kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

আফরোজার কানে এখনো বাজে বঙ্গবন্ধুর দরাজ কণ্ঠ—‘এই মেয়ে...’

ফরিদুল করিম   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আফরোজার কানে এখনো বাজে বঙ্গবন্ধুর দরাজ কণ্ঠ—‘এই মেয়ে...’

একাত্তরের বিজয়িনী আফরোজা মামুন। ছবি : কালের কণ্ঠ

অবশেষে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি। ৪৭ বছর পর। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের গেজেট শাখার গত ১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখের প্রজ্ঞাপনে আফরোজা মামুনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০১১ সালের মার্চ মাসে কালের কণ্ঠে আফরোজা মামুনের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই সময় তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণামূলক প্রতিবেদনটিতে উঠে আসে সেই সব উত্তাল দিনের কথা।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই স্বাধীনতার প্রস্তুতি শুরু হয় নওগাঁয়। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সেখানে শপথ গ্রহণ করা হয়। শপথ নেন আফরোজা মামুনও। তাঁদের বাসায় মুক্তিযোদ্ধা ময়নুল হক মুকুল প্রায়ই এসে স্বাধীনতার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। সেসব কথা শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন আফরোজা। মনে মনে সংকল্প করেছিলেন, একটা কিছু করতেই হবে। তিনি ও তাঁর স্বামী মামুনাল চৌধুরী রাজা এবং আরো কয়েকজন শিল্পী ট্রাকে করে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় দেশাত্মবোধক ও গণসংগীত গেয়ে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। যাঁরা গণসংগীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, গোপনে বিহারিরা তাঁদের নামের তালিকা করেছিল। বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক আব্দুল জলিল জানতে পেরেছিলেন। সেই তালিকায় আফরোজা আর তাঁর স্বামীর নামও ছিল। পাকিস্তানি সেনাদের সান্তাহারে আসার খবর পেয়ে গ্রামের বাড়ি গয়েশপুর চলে যান তাঁরা। সেখান থেকে ভারতের বালুরঘাট যাওয়া যায়। তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন আব্দুল জলিল। তিনি তখন বালুরঘাটে অবস্থান করছিলেন। একটি মহিষের গাড়িতে করে তাঁরাও বালুরঘাটে গিয়ে পৌঁছেন। যেদিন গয়েশপুর ছাড়েন, সেদিন তাঁদের ১৫ জন আত্মীয়কে পাকিস্তানি বাহিনী ব্রাশফায়ারে হত্যা করে।

বলুরঘাটে নাট্যমন্দিরের শিল্পীদের নিয়ে শুরু করেছিলেন চ্যারিটি শো। বালুরঘাট, মালদা, মুর্শিদাবাদ, রায়গঞ্জ, বহরমপুর, শিবপুর, শিলিগুড়িসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে চ্যারিটি শো করে যে টাকা পেতেন, তা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে দিয়ে দিতেন। আর কাপড়চোপড় পেলে দিতেন আশ্রয়শিবিরগুলোতে। পরে আফরোজারা কলকাতায় গিয়ে যুক্ত হন আপেল মাহমুদ, আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল হাদী, শাহিন মাহমুদ, রথীন্দ্রনাথ, লাকী আখন্দ্সহ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের সঙ্গে। খুব গোপনে গান রেকর্ড করতেন। কোথায় রেকর্ড হতো তা বাইরে বলা কঠোরভাবে নিষেধ ছিল। দলীয় সংগীত গাইতেন। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘মুজিব বাইয়া যাও রে’, ‘পৃথিবী শোনো আমার ধর্ষিতা বোনের ছবি’—আরো কত গান গাইতেন! স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তা প্রচার করা হতো। এ ছাড়া কলকাতার বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত চ্যারিটি শো করতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু নওগাঁর দীঘলি বিল মাঠে বক্তৃতা করতে আসেন। সেদিন বঙ্গবন্ধুর জন্য যে মঞ্চটি তৈরি করা হয়েছিল, তার কিছুটা দূরে দলবদ্ধভাবে দেশাত্মবোধক গান গাইছিলেন আফরোজা। তিনি বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চে দেখতে পেয়ে কাগজ ও কলম হাতে মঞ্চের দিকে এগোনোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড ভিড়ে কিছুতেই এগোতে পারছিলেন না। হঠাৎ শুনতে পান মাইকে সেই দরাজ গম্ভীর কণ্ঠ—‘এই মেয়ে! তুমি কি আমার কাছে আসতে চাও। এই, তোরা মেয়েটিকে আমার কাছে নিয়ে আয়।’ আফরোজা কাছে গিয়ে বলেন, অটোগ্রাফ চাই। কাগজ-কলম এগিয়ে দিলে তাতে ‘জয় বাংলা’ লিখে স্বাক্ষর করলেন বঙ্গবন্ধু। বলেছিলেন, ‘এই মেয়ে, বল বল, আজ কত তারিখ।’ কিন্তু সেই বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে গিয়ে সেদিন সব ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। সেই অটোগ্রাফটি আজও সযত্নে রেখে দিয়েছেন আফরোজা।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত শিল্পী ছিলেন তিনি ও তাঁর স্বামী মামুনাল চৌধুরী রাজা। স্বামী মামুনাল চৌধুরী মারা গেছেন। বর্তমানে নওগাঁ শহরের উকিলপাড়ায় (কেডি স্কুলের মোড়) তাঁদের নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করছেন। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন গত নভেম্বরে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন আফরোজা মামুন।

লেখক : নওগাঁ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা