kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

তিনি গ্রামেই পড়ে রইলেন

রসময় মোহান্ত ডাবল স্ট্যান্ড করা ছাত্র। কিন্তু অনগ্রসর মানুষের জন্য তাঁর অনেক মায়া। শিক্ষার আলোয় তাদের আলোকিত করতে রয়ে গেলেন গ্রামে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আবদুল হামিদ মাহবুব

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



তিনি গ্রামেই পড়ে রইলেন

ছবি : দীপংকর মোহান্ত

বন্ধুরা বলে, জীবনে তো কিছুই করতে পারলে না। না শহরে বাড়ি, না কোনো জায়গাজমি। ছেলেটাকে তো একটা চাকরিও জোগাড় করে দিতে পারোনি। রসময় উত্তর দেন না। ভাবেন, অনগ্রসর মানুষগুলোর তো আপন হতে পেরেছি।

 

বন্ধুরা বলে, জীবনে তো কিছুই করতে পারলে না। না শহরে বাড়ি, না কোনো জায়গাজমি। ছেলেটাকে তো একটা চাকরিও জোগাড় করে দিতে পারোনি।

রসময় উত্তর দেন না। ভাবেন, অনগ্রসর মানুষগুলোর তো আপন হতে পেরেছি। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী আছে? তাইতো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চাকরির সময় বাড়াননি। ভেবেছেন অন্যদের সুযোগ পাওয়া উচিত। অবসরে যাওয়ার পর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, যাননি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জেই থাকতে চেয়েছেন, কমলগঞ্জেই রয়ে গেছেন। বয়স ৭০ হয়ে গেছে। অনগ্রসর মানুষের জন্য চিন্তা করা ছাড়েননি। ইংরেজি ও সংস্কৃত সাহিত্য তাঁর ভালো জানা। আগ্রহী পাঠক তিনি ইতিহাস ও অর্থনীতিরও।

 

একজন রসময় মোহান্ত

১৯৪৭ সালে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোষপুরের এক কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবার নাম বরদাকান্ত আর মায়ের নাম সুভাষিণী। বাড়ির তিনি বড় ছেলে। তাঁর বাবা ছিলেন কংগ্রেসের ভলান্টিয়ার। দেশভাগের পরও মাতৃভূমি ছেড়ে যাননি বরদাকান্ত, অন্যদেরও দেশ না ছাড়তে প্রাণিত করেছেন—এমনকি সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেলেও। সেই সব কঠিন সময়ে কেটেছে রসময় মোহান্তর শৈশব। প্রাথমিক বৃত্তি পাওয়ার পর কমলগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন রসময়। লাইব্রেরিতে যাতায়াতের অভ্যাস তাঁর ছোটবেলায়ই গড়ে ওঠে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই স্কুল লাইব্রেরির সব বই তাঁর পড়া হয়ে যায়। সাংস্কৃতিক ও বিতর্ক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। বেশি বেশি বই পড়ার জন্য সাথিরা তাঁকে ‘পণ্ডিত’ বলে খেপাত। গরু চরানোর সময় জমির আলে বসেও পড়তেন। বরাবরই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছেন।

 

দেশপ্রেমের ভাবনা পেলেন

গগনচন্দ্র দে নামের এক শিক্ষক তাঁকে বই পড়তে উৎসাহ দিতেন। স্কুল লাইব্রেরি থেকে তাঁর প্রথম পড়া বই ছিল ‘মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি’। ফলে শৈশবেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের একটা ভাবনা চলে আসে। অষ্টম শ্রেণিতেই পড়ে ফেলেন রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোল্গা থেকে গঙ্গা’ এবং আরো কয়েকটি বই। প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী সমাজ গঠনের স্বপ্নও দেখতে থাকেন। ১৯৬৪ সালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে মেধাতালিকায় অষ্টম স্থান লাভ করেন। খুশি হয়ে তখনকার থানা প্রশাসন ও স্কুল কর্তৃপক্ষ ফুলের মালা পরিয়ে একটা জিপে তুলে তাঁকে বিভিন্ন স্কুলে নিয়ে যায় ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য। তখন তাঁর থানায় কোনো কলেজ ছিল না। সাধারণত সাধারণ কৃষক পরিবারের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ম্যাট্রিকের পরই শেষ হয়ে যেত। সিলেটের মুরারীচাঁদ কলেজে ভর্তি হওয়া রসময়ের জন্য সহজ ছিল; কিন্তু থাকা-খাওয়া বাবদ খরচ চালিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন। যা হোক, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর রসময়ের কাছে জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার খুলে যায়। কলেজের লাইব্রেরিটি ছিল বিশাল। উপরন্তু কলেজ লাইব্রেরিতে পড়াশোনা ছাড়াও বিকেলে রসময় চলে যেতেন শহরের টাউন লাইব্রেরি ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ লাইব্রেরিতে। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধের দিন কাটাতেন শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজ লাইব্রেরিতে। কলেজে পড়ার সময়ই তিনি অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সংস্কৃত সাহিত্য। সংস্কৃত সাহিত্যে সুপণ্ডিত জগদীশ ভট্টাচার্যের সাহচর্য পেয়েছিলেন রসময়।

 

এলো একাত্তর

১৯৬৬ সালে এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় তৎকালীন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে মেধাতালিকায় ১৩তম স্থান অধিকার করেন রসময়। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হয়েছিলেন। কারণ তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করার কথা ভাবতেন। তখন বাঙালি উত্তাল দিন অতিক্রম করছে—উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ইত্যাদি। তিনি স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় হন। ১৯৭০ সালে মাস্টার্স পাস করেন। ওই সময় পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করতে চাননি। যুদ্ধ শুরু হলে অনেক কষ্ট করে চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি পৌঁছে শরণার্থী হয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে নানা কর্মসূচিতে অংশ নেন। শিক্ষকতাও করেন কিছুকাল। স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে দেখেন, ঘরবাড়ি সবই পোড়া। গ্রাম ছারখার। তিনি গ্রাম পুনর্গঠনের কাজে নেমে পড়েন। গ্রামের তরুণদের কৃষিকাজ ও সবজি চাষে আত্মনিয়োগ করতে বলেন। নিজের বাড়িতে একটি তাঁত বসিয়েছিলেন। গামছা, শাড়ি বিক্রির টাকা থেকে সংসার চলত। তরুণ সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে স্বাধীন দেশে গড়ে তোলেন শমসেরনগর সাহিত্য সংসদ। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর নেতৃত্বে বের হয় ‘বায়ান্নর বহ্নিশিখা’ নামের একটি সংকলন। অন্যদিকে কয়েক গ্রামের মুরব্বিদের নিয়ে মিটিং করে এলাকায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় গড়ার উদ্যোগ নিলেন। এভাবে ১৯৭২ সালে গড়ে ওঠে শহীদ স্মৃতি জুনিয়র হাই স্কুল।

বিধ্বস্ত দেশে ছাত্র পাওয়া কঠিন ছিল। অর্থও ছিল না। বাড়ি বাড়ি মুষ্টিভিক্ষা করে স্কুলটি চালু হয়েছিল। রসময় মোহান্ত তখন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে বিদ্যালয়টির জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। অবশেষে গ্রামের স্কুলটি টিকে যায়।

কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়

এরপর নিজের থানায় একটা কলেজ গঠনে উদ্যোগী হলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর রসময় গেলেন ত্যাগী রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোহাম্মদ ইলিয়াসের কাছে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছাত্রনেতা ছিলেন। কৃতী ছাত্র হলেও মোহাম্মদ ইলিয়াস সরকারি চাকরি না করে আমৃত্যু জনকল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। তিনি রসময় মোহান্তকে কলেজ গড়তে উৎসাহ দিলেন। কিছু কর্মী নিয়ে আবার বাড়ি বাড়ি ঘুরতে থাকলেন রসময়। ধান-চাল সংগ্রহ করতে লাগলেন। হাট-বাজারে গিয়েও মানুষের কাছে সাহায্য চাইলেন। একসময় সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা কয়েকজনকে পেয়ে গেলেন। গড়লেন একটা শক্তিশালী দল, যাদের কাজ ছিল ছাত্রদের পড়ানোর পাশাপাশি কলেজের ঘর তৈরির জন্য অর্থ ও ধান-চাল সংগ্রহ। এই নিবেদিত দলে ছিলেন উপাধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুস শহীদ (সাবেক চিফ হুইপ), অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান), অধ্যাপক নিরঞ্জন দাস প্রমুখ। এভাবে ১৯৭২ সালে একচালা ঘরের মধ্যে গড়ে ওঠে কমলগঞ্জবাসীর স্বপ্ন কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়। গণমানুষের সাহায্যে গড়া হয়েছে বলে নাম গণমহাবিদ্যালয়।

সাবেক সচিব পুলিনবিহারী দেব লিখেছেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যার যার মতো করে সবাই চাকরিবাকরিতে যোগ দিই। কিন্তু রসময় দেশ পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তার এলাকায় কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিল।’ এই কলেজে প্রথম কয়েক বছর ছাত্রদের থেকে বেতন নেওয়ার রেওয়াজ ছিল না। এলাকাবাসী রসময় মোহান্তকে এর অধ্যক্ষ নির্বাচিত করে। তিনি বলেন, ‘আমি কিন্তু একা ছিলাম না। আরো কিছু তরুণ এলাকার শিক্ষা উন্নয়নের কথা সক্রিয়ভাবে ভাবতে লাগলেন। তাঁরাও নিরাপদ চাকরির কথা চিন্তা না করে কমলগঞ্জে একটি কলেজ গড়ার কাজে সক্রিয়ভাবে লেগে ছিলেন।’ তখন তাঁর এই সিদ্ধান্তকে অনেকে দেখেছে বোকামি হিসেবে। এ নিয়ে তাঁর বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কানাঘুষা করত। তাঁর মতো মেধাবী লোকের নতুন কলেজে বিনা বেতনে খাটুনি করাকে ভালো চোখে দেখত না। কিন্তু তাঁর মন ছিল আনন্দে ভরপুর। পিছিয়ে পড়া ছেলে-মেয়েরা কেউ প্রথম বিভাগে পাস করলে খুব খুশি হতেন। আলীনগর চা বাগান থেকে সুধাকর কৈরী প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করলে তিনি নিজের বাড়িতে নিয়ে একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করলেন। কৈরী পরে নামজাদা ডাক্তার হয়েছিলেন।

 

কমলগঞ্জ রসময় মোহান্ত

খাসিয়া, মণিপুরি, শব্দকর এবং চা বাগানের কর্মীদের এলাকা কমলগঞ্জ। এ ছাড়া অনেক সাধারণ কৃষক ও দিনমজুর পরিবারও আছে। এসব পরিবারের তরুণ-তরুণীরা দূরবর্তী স্থানে গিয়ে কলেজে লেখাপড়া করতে পারত না। তারা হাই স্কুল থেকে ঝরে পড়ত। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে এই জনপদে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-প্রশাসক-শিক্ষকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। যাঁরা ছিলেন তাঁরা অনেকেই ছিলেন ধনী পরিবারের সন্তান। কিন্তু কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এই উপজেলায় শিক্ষিত নারী-পুরুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডাক্তারসহ অন্যান্য পেশায় এলাকার ছেলে-মেয়েদের ঈর্ষণীয় উপস্থিতি চোখে পড়ে। রসময় মোহান্ত বাড়ি থেকে প্রতিদিন ছয় কিলোমিটার কাদামাটির পথ মাড়িয়ে, কিছু রাস্তা জমির আল ধরে হেঁটে সঠিক সময়ে কলেজে হাজির হতেন। জীবনের ৩৫টি বছর এভাবেই কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি ছাত্রদের পাঠ্য বইয়ের পাতার বাইরে গিয়ে জগৎ ও জীবনকে আবিষ্কার করতে বলতেন। রসময় মোহান্তর ছাত্র ও চিন্তার অনুসারী প্রাবন্ধিক আহমদ সিরাজ বলেন, “তাঁর মতো শিক্ষকের কাছে পাঠ না নিলে জীবনটা অন্ধকারে থেকে যেত। যে কারণে আমাদের শিক্ষিত সমাজে ‘মানুষের’ অভাব রয়ে গেছে। রসময় স্যার আমাদের মনে সুপ্ত মনুষ্যত্ব নামক বোধকে জাগ্রত করে দিয়েছিলেন।”

রসময়ের বাড়িটাও একটা স্কুলের মতো। কলেজের অধিক পড়ুয়া, অনুসন্ধানী ছাত্ররা এবং গ্রামবাসী যখন-তখন তাঁর কাছে এসে পড়ার সুযোগ পেত। যেকোনো বই তারা চেয়ে নিতে পারত। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেই একসময় গবেষণার কাজে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় সিলেটের শিক্ষা ও সমাজজীবনের উন্নয়ন এবং প্রান্তিক সমাজ। মাঝেমধ্যে সাহিত্য আড্ডা দিতেন। কলেজের নবাগত শিক্ষার্থীদের উৎসাহ জোগানোর জন্য কলেজে জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ করতেন।

 

বৃথা যায়নি

কৃষক-মজুর পরিবারে চাকরিজীবী সন্তানদের একটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি উপকার পেয়েছে স্থানীয় মণিপুরি সমাজ। তাদের মধ্যে এখন ২০-৩০ জন ডাক্তার। আলোয় আসতে পেরেছে চা শ্রমিকরাও। শব্দকরদেরও উপকার হয়েছে। তাদের সমাজে এসএসসি পাস লোক পাওয়াও কঠিন ছিল। রসময় মোহান্ত তাদের এগিয়ে নিতে অধিক মনোযোগী ছিলেন। তিনি শব্দকরদের উন্নয়নে ১৯৯৬ সালে গড়ে তোলেন আউস (আত্ম উন্নয়ন সমিতি) নামের একটি সামাজিক সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে শব্দকর সমাজ ও চা শ্রমিকদের মধ্যে কিছু স্কুল গড়ে তোলা হয়। তাদের স্বাস্থ্যসেবায়ও মনোযোগী ছিলেন রসময়।

মন্তব্য