kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

শংকরী হালদার

আজও মেলেনি শহীদ দুই সন্তানের স্বীকৃতি

রফিকুল ইসলাম   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আজও মেলেনি শহীদ দুই সন্তানের স্বীকৃতি

শংকরী হালদার ছবি : কালের কণ্ঠ

সম্মুখযুদ্ধে শহীদ দুই ছেলের স্বীকৃতি মেলেনি। তা নিয়ে ক্ষোভও নেই শহীদ জননীর। কারণ তাঁর ধারণা, স্বাধীন এই দেশ তাঁর সন্তানের রক্তের মূল্য দিতে পারবে না। দুই সন্তান হারিয়ে তাদের বাবা স্বাধীনতার পরই মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। তিনিও এই পৃথিবী থেকে ছয় বছর হলো বিদায় নিয়েছেন। সংসারে রয়েছে তাঁর একমাত্র ছোট ছেলে। সেও মানসিক ভারসাম্যহীন। তাকে আঁকড়ে ধরেই শহীদ জননীর বেঁচে থাকা। কালের কণ্ঠ এই শহীদ জননী শংকরী হালদারের খোঁজ নিয়েছিল ২০১১ সালে। আট বছর পর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে মনোবেদনার কথা জানালেন এই জননী।

পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে বড় ছেলে সুভাষচন্দ্র হালদার শহীদ হন। এই ঘটনার দিন পনেরো আগে মেজো ছেলে সুরেশচন্দ্র হালদারকে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। যুদ্ধের সময় তাঁর একমাত্র মেয়েটি শরণার্থী হিসেবে ভারতে গিয়ে আর ফেরেনি। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর কেমন আছ মা ধারাবাহিক প্রতিবেদনে ‘দুই সন্তানের রক্তের বিনিময়েও স্বীকৃতি মিলল না’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরের বছর কালের কণ্ঠ’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা হয়।

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ)। ভাসমান হাটের জন্য বেশ পরিচিত আটঘর-কুড়িয়ানা বাজার। ইউনিয়নের পাশেই আন্দারকুল গ্রামে থাকেন শহীদ জননী। আটঘর বাজারে নষ্ট আলু কিংবা পেঁয়াজ বাছাই করাই তাঁর কাজ। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার হাট বসে। এ দুই দিন শংকরীর কাজ মেলে। দুই দিনে আয় ৬০ টাকার মতো। সংসারের জন্য কিছু আলু-পেঁয়াজ সঙ্গে আনতে পারেন, দাম দিতে হয় না। আট বছর পর তাঁকে দেখতে গিয়ে জানা গেল বঞ্চনার করুণ কাহিনি।

কালের কণ্ঠ থেকে পাওয়া অনুদান থেকে ১০ হাজার টাকায় আসবাব কিনেছিলেন শংকরী হালদার। টাকা ঘরে রাখলে চুরি হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় ৪০ হাজার টাকা ঢাকায়ই গচ্ছিত রেখে যান মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমানের কাছে। তিনি ওই টাকা শংকরীর এক নিকটাত্মীয়র কাছে মুনাফা দেওয়ার শর্তে রেখে দেন। বছরখানেক মুনাফার টাকায় সংসার ভালোই চলছিল। এরপর ২০১৩ সাল থেকে আর কোনো টাকা পাচ্ছেন না তিনি।

দুঃখ করে বললেন, “আমি এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মজিবরের কাছে একাধিকবার গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, স্বামী স্বর্গে গেছেন। আমিও আজ বাদে কাল যাব। তাই স্বামীর সমাধিটা ইট-পাথরে মুড়িয়ে দিই। এ কথা কেউই আমলে নিচ্ছে না। দুই সন্তানের রক্তের বিনিময়েও স্বীকৃতি মেলেনি। মনে হয় বেঁচে থেকে সেই স্বীকৃতি দেখে যেতে পারব না। আমার শেষ ইচ্ছা স্বামীর সমাধিটা পাকা করে যাওয়া। আমার মৃত্যুর পর তাঁর পাশে যেন থাকতে পারি। সমাধিতে অন্তত লেখাটা থাক—‘এটা শহীদ জননীর সমাধি’।”

মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান বলেন, ‘শহীদ জননী শংকরী হালদারের দুই ছেলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হোক—এটা আমাদের সবার দাবি। কিন্তু শংকরী হালদারের পক্ষে এ নিয়ে অফিসে দৌড়ঝাঁপ করার মতো কেউ না থাকায় স্বীকৃতি মিলছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘শংকরীর ঝুপড়িঘর। সেখানে ৪০ হাজার টাকা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শংকরীর এক নিকটাত্মীয়র কাছে সেই টাকা রাখা আছে। তিনি প্রতি মাসে সংসার খরচ হিসেবে একটা অংশ দেন। কয়েক বছর ধরে তিনি টাকা দিচ্ছেন না বলে শুনেছি। তিনি মূল টাকা যাতে পান, সে ব্যাপারে আমি উদ্যোগ নিচ্ছি।’

লেখক : বরিশাল ব্যুরো প্রধান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা