kalerkantho

দেড় কোটি ছাত্রের শিক্ষক

১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



দেড় কোটি ছাত্রের শিক্ষক

ছবি : ইন্টারনেট

একজনকে দিয়ে শুরু করেছিলেন, আর এখন বিশ্বজোড়া তাঁর দেড় কোটি ছাত্র! ভার্চুয়াল স্কুল খান একাডেমির কল্যাণে তাঁর খ্যাতি এখন আকাশচুম্বী। টাইম সাময়িকীর ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় নাম উঠেছে, হয়েছেন ফোর্বসের প্রচ্ছদ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালমান খানকে নিয়ে লিখেছেন আরাফাত শাহরিয়ার

 

নাদিয়া অঙ্কে কাঁচা। গণিতের সূত্রগুলোকে মনে হয় খটমট হিব্রু। সালমানের কাছে অঙ্কটা আবার জলের মতোই তরল। মামাতো বোনের অঙ্কভীতি কাটানোর দায়িত্ব নিলেন সালমান। সমস্যা একটাই, দূরত্ব। তিনি থাকেন বোস্টন আর নাদিয়া নিউ অরলিন্সে। মাঝখানে দুই হাজার কিলোমিটার। দূরত্ব ঘোচাতে নিতে হলো অনলাইনের আশ্রয়। কাঠখোট্টা গণিতকে মজার করে উপস্থাপনের জন্য সালমান প্রয়োগ করতে থাকেন নিত্যনতুন পদ্ধতি। আস্তে আস্তে অঙ্কে আগ্রহী হয়ে ওঠে নাদিয়া। একসময় দেখা যায়, গণিতে সে ভালো নম্বর পাচ্ছে। নাদিয়ার দুই ভাইকেও পড়াতে শুরু করেন সালমান। কিন্তু এবার গণ্ডগোল পাকাল সময়। অফিস শেষে সালমান যখন বাড়ি ফেরেন, নাদিয়ার ভাইয়েরা তখন খেলাধুলা বা অন্য কাজে ব্যস্ত। দুই পক্ষের সময় মেলানোই দায়! এই সমস্যারও সমাধান বের করে ফেলেন সালমান। গণিতের সমস্যাগুলো নিয়ে তৈরি করেন ভিডিও। আপলোড করেন ইউটিউবে। নাদিয়া ও তার দুই ভাই বাড়িতে বসে নিজেদের সুবিধামতো সময়েই পেয়ে যায় গণিতের কঠিন সব সমস্যার সমাধান।

গল্পটি এই পারিবারিক পর্যায়েই শেষ হতে পারত। আর এখন সারা বিশ্বে প্রতি মাসে গড়ে দেড় কোটি ব্যবহারকারী দেখে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাঁর তৈরি ভিডিও। শুধু ইউটিউবেই গ্রাহক রয়েছে ৪৫ লাখের বেশি।

 

ভার্চুয়াল স্কুল

‘বিনা মূল্যে বিশ্বমানের শিক্ষা। সবার জন্য, সব সময়।’ আকাশকুসুম কল্পনা মনে হতে পারে। পৃথিবীজুড়ে শিক্ষার ব্যয় যেখানে দিন দিন আকাশচুম্বী, সেখানে বিনা পয়সার স্কুল! বিশ্বজুড়ে তাই সালমান খানের ভার্চুয়াল স্কুল ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। ওয়েবভিত্তিক অলাভজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নাম ‘খান একাডেমি’। ঠিকানা www.khanacademy.org। ইউটিউবে www.youtube.com/user/khanacademy। ওয়াল স্ট্রিটের চাকরি ছেড়ে, করপোরেট জগতের হাতছানি উপেক্ষা করে ২০০৬ সালে তরুণ সালমান খান প্রতিষ্ঠা করেন এই অনলাইন পাঠশালা। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউতে তাঁর বাড়িই একাডেমির আঁতুড়ঘর। সেখানেই সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীর জন্য তৈরি হয়েছে হাজার হাজার ভিডিও টিউটরিয়াল। ভিডিওগুলোতে কণ্ঠও দিয়েছেন সালমান খান নিজেই।

বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ২৭টি ভাষায় কয়েক হাজার ভিডিও লেকচার, টিউটরিয়াল তৈরি করেছে খান একাডেমি। এর মধ্যে আছে গণিত, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, পরিসংখ্যান, কম্পিউটার প্রগ্রামিং, ব্যাংকিংসহ নানা বিষয়। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া, আফ্রিকাসহ নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে শিক্ষা নিচ্ছে সালমানের শেয়ার করা ভিডিও থেকে। সহজবোধ্য ও মজাদার এসব ভিডিও দূর করে পাঠ গ্রহণের একঘেয়েমি। কঠিন বিষয়কেও কিভাবে ভিডিও টিউটরিয়ালের মাধ্যমে সহজ-সরল করে শিক্ষার্থীর জন্য উপস্থাপন করা যায়, হাতে-কলমে দেখিয়েছেন সালমান।

বাড়িতে পৌঁছার ঠিক আগমুহূর্তে অ্যানের কাছ থেকে একটি মেসেজ এলো : ‘টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে এক লাখ ডলার করে দিচ্ছি।’ আরেকটু হলেই গাড়ি নিয়ে সোজা গ্যারেজে ধাক্কা খেতে যাচ্ছিলাম।

খান একাডেমির বাংলা সংস্করণও আছে। ২০১৬ সালে প্ল্যাটফর্মটি যাত্রা শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে গ্রামীণফোন ও আগামী ফাউন্ডেশন। এই সংস্করণের মাধ্যমে বাংলা শিক্ষার্থীরা খান একাডেমির বিভিন্ন কনটেন্ট বাংলায় পড়তে পারবে। ভিডিও টিউটরিয়াল দেখার পাশাপাশি রয়েছে অনুশীলন করারও সুযোগ। শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য রয়েছে আলাদা বিভাগ। বাংলায় খান একাডেমির ঠিকানা bn.khanacademy.org। এক ভিডিও বার্তায় খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান খান বলেন, ‘আমার পূর্বসূরিরা বাংলাদেশি। আর সেখানে খান একাডেমির টিউটরিয়াল বাংলা ভাষায় রূপান্তর হওয়া আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন।’

খান একাডেমির সাইটে নিয়মিত ঢু মারেন শীর্ষ ধনী বিল গেটস। এক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেন, ‘খান দারুণ এক যুবক, তার টিউটরিয়ালের ওয়েবসাইটটি বেশ সমৃদ্ধ। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়কে ছোট আকারে দারুণভাবে তুলে ধরার এই পদ্ধতি দেখে আমি খুবই অবাক।’

 

২৪ ঘণ্টার গৃহশিক্ষক

গৃহশিক্ষক খুঁজছেন? যুতসই কাউকে পাচ্ছেন না? গণিতে ভালো হলে বিজ্ঞানে দখল কম? এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পড়াতে রাজি নন? অথচ আপনি চাইছেন এমন এক প্রাইভেট টিউটর, যিনি সব বিষয়ে ভালো, পড়াবেনও অনেক সময় ধরে। সমাধান আছে। চাইলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই তাঁকে পাওয়া যাবে—যতক্ষণ চাই ততক্ষণই পড়াবে। ঠিক যে গতিতে আপনি বুঝতে পারেন, সেভাবেই শিখিয়ে যাবেন। গণিত, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস—এমন অসংখ্য বিষয় তাঁর নখদর্পণে। সালমান খান প্রচলিত রীতি ভেঙে তৈরি করেছেন এমন এক শিক্ষাপদ্ধতি, যেখানে বিনা পয়সায় পাওয়া যাবে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা। আর এটি পেতে পারেন বিশ্বের যে কেউ, যেকোনো প্রান্তে বসেই। নিন্দুকরাও একবাক্যে স্বীকার করবেন, এ এক অনন্য শিক্ষাদান পদ্ধতি! সহজভাবে জটিল সমস্যার সমাধান বুঝিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি খান, রেখেছেন পুরস্কারের ব্যবস্থাও। বিষয়গুলো সহজবোধ্য করতে কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে প্রাসঙ্গিক ফর্মুলা ও ডায়াগ্রাম। তাঁর ভার্চুয়াল পাঠাগারে ব্যবহৃত বেশির ভাগ ভিডিওই ৭ থেকে ১৪ মিনিট লম্বা। এর পেছনেও যুক্তি আছে, আমরা কোনো বিষয়েই একটানা ১০-১৫ মিনিটের বেশি মনোযোগ ধরে রাখতে পারি না। তাই যাতে মনোযোগ নষ্ট না হয় সে জন্য প্রতিটি ভিডিওতে একটিমাত্র বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়।

‘আমি নিজেই ছাত্রজীবনে একঘেয়ে পাঠ্যপুস্তকের কারণে হতাশায় ভুগতাম। পাঠদানের পদ্ধতি হওয়া উচিত আনন্দময়। নিজের ভিডিওগুলোতে খুব সহজভাবে প্রতিটি সমস্যার সমাধান দিতে চেষ্টা করেছি। শিক্ষার্থীরা যাতে আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে, সেদিকে ছিল সজাগ দৃষ্টি,’ নিজের ভিডিওগুলোকে এভাবেই মূল্যায়ন করেন সালমান।

ভিডিওগুলোর গ্রাহক যেহেতু কোটি কোটি শিক্ষার্থী, তাই তাঁর এ পদ্ধতিকে বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ করে দিতে চেয়েছিল অনেক প্রতিষ্ঠান। বিনয়ের সঙ্গে সবাইকে ‘না’ করে দিয়েছেন তিনি। দু-একজনের সাহায্য নিয়ে চালিয়ে নিচ্ছেন পুরো প্রকল্পের কাজ। তাঁর ভিডিও টিউটরিয়ালগুলো ওপেন সোর্সের আওতায় থাকায় অনলাইন থেকে যে কেউ এগুলো ডাউনলোড, বিতরণ, অনুবাদ, এমনকি চাইলে সংযোজনও করতে পারে।

 

যদি লক্ষ্য থাকে অটুট

খান একাডেমিকে এগিয়ে নিতে সালমানকে কম বেগ পেতে হয়নি। অর্থকষ্টেও ভুগতে হয়েছে। শুনুন সালমানের জবানিতেই, ‘একমাত্র আমি জানি সেই সময়গুলো কতটা কঠিন ছিল। দেয়ালে প্রায় পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। অনেকে বলত, আমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছি। একটা জিনিসই আমাকে একটু আশার আলো দেখাত, আর তা হলো অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ভরা চিঠি ও ই-মেইল। তার পরও একটা পর্যায়ে আর চালাতে না পেরে হতাশার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। যখন প্রায় স্থির করেই ফেলেছিলাম সব কিছু ছেড়ে দেব, ঠিক তখনই আমার কাছে খান একাডেমির নামে ১০ হাজার ডলারের অর্থ পুরস্কার আসে। পাঠান রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৫ ব্যাচের একজন, নাম অ্যান ডোয়ার। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেইল করি। তিনি কাছেই থাকতেন, একদিন দুপুরে আমরা এক রেস্তোরাঁয় খেতে খেতে কথা বলছিলাম। অ্যান আমার কাছে জানতে চাইলেন আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী। বললাম, জীবনভর ভিডিও বানিয়ে যেতে চাই। বলে যাচ্ছিলাম এটা নিয়ে আমার কত স্বপ্ন, কত কিছু করার আকাঙ্ক্ষা। কিভাবে খান একাডেমি সারা পৃথিবীর শিক্ষাব্যবস্থা বদলে দিতে পারে। আমরা বিদায় নিলাম। বাড়িতে পৌঁছার ঠিক আগমুহূর্তে অ্যানের কাছ থেকে একটি মেসেজ এলো : ‘টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে এক লাখ ডলার করে দিচ্ছি।’ আরেকটু হলেই গাড়ি নিয়ে সোজা গ্যারেজে ধাক্কা খেতে যাচ্ছিলাম।

এরপর আর অর্থসংকট থাকেনি।

 

জন্ম ঠিকুজি ও পড়ালেখা

মার্কিন প্রকৌশলী ও খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান খানের দাদাবাড়ি বাংলাদেশের বরিশালে। বাবা ফখরুল আমিন খান ছিলেন চিকিৎসক। দাদা আবদুল ওয়াহাব খান ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার। সালমানের বাবা পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৭৬ সালে লুইজিয়ানার নিউ অরলিন্স শহরে সালমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ১৯৯১ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বাবাকে হারান।

সালমান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে গণিত ও তড়িৎ প্রকৌশল এবং কম্পিউটারবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটারবিজ্ঞান বিষয়ে। এমবিএ করেন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে।

ওরাকলের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন সালমান। সেই সঙ্গে সিলিকন ভ্যালির এক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে কাজ করেই বিপুল অর্থের অধিকারী হতে পারতেন। কিন্তু এত কিছু চিন্তা করেননি সালমান। অনলাইনে ক্লাস নিয়েই তিনি খুশি।

 

পুরস্কার ও সম্মাননা

২০০৮ সালে গুগলের ১০ বছর পূর্তিতে ‘প্রজেক্ট টেন টু দ্য হানড্রেড’ নামে ২০ লাখ ডলার পুরস্কার জিতে নেয় সালমানের খান একাডেমি। ২০১০ সালে সালমান অর্জন করেন মাইক্রোসফট টেক অ্যাওয়ার্ড। সুলিভান ফাউন্ডেশন বিনা মূল্যে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে খান একাডেমিকে অনুদান হিসেবে দেয় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। সে বছর গুগল খান একাডেমির ভিডিওগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের জন্য ২০ লাখ ডলার অর্থ সহায়তা দেয়। একই বছর ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ৪০ বছরের কম বয়সী পৃথিবীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ৪০ ব্যক্তির তালিকায় স্থান করে নেন সালমান। খান একাডেমির এই উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনও সহায়তা করেছে।

২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম সাময়িকীর শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় স্থান করে নেন সালমান খান। তা-ও আবার চতুর্থ অবস্থানে! ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় অসামান্য অবদান রাখার জন্য জেতেন ‘হ্যারল্ড ডাব্লিউ ম্যাকগ্রে প্রাইজ ইন এডুকেশন’। এই পুরস্কারের মূল্যমান ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। ২০১২ সালের জুনে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ১৪৬তম সমাবর্তনে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে সমাবর্তন বক্তা নির্বাচিত হন সালমান। এমআইটির ইতিহাসে তিনিই কনিষ্ঠতম সমাবর্তন বক্তা। রাইস ইউনিভার্সিটিতেও সমাবর্তন বক্তৃতা দেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা