kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

গেজেটে নামটা দেখে যেতে চান মুক্তিযোদ্ধা হাশেম মাঝি

দেবদাস মজুমদার   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গেজেটে নামটা দেখে যেতে চান মুক্তিযোদ্ধা হাশেম মাঝি

মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম হাওলাদার ছবি : কালের কণ্ঠ

৬৮ বছরের আবুল হাশেম মাঝি। তারুণ্যে দেশের জন্য লড়াই করেছেন। যুদ্ধজয়ী এই সংগ্রামী এখন জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত। চরম দারিদ্র্য আর রোগশোকে বিপর্যস্ত এই মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম ওঠেনি তাঁর। গ্রাম্য হাট-বাজারে সালসা বিক্রি করে আট সদস্যের পরিবারের ভাত জোগাতে হয় তাঁকে। ভূমিহীন আর গৃহহীন জীবনে নিজের ঘর নেই; তাই ঠাঁই মিলেছে আবাসনের ঘরে।

২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠে যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতি শিরোনামের প্রতিবেদনগুচ্ছে ছাপা হয়েছিল রণাঙ্গনে তাঁর   বীরত্বগাথা : ‘মুক্তিযুদ্ধে লড়েছি নৌকা নিয়ে’। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর স্থানীয়ভাবে হাশেম মাঝি আলোচনায় আসেন। অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গত বছর ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ঢাকায় সম্মাননার আয়োজন করে কালের কণ্ঠ। হাশেম মাঝিও সেদিন সংবর্ধিত হন। তাঁকে ৫০ হাজার টাকা ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। এরপর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি ও জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে হাশেম মাঝির নাম মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করে পাঠানো হয়। এরপর এক বছর পার হলেও হাশেম মাঝি গেজেটভুক্তির অপেক্ষায়।

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠী ইউনিয়নের জোলাগাতী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম হাওলাদার এলাকায় পরিচিত হাশেম মাঝি নামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌকার মাঝি ছিলেন। সে কারণে এই জনপদের মানুষ তাঁকে মাঝি বলেই চেনে।

কাউখালী উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় বিড়ালজুড়ী আবাসন প্রকল্পে অস্থায়ীভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। স্ত্রী, চার মেয়ে, দুই ছেলেসহ আট সদস্যের পরিবার তাঁর। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য তিনি বেছে নেন গ্রাম্য কবিরাজি পেশা। গ্রাম্য হাট-বাজারে সালসা বিক্রির কাজ করলেও মাঝি নামটার আজও বদল হয়নি তাঁর। বর্তমানে কালের কণ্ঠ’র দেওয়া ৫০ হাজার টাকাই তাঁর সম্বল। ওই টাকায় তিনি কিছু ধারদেনা শোধ করেছেন। বাকি টাকা হাট-বাজারে, পথের ধারে সালসা বিক্রির ব্যবসায় খাটিয়েছেন। যা রোজগার হয় তা দিয়েই চলে তাঁর সংসার।

১৯৭১ সালে ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই বীর সেনা। তিনি সুন্দরবনে বন শ্রমিকের কাজ করতেন। ৯ নম্বর সেক্টর ছিল নদীবহুল এলাকা। নদীনালা ও অসংখ্য খালবিল মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত ছিল এই সেক্টরে। সড়কপথের ব্যবস্থা ছিল খুবই নাজুক। এখানে যুদ্ধের ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল একমাত্র নৌপথ। বর্ষাকালে নদ-নদীগুলো কানায় কানায় ভরা থাকত। ওই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নৌপথে চলাচলের জন্য ভালো পথঘাট চেনা দক্ষ মাঝির প্রয়োজন পড়ে, যিনি অস্ত্র, গোলাবারুদসহ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে নিরাপদে পৌঁছে দেবেন। তখন মেজর জিয়াউদ্দিন তাঁকে নির্বাচন করলেন। সুন্দরবন, বরিশালসহ দক্ষিণ উপকূলের জলপথ ছিল তাঁর নখদর্পণে। তারপর আবুল হাশেম নৌকার মাঝি পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন।

একদিন হাসনাবাদ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্রের চালান নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন সুন্দরবন অভিমুখে। তখন ঘোর বর্ষাকাল। প্রমত্তা নদী। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। মাঝনদীতে উত্তাল ঢেউ আর ঝড়ের তাণ্ডব। হাশেম মাঝি শক্ত হাতে নৌকার হাল ধরেন। তুমুল বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকানোর মাঝে হঠাৎ মাঝনদীতে পাকিস্তানি সেনাদের গানবোট দেখতে পেয়ে চমকে ওঠেন নৌকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল গোলাগুলি। মুহূর্তেই পাকিস্তানি সোনাদের মেশিনগানের গুলি এসে হাশেম মাঝির হাতে লাগে। গুলিতে আঙুল উড়ে যায়। তবু রক্তাক্ত জখম হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেন নৌকার হাল। পাকিস্তানি সেনাদের গুলি তখনো থামে না। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি চালান। কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ। কয়েক ঘণ্টা বিপত্সংকুল অবস্থা কাটিয়ে নৌকা নিয়ে ক্যাম্পের কাছে পৌঁছার পর জ্ঞান হারান ক্লান্ত, আহত হাশেম মাঝি। এভাবেই প্রাণ হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন অঞ্চলে নৌপথে মুক্তিবাহিনী ও অস্ত্র বহন করতেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের নৌপথে যাতায়াত চলত হাশেম মাঝির নৌকায়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হাশেম খুলনা ও মোংলায় শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা শুরু করেন। ১৫ বছর আগে তিনি কাউখালীতে ফিরে আসেন। নিজের জমি ও ঘর না থাকায় পরিবার নিয়ে বস্তিতে ঠাঁই নেন তিনি। ঘূর্ণিঝড় সিডরে হাশেম আবারও গৃহহীন হয়ে পড়েন। সিডর-পরবর্তী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সন্ধ্যা নদীর তীরবর্তী বিড়ালজুড়ী আবাসন প্রকল্পে তাঁর মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে।

হাশেম মাঝি কালের কণ্ঠ’র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমারে নিয়া পেপারে না লেখলে আমার জীবনডা চাপা পইড়াই থাকত। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অহন প্রশাসন আমার নাম দিছে। মুই যুদ্ধের ময়দানে আছিলাম। অহন সবাই তা জানে। মুক্তিযোদ্ধার তালিকার গেজেটে নামডা দেইখ্যা মরতে পারলেই শান্তি।’

এ বিষয়ে কাউখালীর সামাজিক উদ্যোক্তা আব্দুল লতিফ খসরু বলেন, কালের কণ্ঠে হাশেম মাঝিকে নিয়ে গত বছর বিজয়ের মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ ও সম্মাননা দেওয়ায় এলাকায় ব্যাপক আলোচিত হন হাশেম মাঝি। এরপর প্রশাসনিক উদ্যোগে তাঁর নাম চূড়ান্ত তালিকায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আমরা এখন সেই গেজেট প্রকাশের আশা করছি।

এ ব্যাপারে কাউখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মো. আলী হোসেন তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, হাশেম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি একজন শ্রমজীবী মানুষ। সালসা বেচে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁর ঘর নেই বলে তিনি সরকারি আবাসনে থাকেন। ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেমের নাম যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক গত বছর তালিকাভুক্ত করে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো গেজেট প্রকাশিত হয়নি।

লেখক : পিরোজপুর প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা