kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার ম হামিদ রন্জু

এখন লড়ছেন পরিবেশদূষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে

তায়েফুর রহমান   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এখন লড়ছেন পরিবেশদূষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে

মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার ম হামিদ রন্জু ছবি: কালের কণ্ঠ

‘১৯৭১ সালে লড়েছিলাম স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু আমার লড়াই এখনো থামেনি। এখন আমি লড়ছি গণতন্ত্র, সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য। লড়ছি পরিবেশদূষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে।’ কথাগুলো বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার ম হামিদ রন্জু। সাভারের গেণ্ডা মহল্লার খন্দকার আবদুল মজিদ ও ইয়াকুত নেছা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান তিনি। কালের কণ্ঠে ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ সংখ্যায় যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতি ‘আমার দুঃখ শহীদ হইনি’ শিরোনামে তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

আজীবন সংগ্রামী এই যোদ্ধা এখন সরাসরি জড়িত রয়েছেন পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ নামো একটি বেসরকারি সংগঠনের সহসভাপতি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের পর দেশটি যে পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার কথা ছিল সে পর্যায়ে পৌঁছেনি। যুদ্ধ করেছিলাম শোষণমুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু এখন সর্বত্র দুর্নীতির ছড়াছড়ি। দুর্নীতিবাজরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। পরিবেশদূষণের কবলে গোটা দেশ। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা দেশটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) অনুপ্রেরণায় গঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাভারের একজন সদস্য হিসেবে ২০০৬ সাল থেকে খন্দকার ম হামিদ রন্জু যুক্ত ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সহসভাপতির। সম্প্রতি তিনি ব্যক্তিগত কারণে সংগঠনটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে আছেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাভার উপজেলার উপদেষ্টা হিসেবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সেই স্কুলছাত্র অবস্থা থেকে। এলাকায় নাটকে অভিনয় করেছেন বহুবার। এখনো সুযোগ পেলেই হারমোনিয়াম হাতে নিয়ে রবীন্দ্রসংগীতসহ নানা ধরনের গান করেন। মাঝেমধ্যে তিনি গান রচনাও করেন। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ খ্যাত শিশুসাহিত্যিক দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের জন্মস্থান সাভারে। অমর এই সাহিত্যিকের কর্মকাণ্ড ও স্মৃতি ধরে রাখার জন্য গড়ে ওঠা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার স্মৃতি সংসদের তিনি সভাপতি। এশিয়াটিক সোসাইটির হয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একজন গবেষক হিসেবে সাভারে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ঘটনাবলি রচনা করেছেন।

খন্দকার ম হামিদ রন্জু ১৯৭১ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তেন সাভার কলেজে। সব সময়ই ছিলেন রাজনীতিসচেতন। ছিলেন ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় সদস্য। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদেরও একজন গর্বিত সদস্য ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় ছয় বছরের একজন শিশু হওয়ায় সেই আন্দোলনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। তবে ভাষাশহীদদের স্মরণে তখন শহীদ মিনার নির্মাণ পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ থাকলেও ১৯৬৮ সালে সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বর্ণময়ী ছাত্রাবাসের সামনে রাতের অন্ধকারে হারিকেন জ্বালিয়ে সাভারে সর্বপ্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে তিনি ছিলেন প্রধান ও অগ্রণী ভূমিকায়।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় খন্দকার ম হামিদ রন্জু বলেন, ‘১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় তাঁকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। তখন চার খলিফা হিসেবে পরিচিত আ স ম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সঙ্গে তাঁর তৈরি হয়েছিল একটি নিবিড় সম্পর্ক। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে আ স ম আব্দুর রব আগেই দেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে একটি ধারণা দিয়ে তখনকার ছাত্রলীগের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নিউক্লিয়াস’ বডিতে তাঁকে সদস্য করে নেন। তখন থেকেই তিনি ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধের ব্যাপারে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষপাতী। এর আগেই তিনি ১ মার্চ (১৯৭১) থেকে স্থানীয় কয়েকজন যুবককে নিয়ে সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ডামি রাইফেল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু করে দেন। ৫ মার্চ তিনি সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আরো কয়েকজন মিলে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের জনসভায় সর্বস্তরের জনসাধারণকে উপস্থিত করার জন্য সাভার এলাকায় প্রচারের দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। তিনি ৭ই মার্চ সাভার থেকে একদল কর্মী নিয়ে সকাল ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগ দেন। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন সেই মঞ্চের নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতরে। তিনি বলেন, একটি সাদা রঙের টয়োটা গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এসে উপস্থিত হন। তখন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে বক্তব্যরত একজনকে বাঁ হাত দিয়ে সরিয়ে নিজে মাইক নিয়ে কাউকে কোনো সম্বোধন ছাড়াই দরাজ গলায় বলে উঠলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি...’ বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী এই ভাষণ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মোহিত করে।

এই বক্তব্য শোনার পর তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে সাভারের ১২টি ইউনিয়নে ঘুরে ঘুরে স্বাধীনতার সপক্ষে বক্তব্য দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের লোকজনকে সংগঠিত করতে থাকেন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে লোকজনকে সংগঠিত করার কাজ।

২৫শে মার্চ কালরাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট চলার পর সাভারে যেন পাকিস্তানি বাহিনী প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য তিনি কয়েকজন যুবককে নিয়ে তৎকালীন মিরপুর লোহার ব্রিজে (আমিনবাজার ব্রিজ) বুলডোজার, কাঠের গুঁড়ি ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন। বলিয়ারপুর ও হেমায়েতপুরেও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গাছ কেটে ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। বাইপাইল মোড়ে ব্রিজ নির্মাণের জন্য রাখা সামগ্রী দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাটে বন্ধ করে দেন ফেরি চলাচল।

এই প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে মিরপুর ব্রিজ হয়ে জিপ নিয়ে ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী সাভারে প্রবেশ করে। সাভার থানার তৎকালীন ওসি আবদুল মজিদ স্বাধীনতার পক্ষের লোক হলেও তাঁকে এবং তাঁর সহযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান ইমুকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। না হলে তাঁদের গ্রেপ্তারেরও ভয় দেখান। অতঃপর তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান ইমু এলাকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার রায়দক্ষিণ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি আটজন যুবককে সংগ্রহ করেন এবং সাভারের মোজাম্মেল হক ও আবদুল কাইউমকে সঙ্গে নিয়ে ১২ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা হয়ে ভারতের বক্সনগর থানায় প্রবেশ করেন। এরপর ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেও কোনো প্রশিক্ষণের সুযোগ না পেয়ে মনঃকষ্টে ভুগতে থাকেন। পরে তিনি মোজাম্মেল হক ও আবদুল কাইউমকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গেলেন আগরতলায়। পূর্বসম্পর্কের সূত্র ধরে সেখানে তাঁরা দেখা করলেন আ স ম আবদুর রবের সঙ্গে। পরদিনই আ স ম আবদুর রব ভারতীয় একটি কার্গো বিমানযোগে তাঁদের তিনজনকে প্রশিক্ষণের জন্য দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে দুই মাস কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর তাঁরা আগস্টের শেষ সপ্তাহে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ফিরে এলেন সাভারে। কিন্তু সাভারের অবস্থান ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় এখানে পাকিস্তানি আর্মিদের যাতায়াত ছিল অবাধ। তাই এখানে কোনো ক্যাম্প করার সুযোগ না পেয়ে তিনি মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার রায়দক্ষিণ গ্রামে গিয়ে বিরাট বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। তবে ছোটখাটো কিছু ঘটনা ছাড়া এই এলাকায় বড় কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি বিধায় তাঁর কোনো বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি বলে উল্লেখ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার ম হামিদ রন্জু কোথাও যুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণা বা বক্তব্য দিলে একটি উক্তি প্রায়ই উচ্চারণ করেন। তা হলো—‘আমার গর্ব আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আর আমার দুঃখ আমি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়নি।’

সাংসারিক জীবনে অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক স্ত্রীর স্বামী এবং এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা এই যোদ্ধার একটি ইচ্ছা ছিল—তাঁর বাড়ির দেয়ালে তিনি গ্রামীণ একটি চিত্র অঙ্কন করবেন। রক্তলাল ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকবে স্মৃতিসৌধ। লাঙল কাঁধে নিয়ে কৃষক গরুর পাল নিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় একজন গৃহবধূ নদী থেকে কলসি ভরে জল নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। একই সঙ্গে একজন জেলে মাছ ধরে পলোটি কাঁধে ফেলে বাড়ি ফিরছেন। কয়েকজন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আলাপের পর খরচের বাজেট শুনে তিনি তাঁর এই ইচ্ছাটি এখনো পূরণ করতে পারেননি।            

লেখক : সাভার প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা