kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলাম

ভুয়াদের বাদ দিন, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব নিন

ইয়াদুল মোমিন   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভুয়াদের বাদ দিন, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব নিন

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলাম ছবি : কালের কণ্ঠ

ফরম পূরণ করার পর এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কিশোর আমিরুল ইসলাম। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরু হওয়ার পর থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। বাবাকে রাজি করাতে পারলেও একমাত্র পুত্রসন্তান হওয়ায় মাকে রাজি করাতে বেগ পেতে হয়েছিল কিশোর আমিরুলের। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে এসএসসি পরীক্ষা না দিয়েই যুদ্ধে চলে যান তিনি।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলামকে নিয়ে ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠে ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে আর থেমে থাকতে পারিনি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

আমিরুল ইসলামের তিন ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। পাশাপাশি আদালতে আইনজীবীর সহকারী (মুহুরি) হিসেবে কাজ করেন। দুই মিলিয়ে সংসার চলে। তিন ছেলে কৃষিকাজ করেন। নিজেদের জমিজিরাত নাই। পরের জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করেন ছেলেরা। পাঁচ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন স্ত্রী, ছেলে, বউমা আর নাতি-নাতনি নিয়ে ১১ জনের সংসার।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মহাম্মদপুর গ্রামের মৃত দৌলত হোসেনের একমাত্র পুত্রসন্তান আমিরুল ইসলাম। হোগলবাড়িয়া ভরস উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে যুদ্ধের বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি।

২০১৬ সালে কালের কণ্ঠকে যুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন, মার্চের শেষ সপ্তাহে গ্রামের আরো আটজনসহ তিনি চলে যান ভারতে শিকারপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে। শিকারপুর ক্যাম্পে তিন-চার দিন থাকার পর সেখান থেকে করিমপুর এবং পরে কড়ুইগাছি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হয়। এরপর বীরভূম রাজ্যের রামপুরহাট সেনানিবাসে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁদের রাইফেল, থ্রি-নট-থ্রি, এসএলআর, স্টেনগান, এলএমজি, টুইন্স মোটর, থ্রিইন্স মোটর, সাবমেশিনগানসহ বাড়িঘর ও ব্রিজ ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ নেন তাঁরা।

তৎকালীন মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) তৌফিক ইলাহী চৌধুরীর ছক অনুযায়ী তাঁরা তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেনেড নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের তিন দিক দিয়ে ঘিরে ফেলেন। সম্মুখযুদ্ধে ১০-১২ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। চারজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। বর্তমানে সেখানটা একটি বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নভেম্বরের শেষ দিকে গাংনী উপজেলার পলাশীপাড়ায় তিনিসহ ৫০-৬০ জনের একটি দল পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া শেলের একটি টুকরা আঘাত হানে কিশোর আমিরুল ইসলামের বুকের ডান পাশে। তিনি প্রতিবেদককে ক্ষতচিহ্ন দেখান। ডিসেম্বরের ৪ তারিখ ভোরবেলা মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সংযোগ সেতুর যুদ্ধও তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সেখানে প্রায় ৮-৯ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। 

যুদ্ধাহত আমিরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘অর্ধেক চাল অর্ধেক পাথরের ভাত খেয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু যারা যুদ্ধ তো দূরের কথা, কখনো অস্ত্র হাতেও ধরেনি বা প্রশিক্ষণও নেয়নি, তারাও আজ আমার সমান মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, এভাবে জেলায় তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা, যারা যুদ্ধ করেনি, তারাও মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে ঢুকে পড়েছে। নতুন সরকারের কাছে তাঁর দাবি, সঠিক তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় রেখে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের ভালোভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করারও দাবি জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সোনার বাংলা গড়ার পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে হবে । কাগজে-কলমে আর মুখে বললেই হবে না।

লেখক : মেহেরপুর প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা