kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

গুরুদক্ষিনা

আমার শিক্ষকেরা

শামসুজ্জামান খান গবেষক

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার শিক্ষকেরা

ছবি : কাকলী প্রধান

তৎকালীন ঢাকা জেলার সিংগাইর থানার চারিগ্রামে আমার স্কুলজীবন শুরু হয় ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে। আমার শিক্ষকভাগ্য ঈর্ষণীয়। প্রাইমারি স্কুল থেকেই এমন সব শিক্ষক পেয়েছি, যার তুলনা মেলা ভার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেছি তখনকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক ছিলেন। প্রধান শিক্ষক বেশ রাগী। অঙ্ক ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়; আমাদের তিনি অঙ্কই করাতেন। অঙ্ক না পারলে বেত মারতেন। আমি ক্লাসের পরীক্ষায় নিয়মিত প্রথম হলেও অঙ্কে ছিলাম কাঁচা। তাই ভয়ে ভয়ে থাকতে হতো, এই বুঝি বেতের ঘা হাতে বা পিঠে পড়ল। একদিন ক্লাসে অঙ্কের অনুশীলন করিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে আমাদের অঙ্ক কষতে দিয়ে বললেন—বেত নিয়ে আয়। স্কুলের পেছনেই ছিল বেতঝোপ। আমি ক্লাস থেকে বেরিয়ে বেত না এনে সোজা বাড়িতে। বেত আনলে আমাকেও দু-চার ঘা খেতে হতো। তো, এই স্যারের প্রভাব আমার ওপর কতখানি কিভাবে পড়েছে—নাকি কঠিন, কঠোর এবং রাগী ও শাস্তিদাতা হিসেবে তাঁর বিরূপ ছাপ আমার ওপর পড়েছে, তা বুঝতে পারিনি।

প্রাইমারি স্কুলেই দ্বিতীয় শিক্ষক এ এইচ আনিসুর রহমান আমাদের পড়াতেন বাংলা। তিনিও অঙ্ক ভালো জানতেন। তবে যত্নে ও ভালোবাসায় পড়াতেন বাংলা। তিনি কবিতা লিখতেন। সেসব কবিতা কোথাও ছাপা হতো কি না, জানতে পারিনি। তাঁর হাতে দেখেছি সব সময় কবিতার বই। তাঁর হাতে থাকা একখানা বই খুব চোখে পড়ত—‘বনলতা সেন’। তখন লেখকের নাম জানার আগ্রহ হয়নি। পরে চারিগ্রামের শাহাদত আলী খান হাই স্কুলে এসে কবির নাম জানি। বাংলার এই শিক্ষকের প্রভাব আমার ওপর সামান্য নয়। আমি যে হাই স্কুলে এসে দৈনিক আজাদের ‘মুকুল’-এর সদস্য হলাম এবং একটু একটু করে গল্প, কবিতা মকশো করা শুরু করলাম, তার পেছনে আনিস স্যারের কিছু প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ প্রভাব নিশ্চিতভাবেই ছিল বলে মনে হয়। হাই স্কুলে আমার প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রীযুক্ত বাবু রাজ্যেশ্বর চৌধুরী। তিনি ইংরেজিটা খুব ভালো জানতেন। একবার একটা কমা যথাস্থানে না দেওয়ায় তাঁর ভর্ত্সনার পর বলেছিলাম—স্যার, ছোট একটু ভুল করেছি, কমা বৈ তো নয়। তিনি বললেন—কী বললি! ছোট ভুল? না, গ্রস মিসটেক। ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারলে বাক্যের অর্থ পাল্টে যেতে পারে। আমার এই বিচক্ষণ প্রধান শিক্ষকের দিকনির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ইংরেজি নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি।

হাই স্কুলে থাকতেই ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ জন্মে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি স্কুলে বেশ কয়েকজন নতুন শিক্ষক যোগ দিয়েছেন। তাঁরা ছিলেন প্রগতিশীল, রাজনীতিসচেতন, গ্রন্থপ্রেমিক। তাঁদের উদ্যোগে স্কুলের নিজস্ব লাইব্রেরি গড়ে উঠল। চমৎকার সব বই এলো লাইব্রেরিতে। রবীন্দ্র-নজরুলের বই ছাড়াও মানিক, জীবনানন্দ, প্রেমেন্দ্র, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, অমিয়ভূষণ, সুকান্ত, হাতি সিংহের বইয়ে আমাদের গ্রন্থপিপাসা তীব্র হলো। বাদ গেল মোহন সিরিজের পাঠের আগ্রহ। এই সময়ে আমাদের নতুন শিক্ষকেরা বিকেলে বা ছুটির দিনে একসঙ্গে বসে খবরের কাগজ পড়তেন, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন; কখনো কখনো সাহিত্য নিয়েও কথা হতো। এসব আলোচনায় উঁচু ক্লাসের ছাত্র হিসেবে আমার এবং আরো দু-একজনের থাকার সুযোগ হতো। ফলে আমার খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়। যত দূর মনে পড়ে, তখন দৈনিক আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার এবং সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পড়া শুরু করি। আরো কিছু পরে দৈনিক ইত্তেফাক পড়তে শুরু করি এবং কচি-কাঁচার আসরের সদস্য হয়ে লেখা পাঠাতে শুরু করি। এই সময়ে বাংলার নতুন শিক্ষক খলিলুর রহমান আমাকে সম্পাদক করে পূর্বাভাস নামে হাতে লেখা পত্রিকা বের করেন। বেশ বড়সড় পত্রিকা—৩০-৪০ পৃষ্ঠার যত দূর মনে পড়ে। খলিল স্যারের স্ত্রী রোকাইয়া সুলতানাও এ কাজে আমাদের বিশেষ সহায়ক ও প্রেরণাদাত্রী ছিলেন। তখনকার প্রধান শিক্ষক ফজলুল করিম, উর্দু শিক্ষক আবুল হাসনাত মুহম্মদ ওমর এবং প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক এ এইচ আনিসুর রহমানের অনুপ্রাণনা ছিল আমার জন্য খুবই উদ্দীপক। ফলে সাহিত্যের নেশা আমাকে পেয়ে বসে। এ বিষয়ে আমার জীবনে প্রধান প্রভাব খলিল স্যার ও তাঁর স্ত্রীর। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আনিস স্যার এবং স্কুলের উর্দু শিক্ষক মৌলভি মুহম্মদ ওমরের কাছেও আমি অনেকখানি ঋণী। আর উঁচু ক্লাসের ছাত্র জালালউদ্দীন এবং বন্ধু ফিরোজের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল প্রেরণাসঞ্চারী। তবে ভেতরে ভেতরে নিজস্ব প্রস্তুতি, অর্থাৎ সুনির্বাচিত গ্রন্থাদির বিপুল ও একনিষ্ঠ পাঠ, একাগ্র সাধনাযুক্ত শ্রম এবং প্রসক্তি—এসব গুণের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সাহিত্যক্ষেত্রে সিদ্ধির নিশ্চয়তা।

মন্তব্য