kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

নিজ গ্রামে স্মৃতিসৌধ দেখে যেতে চান বিজয় দাস

শরীফ আহমেদ শামীম   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



নিজ গ্রামে স্মৃতিসৌধ দেখে যেতে চান বিজয় দাস

মুক্তিযোদ্ধা বিজয় দাস। ছবি : কালের কণ্ঠ

অসীম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া গ্রামের বিজয় দাসের দিন কাটে খেয়ে না খেয়ে। নিজের জন্য তাঁর কষ্ট হয় না, কষ্ট লাগে ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা ও স্ত্রীর জন্য। বৃষ্টি নামলে ঘরের টিনের চালের ফুটো দিয়ে জল পড়ে।

একমাত্র ছেলে পীযূষ দাস অসুখে না পড়লে হয়তো মুক্তিযোদ্ধা বিজয় দাসের এতটা খারাপ পরিণতি হতো না। পেটে ভাত না থাকলেও নিজ গ্রামে একটি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবিতে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায় মলিন পুরনো পোশাক, পায়ে ছেঁড়া জুতা এবং জোড়াতালির কালো ব্যাগ হাতে জেলা প্রশাসন ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কার্যালয়ে।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, তখন বিজয় দাস ছিলেন দশম শ্রেণির ফার্স্টবয়। দেশ স্বাধীন হলে যুদ্ধের দক্ষতা, সাহসিকতা ও শারীরিক গড়নের কারণে সৈনিক হিসেবে নিয়োগ পান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা এবং বড় চাকরির আশায় সৈনিকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন কলেজে। বিএ পাস করার পর বহু চেষ্টা করেও একটি সরকারি চাকরি জোগাড় করতে পারেননি তিনি। পরে একটি প্রাইভেট কারখানায় চাকরি নিলেও কয়েক বছর পর তা বন্ধ হয়ে যায়। সংসারজীবন শুরু করার পর এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর স্বামীর সংসার করছে। ছেলে পুলিশ কনস্টেবল। পাঁচ বিঘা জমি ছিল। সংসার আর ছেলের লেখাপড়া ও মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে চার বিঘা জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। স্বপ্ন ছিল ছেলে লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়ে বড় চাকরি করবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্নও পূরণ হয়নি। ভালো লেখাপড়া না করায় ছেলেকে চাকরি নিতে হয়েছে পুলিশ কনস্টেবল পদে। বছরখানেক আগে ছেলের মস্তিষ্কবিকৃতি দেখা দেয়। তাঁর চিকিৎসা করাতে গিয়ে চার মাসে দুই লাখ টাকা ঋণ হয়। সুস্থ হয়ে ছেলে চাকরিতে ফিরে গেলেও ঋণের টাকা শোধ দূরে থাক, বউয়ের কথায় ছেলে তাঁর খোঁজখবরও নেয় না। এক বিঘা জমি থাকলেও তেমন ফসল হয় না। ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার বেশির ভাগ টাকাই দিয়ে দিতে হচ্ছে। টাকার অভাবে ঘরটাও মেরামত করতে পারছেন না। চোখ মুছে বিজয় দাস বলেন, বয়স ৬৩ পার হয়েছে। এই বয়সে গতরে আগের মতো শক্তি নেই। কাজকামও করতে পারেন না। ভাতার টাকাটা না পেলে হয়তো তাঁর ভিক্ষাও করা লাগত। বিজয় দাস বলেন, ১৯৭১ সালের ১৪ মে দুপুরে হানা দিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামটিকে পরিণত করেছিল বিরানভূমিতে। অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠেছিল হানাদাররা। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও শিশুসহ হত্যা করেছিল ৮০ জনকে। তাঁর স্বপ্ন ছিল নিহতদের স্মরণে গ্রামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হবে, যাতে নিহতদের স্বজন, গ্রামের মানুষ ও নতুন প্রজন্ম স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে নিহতদের ত্যাগের কথা জানতে পারে। ভাতার টাকা থেকে খরচ বাঁচিয়ে নিহতদের তালিকা তৈরি করে স্মৃতিস্তম্ভ বানানোর দাবি জানিয়ে কয়েক বছর ধরেই প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। কোথাও থেকে এখনো সাড়া না মিললেও হাল ছাড়েননি। খেয়ে না খেয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘর নষ্ট, পেটে ভাত নেই, তবু তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন একদিন বাড়িয়া গ্রামে স্মৃতি সৌধ হবে।

লেখক : গাজীপুর  প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা