kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

ছেলের কবরের খোঁজে আজও ফাতেমা বেগম

লিটন শরীফ   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ছেলের কবরের খোঁজে আজও ফাতেমা বেগম

ফাতেমা বেগম ছবি : কালের কণ্ঠ

বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন শহীদ জননী ফাতেমা বেগম (৮৩)। কানে খুব কম শোনেন। তবু স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ ছেলের কবরের সন্ধান পাওয়ার আশা আজও ছাড়েননি। ৪৮ বছর আগে যুদ্ধে গিয়েছিলেন আবদুর রহমান। সংসারের বড় ছেলে, একমুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেন না মা। অজান্তেই চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। সোমবার (৭ জানুয়ারি) মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের পাঁচপাড়া গ্রামে শহীদ আবদুর রহমানের বাড়িতে কথা হলো তাঁর সঙ্গে। ছেলের কথা বলতেই ছোট শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন বীরপ্রসূ ফাতেমা বেগম। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘গোষ্ঠীর প্রথম সন্তান হিসেবে বাপ-চাচার কত আদরের ছিল, তাই তাকে কেউ কোনো দিন ভুলতে পারেনই না।’

ছেলে আবদুর রহমানের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘দেশে যখন যুদ্ধ লাগে, তখন আবদুর রহমান শাহবাজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস টেনে পড়ত। ছাত্র হিসেবে সে খুব মেধাবী ছিল। সারাক্ষণ চঞ্চলতায় মাতিয়ে রাখত বাড়ি, পুরো এলাকা। দিন-তারিখ মনে নেই, মনে পড়ে একটু একটু শীত পড়েছে, তখন পাঞ্জাবিরা আমাদের বাড়ির পাশে অফিস—বাজারে সুজাউল মাদরাসায় ক্যাম্প করে। সেখান থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বাড়িতে হানা দিত তারা। ওই সময়ই একদিন সকালে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে আমার প্রথম সন্তান আবদুর রহমান শার্ট ও লুঙ্গি পরে ঘর থেকে বের হয়। আমি মনে করেছি, সে গ্রামে বেড়াতে গেছে। রাতের পর দিন যায়, এভাবে দুই দিন চলে গেল, কিন্তু ছেলে আমার ঘরে ফেরে না। পরে শুনেছি, বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুই দিন আগে আবদুর রহমান ঘরের পাশে এক কোনায় তার ছোট ভাইদের ডেকে নিয়ে চকোলেট দিয়ে বলেছে, ‘ভাই, এক্কানো (একখানে) যাইমু গিয়া, আর কোনো দিন দেখা না-ও হইতে পারে।’ কিন্তু কোথায় যাবে, সে কথা তাদের বলেনি।

আবদুর রহমানের বেরিয়ে যাওয়ার দুই দিন পর সুজাউল মাদরাসায় পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনারা তাঁদের বাড়িতে আসে তাঁর বাবা আবদুল গফুরের খোঁজে। ফাতেমা বেগম তখন বুঝতে পারেন, তাঁর ছেলে যুদ্ধে গেছে। তিনি পাহাড়ি পথ বেয়ে বাপের বাড়ি চলে যান। তাঁদের ঘরে আগুন দেওয়ারও চেষ্টা করেছিল পাকিস্তানি সেনারা।

ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ায় আবদুল গফুরকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে নির্মম নির্যাতন ভোগ করতে হয়। ‘একদিকে ছেলের কোনো খবর পাচ্ছি না, অন্যদিকে স্বামীর ওপর চলছে পাকিস্তানি হানাদারদের অমানুষিক নির্যাতন। মানসিকভাবে আমি খুব ভেঙে পড়ি।...দেশ স্বাধীনের চার-পাঁচ দিন আগে যখন আমার স্বামীকে লাইনে নিয়ে গুলি করে হত্যা করার জন্য পাকিস্তানি আর্মিরা দাঁড় করিয়ে রাখে, তখনই হানাদারদের কাছে খবর আসে, মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পের দিকে আসছে। তখন তারা গুলি করা বাদ দিয়ে নিজেদের জীবনরক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। এই সুযোগে আমার স্বামী সেখান থেকে পালিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন।’

১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবাই উল্লসিত; ফাতেমা বেগমও অধীর অপেক্ষায় থাকেন, কখন আসবে তাঁর ছেলে, বিজয়ীর বেশে। দুই মাস পর শ্রীমঙ্গলের নন্দীরবল গ্রামের এক লোক আবদুর রহমানের ফটো নিয়ে এসে তাঁর এক সহযোদ্ধাকে খবর দিয়ে যায়, শ্রীমঙ্গলের একটি বাগানের (বাগানের নাম মনে নেই) প্যাট্রলে (পাহারার কাজে) নিয়োজিত পাকিস্তানি হানাদাররা আবদুর রহমানকে ধরে ফেলে। পরে পাঞ্জাবি ও রাজাকাররা গাছে ঝুঁলিয়ে গুলি করে তাঁকে হত্যা করে।

‘ছেলের মৃত্যুর সংবাদে আমরা পাগলপ্রায় হয়ে যাই। পরে আমার ভাশুর আরজ আলী ছেলের কবর শনাক্ত করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। তার কবর কোথায়, আমরা তা জানি না।’

ছেলের শোক বয়ে বয়ে ১৩ বছর আগে মারা গেছেন আবদুল গফুর। তিন ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর সংসার। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সম্মানী ভাতা প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা। সেই ভাতা তোলার সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না ফাতেমা বেগম। ছেলের কবর শনাক্ত না হওয়ায় মনের কষ্ট রয়েই গেছে তাঁর। বললেন, ‘কেউ যদি শনাক্ত করে দিত, তাহলে ছেলের কবর দেখে সান্ত্বনা পেতাম।’ ২০১২ সালে ৫০ হাজার টাকার চেকসহ কালের কণ্ঠ’র সম্মাননার কথা স্মরণ করে এই শহীদ জননী বললেন, ‘এ ছাড়া আর কেউ আমার খোঁজ রাখেনি।’

লেখক : বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা