kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

আজও স্বীকৃতি মেলেনি বীরাঙ্গনা দীপ্তির

শামস শামীম   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আজও স্বীকৃতি মেলেনি বীরাঙ্গনা দীপ্তির

বীরাঙ্গনা দীপ্তি রানী দে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভালো নেই বীরাঙ্গনা দীপ্তি রানী দে (৬৪)। অভাব-অনটনে পরিবারের আট সদস্য নিয়ে দিন কাটে তাঁর। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের হাতে নির্যাতিত হতদরিদ্র এই নারী স্বীকৃতির জন্য বারবার চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত ব্যর্থ। পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামী। মায়ের বীরাঙ্গনা পরিচয়ের কারণে তাড়িয়ে দেওয়া স্বামী পরিত্যক্তা বড় মেয়েকেও তাঁর পরিবারেই আশ্রয় নিতে হয়েছে।

কালের কণ্ঠ ২০১৫ সালে ‘দীপ্তি রানী দে : আত্মহননের চেষ্টা করেন তিনবার’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের বীরাঙ্গনা দীপ্তি রানীকে নিয়ে প্রথমবারের মতো একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর ফলে অসহায় পরিবারের এই নারীর প্রতি পাকিস্তানি হানাদার ও এদেশীয় দোসরদের বর্বরতা সম্পর্কে জানতে পারে মানুষ। এই বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়। ঢাকায় ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি কালের কণ্ঠ’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বীরাঙ্গনা দীপ্তি রানীসহ কালের কণ্ঠ’র এই বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা নারীদের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে অনুষ্ঠানস্থলে কেঁদেছিলেন দীপ্তি। এ সময় এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদানসহ নগদ এক লাখ টাকা সহায়তাও দিয়েছিল

এরপর আশায় বুক বেঁধেছিলেন তিনি। একাত্তরে নির্যাতনের স্বীকৃতি পাবেন—সেই স্বপ্ন নিয়ে আবেদনও করেছিলেন। এত দিন পরও এই আশাটি পূরণ হয়নি তাঁর। দারিদ্র্যের নির্মমতার শিকার এই নারী মৃত্যুর আগে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান। স্বীকৃতি নিয়েই মরতে চান তিনি।

রবিবার (৬ জানুয়ারি) তাঁর হোসেনপুরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ময়লা একটি শাড়ি পরে স্বামীর সেবা করছেন। কয়েক বছর ধরে বিছানায় শায়িত পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীকে ভালো চিকিৎসা দেওয়ার সাধ্য নেই তাঁর। তিন ছেলের দুজন সিলেটের ভোলাগঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ পাথরকোয়ারিতে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। বড় ছেলে বাড়িতে থেকে অসুস্থ বাবা ও মায়ের সেবাসহ বাড়িতেই শ্রমিকের কাজ করেন। মা বীরাঙ্গনা হওয়ায় বড় মেয়েকে ১০ বছর আগেই তাড়িয়ে দিয়েছে স্বামী। এখন দীপ্তি রানীর পরিবারেই থাকেন তিনি।

ছেলে প্রদীপ দাস ও সুদীপ দাসের দিনমজুরিতেই চলছে পরিবারের আটজনের সংসার। দুই বেলা খাবার জুটলেও পরিবারের সবার ভালো জামাকাপড় ও সাধ-আহ্লাদ মেটানো হয় না কখনো। শরীরে নানা অসুখ বাসা বাঁধলেও টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেন না।

তিন বছর আগে কালের কণ্ঠ’র বীরাঙ্গনা প্রতিবেদন ও সম্মাননাপত্র নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রহরী পদের জন্য আবেদন করেছিলেন ছোট ছেলে সুদীপ। ঘুষ চাওয়ায় সেই চাকরিও হয়নি ছেলের। দীপ্তি জানালেন, কালের কণ্ঠ থেকে এক লাখ টাকা অনুদানই ছিল মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত হওয়ার পর প্রথম কোনো সহায়তা ও সম্মাননা। ওই টাকার বেশির ভাগই ব্যয় করে বসতঘর সংস্কার করেছিলেন। গত বছর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ানের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অসহায় ও দুস্থ নারী হিসেবে ৫০ হাজার টাকা সহযোগিতা পেয়েছেন। ওই বছর সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সম্মাননাসহ শাড়ি ও চাদর উপহার দিয়েছিল। এই সহায়তা ছাড়া আর কখনো কোনো সহায়তা পাননি তিনি।

দীপ্তি জানান, প্রায় তিন বছর আগে তিনি স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছেন। গত বছর যাচাই-বাছাই শুরু হলে সাক্ষ্য দেন এলাকার বাসিন্দা ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ান। পরে যাচাই-বাছাই আদালতের নির্দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর বিষয়টিও থমকে রয়েছে।

আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমি যাচাই-বাছাই কমিটিকে সাক্ষ্য দিয়েছি। তারা দীপ্তি রানীর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে লিপিবদ্ধ করেছিল। এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাঁর আবেদনটি আটকে আছে।’

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই ১৪ বছর বয়সে অভাবী বাবা তাঁকে বিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৭১ তাঁর জীবন পাল্টে দেয়। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জননী দীপ্তি রানী। যুদ্ধের সময় তাঁর পরিবারের সবাই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর স্বামী ধরণী বাড়িতে থেকে যান। অগ্রহায়ণের এক সকালে দুজন পাকিস্তানি মিলিশিয়াকে নিয়ে ধরণীর বাড়িতে এসে ধরণী ও তাঁর ভাইকে পিঠমোড়া করে বেঁধে অত্যাচার চালায় রাজাকাররা। দীপ্তি রানীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। নির্যাতনের কারণে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে পাকিস্তানিরা তাঁকে ক্যাম্পে না নিয়েই ফেলে যায়। সন্ধ্যায় জ্ঞান ফেরে তাঁর। একাত্তরের এই নির্যাতনের ঘটনায় তিনবার আত্মহননের চেষ্টা করেন দীপ্তি।

লেখক : সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা