা কাজ করছে। ভবিষ্যতে পাহাড়ের অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতির ওপর কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর হতে জুফার মাধ্যমে দুই শতাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী, সংগঠক তৈরি হয়েছে। গান, নাচ, নাটক, বাদ্যযন্ত্র চর্চা; সবই শেখানো হয় এখানে।’

হারমোনিয়াম, কি বোর্ড চালনা করে নিজেই গান শেখান জ্ঞানকীর্তি। তবলায় থাকেন সংগঠনের সেক্রেটারি নেলসন লাভা চাকমা (এন লাভা)। দীঘিনালা কলেজের ছাত্রী ত্রিপনা চাকমা বললেন, ‘এই অজ পাড়াগাঁয়ে গান শেখার সুযোগ করে দেওয়ায় জুফার কাছে কৃতজ্ঞ।’

জ্ঞানকীর্তির কাছে হাতেকলমে অভিনয় শেখা উদাল বাগান হাইস্কুলের সাবেক ছাত্র রাজিব চাকমা বলেন, ‘গত ৩ বছর ধরে অভিনয় শিখছি। জোধা (একতা) ও সোজাগ (সতর্ক) নামে দুটি নাটকে অভিনয় করেছি। ঢাকা ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে মঞ্চনাটক করি। আরো এগিয়ে যেতে চাই।’

অনেকটা নাটকের মতো সংগ্রামী জীবনের চরিত্র জ্ঞানকীর্তি চাকমা ছাত্র থাকতেই লিখেন চারটি নাটক। দীঘিনালায় এসে লিখেন আরো আটটি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘চগে পর’ (চোখের আলো), ‘বাংগিন পাড়ের সুগর শ্রমণ’ (অব্যক্ত বেদনা), হেডম্যান বাবুর তলাকানা ও ডিএসএলআর ক্যামেরা। সর্বশেষ ‘লুরো চুগোর ছালত উদানা’ অর্থাৎ বাংলায় যার অর্থ ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ নাটকটি আলোড়ন তোলে। চাকমাদের সমসাময়িক জীবনধারা, কৃষ্টি-সংস্কৃতিভিত্তিক কাহিনিনির্ভর বেশ কয়েকটি শর্টফিল্ম, ৩টি মিউজিক ভিডিও সিডি আকারে প্রকাশ পেয়েছে। তামাকের আগ্রাসন নিয়ে সচেতনতামূলক ডকুমেন্টারি (প্রামাণ্যচিত্র) সমাজ বদলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তামাকবিরোধী প্রামাণ্যচিত্র : মাইনী, চেঙ্গী ও ফেনী নদীর তীরবর্তী পলিনির্ভর উর্বর জমিগুলোর অধিকাংশ তামাকের দখলে। কম্পানিগুলোর দেওয়া মুনাফার লোভে সার, কীটনাশকের সুবিধা নিয়ে স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি কৃষক তামাকে উৎসাহিত হন। তামাক প্রক্রিয়ায় তাতে পোড়ানো হয় প্রচুর বন জঙ্গলের গাছপালা।

শারীরিকভাবে ক্ষতির শিকার হন তামাকে জড়িত শ্রমিক শিশু ও নারী। তামাকের চাষ বৃদ্ধির কারণে শাক-সবজি, ধান, আলু, ভুট্টাসহ বিভিন্ন রবিশষ্য উত্পাদন কমে গেছে। এই চাষের ফলে সাধারণের মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ রাতারাতি বড় লোক সাজছেন; আবার বহু প্রান্তিক কৃষক আরো দরিদ্র হয়ে পড়ছেন।

তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে জ্ঞানকীর্তি চাকমা ‘সাত গাং সাজুবী বাক্কো এজের আহ পরি’ (অর্থাৎ সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাঘ আসছে হা করে) নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র এলাকায় ব্যাপক

আলোড়ন তুলেছে। প্রামাণ্যচিত্রে দেশবরেণ্য অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া, মৃত্তিকা গবেষক, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রান্তিক কৃষক ও চাষির মতামত গুরুত্ব পেয়েছে।

মন্তব্য