kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

টাইগার লোকমান বলেন

মুক্তিযোদ্ধারা কারো কাছে হাত পাততে পারেন না

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুক্তিযোদ্ধারা কারো কাছে হাত পাততে পারেন না

লোকমান হোসেন ছবি : কালের কণ্ঠ

মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য সহযোদ্ধারা টাইগার উপাধি দিয়েছিলেন লোকমান হোসেনকে। জীবনযুদ্ধেও একইভাবে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। চরম দার্যিদ্র্যর মধ্যেও কারো কাছে হাত পাতেননি। তিনি মনে করেন, মুক্তিযোদ্ধারা কারো কাছে হাত পাততে পারেন না। তাই সংসার চালাতে মাটি কাটা, কামলা দেওয়া, মাছ ধরা, নৌকা চালানো, ঘেঁটু যাত্রায় অভিনয়—সবই করেছেন তিনি।

সেই লোকমান হোসেনের জীবনে এখন অনেকটাই স্বস্তি এসেছে। সোমবার (৭ জানুয়ারি) তাঁর বাড়িতে বসে কথা হচ্ছিল একাত্তরের এই বীরের সঙ্গে। আলাপচারিতায় জানালেন, মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে সরকারি চাকরি পেয়েছেন। তিনিও এখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। এককালীন অনুদানও পেয়েছেন। এ জন্য তিনি ধন্যবাদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আর কালের কণ্ঠকে। তিনি মনে করেন, কালের কণ্ঠ তাঁর সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরায়ই প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসতে পেরেছেন।

১৯৭১ সালের আগে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিপাহি পদে চাকরি করতেন। ২৫ মার্চের আগে ছুটিতে গ্রামেই ছিলেন। যুদ্ধের শুরুতেই তিনি যোগ দেন মানিকগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, পরবর্তী সময়ে সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর দলে। সেনাবাহিনীতে চাকরি করার সূত্রে প্রথম অবস্থায় লোকমান হোসেনই ট্রেইনার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে এতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি চাইতেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হতে। মানিকগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম অভিযানে তিনিই ছিলেন নেতৃত্বে। সে সময় ম্যাট্রিক পরীক্ষা বানচাল করতে ঘিওরে সুরক্ষিত পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে হামলা করেছিল মুক্তিবাহিনী। এরপর বেশ কয়েকটি ছোটখাটো যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। তবে তাঁর সাহসিকতার পরিচয় মেলে গোলাইডাঙ্গার যুদ্ধে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ৮৩ জন সদস্য নিহত হয়। ওই যুদ্ধে সহযোদ্ধারা জানান, বেটাগান নিয়ে লোকমান হোসেন প্রায় একাই পাকিস্তানি বাহিনীকে ধ্বংস করে দেন। নিজের জীবনের পরোয়া না করে ওই দিন তিনি যেভাবে যুদ্ধ করেছিলেন তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মূলত তাঁর কারণেই প্রশিক্ষিত ভারী অস্ত্রধারী পাকিস্তানি সেনাদের পরাস্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

এই যুদ্ধের পরই লোকমানকে টাইগার উপাধি দেন তাঁর সহযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধ শেষে লোকমান হোসেন যোগ দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে; কিন্তু চাকরিতে যোগ দিয়ে দেখেন তাঁর জুনিয়রদের পদোন্নতি হয়েছে, তাঁর হয়নি। রাগে, অভিমানে চাকরি ছেড়ে দেন। বাড়িতে ফিরে আসেন শূন্য হাতে। বাড়িতে তখন বৃদ্ধা মা আর সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী। সংসার চালাতে বাধ্য হন দিনমজুরের কাজ নিতে। মাটি কাটা থেকে রাজমিস্ত্রির সহযোগীর কাজ করতে হয়েছে। একপর্যায়ে কাজ পান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরই কমান্ডার তেবারক হোসেন লুডুর ফার্মে। ১৯৮৮ সালের দিকে ভাড়ায় একটি ট্রলার নিয়ে যাত্রী পারাপারের কাজ শুরু করেন। পরে নিজেই একটি ট্রলার কিনে নেন। এর ফাঁকে শুরু করেন মাছের ব্যবসা। তবে পুঁজি কম থাকায় তিনি নিজেও জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরেছেন। অভিনয় জানা থাকায় অফ সিজনে ঘেঁটু যাত্রায় অভিনয় করেছেন সামান্য পারিশ্রমিকে।

২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চালু করেন। তখন ৩০০ টাকা করে ভাতা পেতেন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে স্ত্রী, এক মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকা। খরচ চালাতে না পারায় ছেলে-মেয়েদের সেভাবে লেখাপড়াও করাতে পারেননি। এই দুঃখ তাঁর জীবনে মিটবে না বলে তিনি জানান।

২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠে ‘টাইগার লোকমান মাটি কাটেন, মাছ ধরেন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। দুই দিন পরই কালের কণ্ঠ’র মানিকগঞ্জ প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেন তখনকার শীর্ষস্থানীয় একজন কর কর্মকর্তা। লোকমান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। চেয়ে নেন তাঁর মোবাইল ফোন নম্বর। পরে লোকমান হোসেন এ প্রতিনিধিকে জানান, ওই কর্মকর্তা তাঁর ছেলে লেমন হোসেনকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে তাঁর (কর্মকর্তা) অফিসেই পিয়ন পদে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। লেমন এখনো সেখানেই চাকরি করছেন। বিয়েও করেছেন এবং সংসারে এসেছে দুটি সন্তান। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অনুদানও দেওয়া হয়।

বর্তমানে লোকমান হোসেন বাড়িতেই থাকেন। বাড়িতে গড়ে তুলেছেন মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর। মানিকগঞ্জের মৃত ও জীবিত প্রায় সব মুক্তিযোদ্ধার ছবি রয়েছে তাঁর জাদুঘরে। ঘিওর উপজেলার সিংজুড়ি ইউনিয়নের আশাপুর গ্রামে তাঁর জাদুঘরে অনেকেই আসেন মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি দেখতে। এ ছাড়া তিনি স্কুলে স্কুলে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের আয়োজন করেন। সহযোদ্ধারাও তাঁকে সহযোগিতা করেন। এ পর্যন্ত শতাধিক স্কুলে এই কর্মসূচি চালিয়েছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।

লেখক : মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা