kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

মেয়েই ভরসা বীরাঙ্গনা রওশনের

প্রসূন মণ্ডল   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মেয়েই ভরসা বীরাঙ্গনা রওশনের

বাড়ির পাশে রোদ পোহাচ্ছেন বীরাঙ্গনা রওশন আরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বয়সের ভারে ন্যুব্জ বীরাঙ্গনা রওশন আরা এখন শয্যাশায়ী। নানা রোগ বাসা বেঁধেছে তাঁর জীর্ণ শরীরে। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছে না তাঁর পরিবার। মাসিক ভাতা যা পান, তা চলে যায় ডাক্তার, ওষুধ আর খাওয়াদাওয়ায়। নিজে চলতে-ফিরতে পারেন না। অন্যের সাহায্যে ঘর থেকে বাইরে আসতে হয়। তাঁর একমাত্র মেয়ে রহিমন বেগম বিধবা। মেয়েই তাঁকে দেখাশোনা করে থাকেন। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আলিম শেখ ও ছোটজন জামাল শেখ। দুই ছেলেই বিয়ের পর অন্যত্র থাকেন। বীরাঙ্গনা রওশন আরা সম্মানী পান ১০ হাজার টাকা, যার বেশির ভাগ চলে যায় ডাক্তার ও ওষুধ খরচে। ১৯২৩ সালের ১৫ এপ্রিল জম্ম নেওয়া এই নারী এখন বিছানা থেকে নামতে পারেন না। কথাও অস্পষ্ট। চিকিৎসা চললে কিছু কথা বোঝা যায়, আবার চিকিৎসা বন্ধ থাকলে তা বন্ধ হয়ে যায়। কানেও শোনেন কম।

বীরাঙ্গনা রওশন আরাকে নিয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কালের কণ্ঠে ‘জরা বার্ধক্যে এখন ভিক্ষাও জোটে না’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারিভাবে তিনি দুই রুমের একটি পাকা ঘর পান। সেই ঘরেই তিনি তাঁর মেয়ে ও মেয়ের দুই ছেলেকে নিয়ে বসবাস করে আসছেন। এরপর কালের কণ্ঠ’র পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সম্মাননাস্বরূপ এক লাখ টাকাসহ বিভিন্ন উপকরণে সম্মানিত হন তিনি। এরপর বীরাঙ্গনা দুই বছর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখান থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে তাঁকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। বাকি ৭০ হাজার টাকা এখন ব্যাংক হিসাবে রয়েছে বলে জানিয়েছেন রহিমন বেগম।

বীরাঙ্গনা রওশন আরার মেয়ে রহিমন বেগম কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘আমার মা এখন ঘরে পড়ে গেছেন। তাঁকে কোলে করে টয়লেটে নেওয়া হয়। অনেক সময় বিছানায় বাহ্যিক কাজ হয়ে যায়। সপ্তাহে দু-একবার বাইরে এনে গোসল করানো হয়। খাওয়াদাওয়া একেবারে ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু পান খেতে চান। জোরজবরদস্তি করে ভাত খাওয়াতে হয়। সব সময়ই অসুস্থ থাকেন। টাকা-পয়সার সমস্যা। তাঁকে দেখাশোনা করতে করতে আমিও কোনো কাজ করতে পারি না।’

রহিমন আরো বলেন, ‘মা যে ভাতা পান তা দিয়েই ডাক্তার, ওষুধ ও সংসারের সব খরচ চালাতে হয়। মায়ের জন্য মাসে আড়াই-তিন হাজার টাকার ওষুধ লেগে যায়। বাকি টাকা দিয়ে আমাদের চারজনের চলতে হয়। সরকার বা কোনো ধনী যদি মাকে একটু উন্নত চিকিৎসা করাত, তাহলে তাঁকে আরো কিছুদিন বাঁচানো যেত।’

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পশ্চিম মাঝিগাতী গ্রামের খেয়াঘাটের দক্ষিণ তীরে বীরাঙ্গনা রওশন আরার বাড়ি। এ খেয়াঘাটেই মানুষ পারাপার করে সংসার চালাতেন তাঁর স্বামী আইনুদ্দিন হাওলাদার। ১৯৭১ সালের এক কালরাত। চারদিকে যুদ্ধের ডামাডোল। দিনক্ষণ ঠিক বলতে পারেননি তিনি। বিভীষিকার সেই রাতের কথা তিনি বলেছিলেন এই প্রতিবেদকের কাছে, পাঁচ বছর আগে। পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পে বর্বর নির্যাতনে মা ও মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৩ দিন ৪ রাত পর বাড়ি ফিরে শুধু পানি খেয়ে দুই দিন কাটান তাঁরা। রওশন আরার মনে পড়ে, এর ১৭ দিন পর দেশ স্বাধীন হয়। তার আগেই মারা যায় মেয়ে মরিয়ম। ‘তারে কোনো ডাক্তার দেহাতে পারি নাই। বিনা চেষ্টায় মাইয়াডা মইরা গেল।’

বীরাঙ্গনা রওশন আরা আরো জানিয়েছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ও তাঁর স্বামী মাঠে-ঘাটে, পরের জমিতে কাজ করে কোনোমতে নতুন করে সংসার শুরু করেন। যে আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। এর মধ্যে তাঁদের দুই ছেলে, এক মেয়ে হয়। এরপর স্বামী ভ্যান চালানো ধরেন। প্রায় ২০ বছর হলো স্বামী মারা গেছেন। ছেলেরা বিয়ে করে আলাদা খায়। বলেন, ‘আমার খোঁজখবর নেয় না। মেয়ে রহিমনের স্বামী মারা যায়। এরপর পরের বাড়ি ও রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করা শুরু করি, আর মাইয়াডা পরের বাড়ি কাজ  করে। এইভাবে আমাদের সংসার চলত।’

লেখক : গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা