kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

একখণ্ড খাসজমি আজও জোটেনি ওয়াদুদের

নাসরুল আনোয়ার   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একখণ্ড খাসজমি আজও জোটেনি ওয়াদুদের

জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া বাজিতপুরের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াদুদ

বাড়ির পাশের পুকুরপারে যেখানটায় কিছুটা জংলার মতো, সেখানেই উবু হয়ে কী যেন করছিলেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল, কাঁচি দিয়ে বুনো লতাগুল্ম কাটছেন তিনি। ‘এসব দিয়ে কী করবেন?’ বৃদ্ধ লোকটি বললেন, ‘নিজে না খাই, গাভিডার আধার তো জুগাইতে অইব!’

কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদককে দেখে একগোছা লতাগুল্ম হাতে তাড়াহুড়া করে ওপরে উঠতে গিয়ে কয়েকবার হোঁচট খেয়ে ফেললেন। ওই সময় মসজিদের পাকা ঘাটলায় বৃদ্ধের স্নানরতা স্ত্রী রেহানা আক্তার স্বামীর অমঙ্গল আশঙ্কায় চিৎকার দিয়ে উঠলেন। বললেন, ‘দেখছনি, পইড়া মরব দি!’ ঘটনাটি বৃহস্পতিবার (৩ জানুয়ারি ২০১৯) দুপুরের।

বলছিলাম কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর পৌর শহরের মধ্য ভাগলপুর এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াদুদের (৭২) কথা। ২০১২ সালের ৫ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠে মুক্তিযোদ্ধার বাঁচার লড়াই কলামে তাঁকে নিয়ে ‘ভ্যানের চাকা যে আর ঘোরে না ওয়াদুদের’ শিরোনামে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। সে সময় তিনি ঠ্যালাভ্যান চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। করতেন দিনমজুরির কাজও। এখন আর সে সাধ্য নেই তাঁর। শরীর সায় দেয় না।

গাভিটার খাবারের জন্য উদ্গ্রীব যে মানুষটি, তাঁর নিজেরই এখন খাদ্যের সংস্থান নেই! ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে থাকা এই মুক্তিযোদ্ধার মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেনি আজও! ‘বিরুদ্ধ সময়ে’ তাঁর জীবনের চাকা যেন থমকে গেছে। দেশের মাটি সুরক্ষায় জীবনপণ করলেও নিজের একচিলতে ভিটা নেই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াদুদের। তাঁর আফসোস, নিজের ভিটায় মৃত্যুবরণ থেকে তাঁকে বঞ্চিত হতে হবে।

আব্দুল ওয়াদুদ জানালেন, মেজো ছেলে আক্তার হোসেন তাঁর পেশাটাই বেছে নিয়েছেন। বড় ছেলে সুজন ফরিদপুরে দিনমজুরি করেন। আর চার মেয়ের মধ্যে তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে সামান্য একখণ্ড ভিটাবাড়ি ও বন্ধকের জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা হিসেবে পাওয়া টাকায় সংসার চালাতেন। ‘নুন-পানি’ খেয়েই একরকম চলে যাচ্ছিল। এভাবে অবশ্য ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন। শেষবার সেসব ঋণ শোধ এবং তৃতীয় মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে আবার ব্যাংক থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ তোলেন। যে কারণে এখন আর মুক্তিযোদ্ধা ভাতার পুরো টাকাটা পান না।

প্রতি মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা কেটে নিচ্ছে ব্যাংক। ছোট মেয়ে সাদিয়া কলেজে এবং ছোট ছেলে আব্দুর রহমান স্কুলে পড়ছে। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে পাঁচজনের খাওয়া-পরার পুরো ভার তাঁর কাঁধে। লেখাপড়ার খরচও অনেক। ভাতার বাদবাকি সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় এখন আর চলছেই না। বললেন, ‘বড় ছেলের আয়-রোজগারে তার নিজেরই সংসার চলে না। টাকা পাঠাবে কোত্থেকে! মেজো ছেলেরও তিন সন্তান। সে-ও অপারগ।’ এ অবস্থায় চরম সংকট ঘিরে রেখেছে দেশমাতৃকার জন্য একাত্তরে জীবনপণ যুদ্ধে জয়ী এই বীর যোদ্ধাকে।

‘এক দিন আফনেরার ফত্রিহাত আমার জীবনকাহিনি লেখছুইন। আউজগা লেইখ্যা দেইন, মুক্তিযুদ্দা আব্দুল ওয়াদুদ সাকুল্য ভূমিহীন।’ সক্ষোভে কালের কণ্ঠকে তিনি এ কথা বলেন। জানান একখণ্ড খাসজমির জন্য গত ছয় বছরের নতুন আরেক ‘যুদ্ধ’ এবং অধিকার থাকা সত্ত্বেও ছেলের স্কুলের দপ্তরি পদে নিয়োগ না পাওয়ার বঞ্চনার কথা। কালের কণ্ঠে তাঁর জীবনযুদ্ধ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনের পরও কর্তৃপক্ষের অবহেলার কথাও বাদ যায় না।

সেবার কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁদের অর্থ সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সেই তালিকার মধ্যে সহায়হীন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার বিবরণ ও আবেদন চাওয়া হয়। এই খবরে আব্দুল ওয়াদুদসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার মনে আশা জাগে। এ প্রতিবেদকের মাধ্যমে সে সময় আব্দুল ওয়াদুদও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একখণ্ড ভিটামাটি বরাদ্দ এবং ব্যবসার পুঁজি বাবদ অর্থ সহায়তার আবেদন করেন। এর কিছুদিন পর কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছে চিঠি আসে।

আব্দুল ওয়াদুদ জানান, জেলা প্রশাসক দাপ্তরিক তদন্তের লক্ষ্যে তৎকালীন বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তাঁকে ডেকে পাঠান। ইউএনও আব্দুল ওয়াদুদকে জানান, তাঁর কাগজপত্র নাকি হারিয়ে গেছে। নতুন করে আবেদন করতে হবে। পরে তিনি যথারীতি আবেদন করেন। এরপর প্রশাসন থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। এ ঘটনা এই মুক্তিযোদ্ধাকে ভীষণ পীড়া দেয়। সম্প্রতি খাসজমি বন্দোবস্ত চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তিনি আরেক দফা আবেদন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘উপরি থাকলে উনারা কামডা করতাইন। আমার কামে তো আর উপরি নাই!’ ২০১৭ সালে ছেলের দপ্তরি-কাম-প্রহরীর চাকরির জন্যও একটি আবেদন করেন। বঞ্চনার শিকার এই মুক্তিযোদ্ধা কালের কণ্ঠকে জানান, নিয়ম রক্ষা করেই তিনি ছেলের চাকরিটা চেয়েছিলেন। সরকারি চাকরিটা পেলে হয়তো সে নিজে চলতে পারত, পরিবারের দায়িত্বটাও নিত। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তার সে অধিকারও ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তাঁর ছেলের পরিবর্তে প্রভাবশালী এক জনপ্রতিনিধির গাড়িচালকের শ্যালককে চাকরিটি দেওয়া হয়। এরপর চাকরিটি ফিরে পেতে বঞ্চিত আরো পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তিনি হাইকোর্টে মোকদ্দমা করেন। পরে চাকরির আশ্বাসের ভিত্তিতে সেই মোকদ্দমাও তুলে নিতে বলা হয়; কিন্তু দুই বছরেও আর চাকরি দেওয়া হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি শুধু বলেন, ‘ওরা তেলা মাথাত তেল দেয়।’ প্রসংগত, ‘মুক্তিবার্তা’য় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াদুদের মুক্তি নম্বর ০১১৭০৮০১১৯। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়পত্রে তাঁর ধারাক্রম ২৪১০৬।

লেখক : হাওর অঞ্চল প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা