kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

কুষ্টিয়ার দুলজান নেছা

রাষ্ট্রের সম্মানটুকু পাইছি, এখন মরতে চাই

তারিকুল হক তারিক   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাষ্ট্রের সম্মানটুকু পাইছি, এখন মরতে চাই

বীরাঙ্গনা দুলজান নেছা। ছবি : কালের কণ্ঠ

গণ-আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে একাত্তরের নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়ার পর কুষ্টিয়ার বীরাঙ্গনা দুলজান নেছা সামাজিকভাবে হেয় হয়েছিলেন। সে কথা মনে করে এখনো তিনি গুমড়ে কেঁদে ওঠেন। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তাঁকে মর্যাদা দিয়েছে, ভরসা দিয়েছে।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ‘বীরাঙ্গনার বিপর্যয়গাথা’ শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল কালের কণ্ঠ। দুলজান নেছাকে নিয়েও ছিল একটি প্রতিবেদন, শিরোনাম : ‘জামায়াত-শিবিরের লোকজন এখনো আঙুল তুলে দেখায়...’।

কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান তিনি। সে কথা মনে পড়ে তাঁর। ’২০১৩ সালে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় খবর প্রকাশের পর ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আমার নাম তুলে দেন। শেষ বয়সে রাষ্ট্রের সম্মানটুকু পাইছি। কিন্তু শরীরটা আর চলে না। শরীরে নানান রোগে বাসা বেঁধেছে। শেখের বেটি শেষ বয়সে আমাকে রাষ্ট্রের সম্মানটুকু দেছে। অনেক ধন্যবাদ তাঁকে। এখন মরার আগে সুস্থভাবে মরতে চাই।’

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের দয়রামপুর গ্রামে দুলজান নেছার বাড়ির উঠানে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। ১৯৭১-এর সেই বিভীষিকার রাতের কথা মনে হলে এখনো ভয়ে, ঘৃণায় শিউরে ওঠেন দুলজান। রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা একাত্তরের এক ভোররাতে পদ্মার পারে তাঁদের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। বলেন, ‘এরপর নির্যাতন শেষে রাইফেলের বাঁট দিয়ে তারা আমার সারা শরীর রক্তাক্ত করিছিল। এখনো বুক ও পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।’

এখনো বুকের ব্যথায় কাজকর্ম করতে পারেন না দুলজান, কোমরের ব্যথাও কমে না। এ ছাড়া শরীরে নানা রোগ। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘পাক হানাদারদের অমানুষিক নির্যাতনে পঙ্গু স্বামী মুক্তিযোদ্ধা তেছের আলী মণ্ডল দীর্ঘ রোগভোগের পর বিনা চিকিৎসায় ২০০২ সালে মারা যান। আমিও ওই পথের পানে চেয়ে আছি।’

মুক্তিযুদ্ধের দুই দশক পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে মু্ক্তিযুুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গড়ে ওঠে। তাদের উদ্যোগে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত গণ-আদালতে সাক্ষ্য দিতে তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর এই বীরাঙ্গনা দুলজান নেছা ঢাকায় গিয়েছিলেন। একাত্তরে তাঁর ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বাড়ি ফেরার পরই এলাকাবাসী তাঁকে একঘরে করে দেয়। দুই বছর ধরে এ অবস্থা চলার পর প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতারা গ্রামে গিয়ে তাঁর গৌরবজনক অবদানের কথা তুলে ধরে সেই অবস্থার অবসান ঘটান।

বীরাঙ্গনা দুলজান নেছা বলেন, ‘একাত্তরের নির্যাতনের বিষয়টি চাপাই ছিল। কেউ জানত না। কিন্তু গণ-আদালতে স্বাক্ষ্য দিবার পর সব জানাজানি হয়ে যায়। আমিসহ আমার পাশের বাড়ির অন্য দুই বীরাঙ্গনাকেও আমার মতো বিপাকে পড়তে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার যা হবার হয়ে গেছে, এই অবস্থা যেন পৃথিবীর আর কোনো মেয়ের না হয়। একাত্তরে আমার ওপর নির্যাতনের জন্যই এক মেয়ের সুখের সংসার পর্যন্ত ভাঙ্গি গেছে। সেই মেয়ে ময়না এখন কুষ্টিয়া শহরে মেসে ঝিয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।’

তাঁর বড় ছেলে শরিফুল মাঠে কৃষিকাজ করে আবার কখনো ভ্যান চালায়। ছোট ছেলে খোকন দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে এখন অন্যের দোকানে কর্মচারীর কাজ করে। বড় মেয়ে শাহানা ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে আর এক মেয়ে পারভিন শ্বশুরবাড়িতে।

মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা পান দুলজান। বলেন, ‘কিন্তু খায়ে-পরে আর ওষুধ কিনার পয়সা জোটে না। নাতি-পুতিদের লেখাপড়া করাতে পারছি না।’

বড় ছেলে শরিফুল বলেন, ‘আপনাদের লেখার কারণে শেষ বয়সে এসে আমার মা রাষ্ট্রের সম্মানটুকু পাইছে। এখন পারলে মার ভালো চিকিৎসার একটু ব্যবস্থা করেন।’

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি কমান্ডার রফিকুল আলম টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেরিতে হলেও কুষ্টিয়ার দুলজান নেছার মতো বীরাঙ্গনা, যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা এসেছে, তাঁদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাঁরাও এখন আমাদের মতো একেকজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা।’

লেখক : কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা