kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

গুরুদক্ষিনা

চারজনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী চেয়ারম্যান, এপেক্স গ্রুপ

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চারজনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি

ছবি : কাকলী প্রধান

জীবনে অনেক মানুষের সঙ্গ পেয়েছি। অনেকের উপদেশ চলার পথে পাথেয় হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজনের প্রভাব আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি। এ চারজনকেই জীবনের সেরা শিক্ষক মনে করি।

আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক আমার বড় ভাই জাস্টিস এস এ মাসুদ। ভারতের হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি ও ষষ্ঠ অর্থ কমিশনের সদস্য এই মানুষটি পরে পদ্মভূষণ পদক পান। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে তাঁকে সম্মাননা দেয়। তিনি শান্তিনিকেতনের উপদেষ্টা কমিটিতে ছিলেন।

কেমব্রিজে পড়ালেখা করা এই মানুষটি অশেষ জ্ঞানী হলে কি হবে, জীবনযাপনে ছিলেন একেবারে সাদামাটা। কারো সমস্যা দেখলে ছুটে যেতেন। বলতেন, ‘বড় বড় ডিগ্রি, সম্পদ দিয়ে বিচার হবে না তুমি কেমন মানুষ, তোমার বড় ব্যবসা বা চাকরি দিয়েও না; তোমার মানবিকতা, ভদ্রতা, কার কতটা উপকার করছ, তা দিয়েই বিচার হবে তুমি কেমন মানুষ। ধনী-দরিদ্র সবাইকে সমান মর্যাদা দেবে। আজকে তোমার পয়সা আছে, একসময় না-ও থাকতে পারে; কিন্তু তোমার কর্ম তোমাকে সারা জীবন বাঁচিয়ে রাখবে।’ এসব উপদেশ আমার জীবনের পাথেয়। আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও সারা জীবন বড় ভাইয়ের উপদেশ মেনে চলার চেষ্টা করে এসেছি। খ্যাতি, অর্থবিত্ত নিয়েও কিভাবে নিরহংকার জীবন যাপন করা যায় সেই শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন।

রাঁচির বিশপ ওয়েস্টকট বয়েজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফিটজজেরাল্ড আমার জীবনের আরেক সেরা শিক্ষক। তিনি শিখিয়েছেন কিভাবে ধৈর্য ধরে লক্ষ্যে পৌঁছা যায়। বিরক্ত না হয়ে ভালোবাসা দিয়ে কিভাবে একজনের স্বভাব পরিবর্তন করা যায়।

বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলাম। ক্লাসের প্রিফেক্ট ছিলাম। খেলাধুলায় ক্যাপ্টেন ছিলাম। আবার অনেক দুষ্টুমিও করতাম। অনেক শিক্ষক আমার দুষ্টুমির জন্য বিরক্ত হতেন। শাস্তি দিতেন। কিন্তু হেডস্যার কখনো বিরক্ত হতেন না। মুখ কালো করেও কথা বলতেন না। ক্লাসের ফাঁকে বা ক্লাস শেষে কাছে ডেকে নিয়ে সুন্দর করে বোঝাতেন—কেন এই কাজগুলো করা ঠিক না। করলে কী কী ক্ষতি হবে। এত চমৎকার করে বলতেন, মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কথা। কথাগুলো আমাকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে। পরম মমতায় শুধু ধৈর্য আর সহনশীলতা দিয়ে এভাবে একজন মানুষের জীবনই স্যার পাল্টে দিলেন। ভয়কে জয় করে সাহস করে কিভাবে এগিয়ে যেতে হয়, তা হেডস্যারের কাছ থেকে জেনেছি।

রাঁচির স্কুল শেষে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়তে যাই। নতুন পরিবেশে মন বসাতে সময় লাগে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ফাদার সেফার্স। তিনি বলতেন, ‘লেখাপড়া শেখো, বিতর্ক প্রতিযোগিতা করো। সব কিছুরই প্রয়োজন আছে। তবে লেখাপড়া, খেলাধুলা, চাকরিই শেষ কথা নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভালো মানুষ হওয়া।’ কাউকে আঘাত না করে, কষ্ট না দিয়ে সারা জীবন ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করার উপদেশ দিতেন। ফাদারের কথা মেনে চলার চেষ্টা করে আসছি।

এরপর কর্মক্ষেত্র ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কম্পানিতে যোগ দিই। সেখানে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিজাম আহমেদ শাহ শেখান কিভাবে অফিসের কাজ গুছিয়ে করা যায়, কিভাবে কর্মচারী, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করা যায়। তাঁর এই শিক্ষা সারা জীবন অনুসরণের চেষ্টা করেছি। তিনি আরো শিক্ষা দেন কিভাবে দৈনিক, মাসিক ও বার্ষিক রিপোর্ট তৈরি করা যায়, কিভাবে অধীনদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে হয়। জানতে পারি, কিভাবে কম্পানিকে লাভবান করার জন্য আগেভাগে ছক কষতে হয়। আরো জানতে পারি, প্রচুর কাজের মধ্যে কিভাবে নিজেকে এবং পরিবারকে ভালো রাখা যায়। চাকরি ও ব্যাবসায়িক জীবনে তাঁর উপদেশগুলো মেনে চলছি। তিনি আমার জীবনের আরেক সেরা শিক্ষক।

♦ অনুলিখন : ফারজানা লাবনী

মন্তব্য