kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

গেরিলা যুদ্ধের স্মৃতিতে এখনো শিহরিত হন বীরপ্রতীক মোজাম্মেল

শাখাওয়াত হোসাইন   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গেরিলা যুদ্ধের স্মৃতিতে এখনো শিহরিত হন বীরপ্রতীক মোজাম্মেল

মোজাম্মেল হক ছবি : কালের কণ্ঠ

পরিবারকে ফাঁকি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এতটা মধুর ছিল না ১৯৭১ সালে নবম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোর মোজাম্মেলের পক্ষে। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় উর্দুভাষীদের অনৈতিক বৈষম্যের শিকার এই কিশোরের লক্ষ্য ছিল ভারতের অস্থায়ী প্রশিক্ষণশিবির। সহপাঠী ও সমবয়সীদের নিয়ে বাড়ি থেকে কিছু অর্থ চুরি করে ভারতে পালানোর ফন্দি আঁটেন। কিন্তু ভারতে যাওয়ার পথ ও প্রশিক্ষণশিবির—দুটি বিষয়েই ধোঁয়াশা ছিল মোজাম্মেল হকের। পরিবারের বারণ উপেক্ষা করে প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে চলে যেতে পারেন—এই আশঙ্কা থেকে মা-বাবা সমঝোতা করেন তাঁর সঙ্গে। ১০-১৫ দিন পরিবারের সঙ্গে থাকার শর্তে ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় পরিবার থেকে। পরিবারের শর্ত শেষ হলে রাজধানীর  ছোলমাইদ থেকে চাচাতো ভাই আবু সাঈদকে নিয়ে নৌকায় চেপে ডুমনি যান। সেখান থেকে কুমিল্লার চান্দিনা গিয়ে হেঁটে পার হন গোমতী নদী। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় সড়কে পড়ে থাকা একটি লক্কড়ঝক্কড় গাড়িতেই রাত যাপন করেন মোজাম্মেল ও আবু সাঈদ। শেষ পর্যন্ত ওই দিনই ত্রিপুরা রাজ্যের নির্ভয়পুর ক্যাম্পে পৌঁছেন তাঁরা। কিন্তু সেখানে মহামারি আকারে চোখের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই শেষে প্রশিক্ষণ না নিয়েই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন দুই ভাই। গত সপ্তাহে কালের কণ্ঠ’র কাছে এভাবেই যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণা করছিলেন মোজাম্মেল হক। কাঁপা কণ্ঠে কুশল বিনিময় করলেও স্মৃতিচারণায় তিনি ছিলেন বেশ শক্ত। যেন যুদ্ধদিনের উত্তেজনায় ফিরে গিয়েছিলেন এই বীরপ্রতীক।

পকেটে মোবাইল ফোন বেজে উঠলে কিছুটা বিরতি নিয়ে আবারও শুরু করেন তিনি।

মোজাম্মেল জানালেন, দেশে ফিরে এলেও এক ধরনের অতৃপ্তি তখনো কাজ করত। তাই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসা মুক্তিযোদ্ধা রহিমের সহায়তা চাইলেন। একটি অপারেশনে সফলভাবে গ্রেনেড চার্জ করতে পারলে মিলবে ভারতের প্রশিক্ষণশিবিরে যাওয়ার টিকিট—এমন শর্ত দিলেন রহিম। রাজি হলেন মোজাম্মেল। রহিমের শর্তমতো গুলশান-১ সুপারমার্কেটে উর্দুভাষী এক দোকানে গ্রেনেড চার্জ করতে গেলেন তিনি। কিন্তু উর্দুভাষী মালিকের দোকান বন্ধ থাকায় হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হলো। পরদিন মহাখালী অভিমুখে যাত্রা শুরু হলো মোজাম্মেলের । উদ্দেশ্য সেখানকার একটি পাকিস্তানি বাড়ি। সফলভাবে গ্রেনেড মেরে ফিরে এলেন মোজাম্মেল। গ্রেনেড চার্জের কিছুক্ষণ পরই হেলিকপ্টার উড়ে এলো বাড়িটির দিকে। ততক্ষণে গুলশানের গুদারাঘাট হয়ে লাপাত্তা মোজাম্মেল। অভিযান সফল হওয়ায় মিলল ভারতে যাওয়ার টিকিট। কিন্তু বিপত্তি বাধায় মোজাম্মেলের বয়স। মেজর হায়দার অপারগতা প্রকাশ করেন। ঢাকার গেরিলাদের বাছাই, প্রশিক্ষণ ও অভিযান পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন মেজর এ টি এম হায়দার। কিন্তু মোজাম্মেলের দৃঢ়তায় কাটল সেই জটিলতা। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার সময় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ল ১৩ সদস্যের একটি দল। ভাগ্য অনুকূলে থাকায় সশরীরে সবাই ফেরেন দেশে। দেশে এসেই প্রথম লক্ষ্য পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খাঁ। বাড়ির রাখালের সহায়তায় মোনেম খাঁকে হত্যা করে পাকিস্তানের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিলেন তিনি। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি সদস্য কাজীম আলী ডাকাতকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেন তিনি। এ ছাড়া মেজর হায়দারের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন মোজাম্মেল হক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোন বিষয়টি এখনো তাঁকে আলোড়িত করে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমার এক বন্ধু পত্রিকা হাতে নিয়ে ধানক্ষেতে ছুটে গেলেন। তখন আমি বাবার সঙ্গে ক্ষেতে পানি সেচ দিচ্ছিলাম। পত্রিকায় বীরপ্রতীক হিসেবে  আমার নাম এসেছে। বিষয়টি এখনো পুলকিত করে আমাকে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বয়স কম থাকায় মেজর হায়দার একসময় আমাকে প্রশিক্ষণে যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু সেই তিনিই আমাকে ডেকে নিয়ে বীরপ্রতীক হওয়ার সুখবরটা দেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা